সোমবার, ১ ডিসেম্বর ২০২৫
Ad for sale 100 x 870 Position (1)
Position (1)

ডিজিটাল হুন্ডি ক্রিপ্টো

ধ্রুব নিউজ ডেস্ক ধ্রুব নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ : বুধবার, ২৬ নভেম্বর,২০২৫, ০৪:১৮ পিএম
ডিজিটাল হুন্ডি ক্রিপ্টো

'মাত্র পাঁচ মিনিটের কাজ।' তার ভাই দুবাইয়ের অন্য একজন পি২পি ট্রেডারের মাধ্যমে সেই ক্রিপ্টো ভাঙিয়ে হাতে দিরহাম পেয়ে যান—কোনো রেকর্ড নেই, কর নেই, কোনোভাবে ট্রেস করাও সম্ভব নয়।

গ্রামের বাড়িতে একবার আমার এক দূরসম্পর্কের আত্মীয়ের সঙ্গে দেখা। ছোট এক ইলেকট্রনিকস দোকানে কাজ করেন উনি। মাসের শেষে নিয়ম করে দুবাই-প্রবাসী ভাইকে টাকাও পাঠান। 'টাকা পাঠাতে বাইন্যান্স ব্যবহার করি,' হাসিমুখে বললেন—যেন এমন কোনো শর্টকাট উনি আবিষ্কার করেছেন, যা আমাদের বোঝার বাইরে। 

সেদিনই আমি প্রথম বাইন্যান্সের নাম শুনি। কৌতুহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, 'এটা কীভাবে কাজ করে?' তিনি আমাকে ধাপে ধাপে বুঝিয়ে দিলেন, যেন জীবনের কোনো গোপন কৌশল শেখাচ্ছেন।

প্রথমে তিনি দোকানের গ্রাহকদের কাছ থেকে নগদ টাকা নিয়ে নিজের ব্যক্তিগত মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস (এমএফএস) অ্যাকাউন্টে জমা করেন। সন্দেহ এড়াতে অল্প অল্প করে টাকা ঢোকান। অ্যাকাউন্টে যথেষ্ট টাকা জমা হলে, তিনি বাইন্যান্স অ্যাপে লগইন করে সরাসরি পি২পি মার্কেটপ্লেসে যান। সেখানে ভালো দামে ইউএসডিটি—মার্কিন ডলারের সঙ্গে যুক্ত একটি ক্রিপ্টো স্টেবলকয়েন—বিক্রি করছেন এমন একজন বিক্রেতাকে খুঁজে বের করেন।

এরপর? ফোনে টোকা দিয়ে তিনি বললেন, 'খুবই সোজা।' নিজের এমএফএস অ্যাকাউন্ট থেকে বিক্রেতার এমএফএস বা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠিয়ে দেন। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই বিক্রেতা সমপরিমাণ ইউএসডিটি তার বাইন্যান্স ওয়ালেটে পাঠিয়ে দেন। বিক্রেতা কে বা তার টাকার উৎস কী—তা নিয়ে কোনো চিন্তা নেই তার। 

ইউএসডিটি হাতে পাওয়ার পর বাকি কাজটা আরও সহজ। তিনি দুবাইতে থাকা ভাইয়ের সঙ্গে চ্যাট উইন্ডো খোলেন, তার বাইন্যান্স ওয়ালেট ঠিকানা চান এবং সরাসরি ক্রিপ্টো পাঠিয়ে দেন। কোনো ব্যাংক নেই, কোনো রেমিট্যান্স চ্যানেল নেই, নেই কোনো যাচাই-বাছাইয়ের ঝামেলা। 

গর্বের সঙ্গে তিনি বলেন, 'মাত্র পাঁচ মিনিটের কাজ।' তার ভাই দুবাইয়ের অন্য একজন পি২পি ট্রেডারের মাধ্যমে সেই ক্রিপ্টো ভাঙিয়ে হাতে দিরহাম পেয়ে যান—কোনো রেকর্ড নেই, কর নেই, কোনোভাবে ট্রেস করাও সম্ভব নয়।

তিনি জানতেনই না যে তার এ কাজগুলো বাংলাদেশের আইনে মানি লন্ডারিং অপরাধের মধ্যে পড়ে। আর যখন আমি তাকে বললাম, তখনও তেমন গুরুত্ব দিলেন না।

বাইন্যান্স ক্রিপ্টোকারেন্সি কেনাবেচার জন্য বিশ্বজুড়ে অন্যতম জনপ্রিয় একটি প্ল্যাটফর্ম। ২০১৭ সালে কেম্যান আইল্যান্ডে নিবন্ধিত এই প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা চীনা নাগরিক চ্যাংপেং ঝাও। এর প্রধান মুদ্রা ইউএসডিটি, যার মূল্য সব সময় মার্কিন ডলারের সমান থাকায় এটি ক্রিপ্টো ব্যবসায়ীদের কাছে সবচেয়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

একজন ক্রিপ্টো ট্রেডার (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক)বলেন, 'ধরুন, আপনি বাইন্যান্সের মাধ্যমে বিদেশে ডলার পাঠাতে চান। আপনার কাছে টাকা আছে, কিন্তু ডলার নেই। তখন আপনি বাইন্যান্সে লগইন করে পি২পি অপশন ব্যবহার করবেন। সেখানে ব্যাংক ট্রান্সফার বা বিকাশ, নগদ, রকেটের মাধ্যমে ক্রিপ্টো কেনা যায়।' 

তিনি আরও বলেন, 'যখন আপনি কেনেন, আপনাকে আগে টাকা পাঠাতে হয়। বাইন্যান্স তখন ক্রিপ্টোকে "এসক্রোতে" নিরাপদে রাখে, তাই বিক্রেতা টাকা নিয়ে পাঠাতে পারে না। আবার যখন বিক্রি করেন, আপনি আগে টাকা পান, তারপর ক্রিপ্টো পাঠান। লেনদেন শেষ না হওয়া পর্যন্ত ক্রিপ্টো বাইন্যান্সের ভেতরেই লক করা থাকে।'

বিষয়টি সহজে বোঝাতে তিনি ব্যাখ্যা করেন, 'মনে করেন, আপনি ১০ লাখ টাকার ইউএসডিটি কিনলেন। এরপর তা যেকোনো দেশে পাঠাতে পারবেন। এটা অনেকটাই হুন্ডির মতো। আপনার ওয়ালেট ঠিকানা দিলেই আমি মুহূর্তের মধ্যে টাকা পাঠিয়ে দিতে পারব। বাংলাদেশ সরকার আসলে এটা থামাতে পারবে না।'

২০২৩ সালে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) এই পুরো নেটওয়ার্কের হদিস পায়। দেখা গেছে, বিভিন্ন এমএফএস অ্যাকাউন্ট দিয়ে শত শত কোটি টাকা ঘুরেছে। শুধু একটি মোবাইল নম্বর দিয়েই ২৫ কোটি টাকার বেশি লেনদেন হয়েছে।

উল্লেখ্য, ২০১৪ সালে বাংলাদেশ বিটকয়েন লেনদেনকে অবৈধ ঘোষণা করে। তবুও, ধারণা করা হচ্ছে, বর্তমানে বাংলাদেশে আনুমানিক ৪০ লাখ ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহারকারী রয়েছে। 

সিআইডির মতে, জুয়া, হুন্ডি, পাচার, সাইবার চাঁদাবাজি—সব ক্ষেত্রেই বিভিন্ন ধরনের ক্রিপ্টো বা ভার্চুয়াল মুদ্রা ব্যবহার হচ্ছে। বিভিন্ন অভিযান চললেও নেটওয়ার্কগুলো নতুন রূপে আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অফ ইনফরমেশন টেকনোলজির (আইআইটি) পরিচালক অধ্যাপক ড. বি এম মইনুল হোসেন বলেন, 'ক্রিপ্টোকারেন্সি অনেকটা ইমেইল পাঠানোর মতো কাজ করে। যেমন কেউ আপনাকে যেকোনো জায়গা থেকে সঙ্গে সঙ্গে ইমেইল করতে পারে, তেমনি ক্রিপ্টো ব্যবহার করে টাকাও পাঠানো যায়। সরকার ইমেইল নিষিদ্ধ করতে পারে, কিন্তু ভিপিএন বা পি২পি সিস্টেম ব্যবহার করে তা চালানো সম্ভব। ক্রিপ্টোকারেন্সির ক্ষেত্রেও বিষয়টি একই রকম।' 

মূল সমস্যা হলো, ইন্টারনেট যতদিন থাকবে, সরকার ক্রিপ্টো নিষিদ্ধ করলেও মানুষ এর লেনদেন চালিয়ে যাবে, কারণ এটি নিয়ন্ত্রণ করার জন্য কোনো কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ নেই।

প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়) ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব বলেন, 'ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে মানি লন্ডারিং-এর ঘটনা আমাদের নজরে এসেছে। যেমন, একটি ক্রিপ্টো প্ল্যাটফর্ম স্থানীয় একটি ব্যাংকের এনআইডি–সংযুক্ত এপিআই ব্যবহার করছিল। আমরা শনাক্ত করলে এনআইডি কর্তৃপক্ষ সেটি বন্ধ করে দেয়। তবে একই ধরনের প্রক্সি এপিআই এখনও ব্যবহৃত হতে পারে।' 

তিনি আরও বলেন, 'অনলাইন জুয়ার টাকা বা সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেন ক্রিপ্টো দিয়ে সরানো হচ্ছে কিনা, সেটি নিয়ে উদ্বেগ আছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিএফআইইউকে সতর্ক থাকতে হবে।'

ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে অর্থ পাচার বিশ্বজুড়ে নিয়ন্ত্রকদের জন্য একটি বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল কনসোর্টিয়াম অফ ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্টস এবং দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের তদন্তে পাওয়া গেছে, গত দুই বছরে অন্তত ২৮ বিলিয়ন ডলারের অবৈধ অর্থ প্রধান ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জগুলোতে লেনদেন হয়েছে।

উত্তর কোরিয়ার হ্যাকার গ্রুপ থেকে শুরু করে প্রতারক চক্র, সাইবার অপরাধী নেটওয়ার্ক—সবাই বাইন্যান্স, ওকেএক্স, বাইবিটের মতো এক্সচেঞ্জ ব্যবহার করছে অবৈধ অর্থ পাচার ও তা 'সাদা' করার কাজে। 

বিশ্বের বড় নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো তাই নিষিদ্ধ করার চেষ্টা না করে মনোযোগ দিচ্ছে নিয়ন্ত্রণে। অর্থাৎ যেখানে ডিজিটাল টাকা বাস্তব আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে মিশে যায়—সেখানে শক্তভাবে নজরে রাখা হচ্ছে।

ফিন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্ক ফোর্স (এফএটিএফ) এখন সব দেশকে বাধ্য করছে ভার্চুয়াল অ্যাসেট সার্ভিস প্রোভাইডারদের—এক্সচেঞ্জ, পি–টু–পি প্ল্যাটফর্ম, ওয়ালেট সার্ভিস—কেওয়াইসি, রিপোর্টিং ও আন্তর্জাতিক তথ্য বিনিময়ের আওতায় আনতে।

ইইউ, যুক্তরাজ্য, ইউএই—সব জায়গায় এসব আইন কার্যকর। ইইউর মাইকা আইন লেনদেনে সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা বাধ্যতামূলক করেছে; যুক্তরাজ্য কোনো লেনদেন সন্দেহজনক মনে হলে তা স্থগিত করতে বলে; দুবাই–আবুধাবি–বাহরাইনেও এক্সচেঞ্জগুলোকে লাইসেন্স, মূলধন ও অর্থ পাচার আইন মানতে হয়।

কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থার এই শূন্যতা থাকবে, অপরাধীরা এর সুযোগ নিতেই থাকবে—আর গ্রামের সেই তরুণের মতো সাধারণ মানুষ, নিজের অজান্তেই এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়বে।

 

ধ্রুব নিউজের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

💬 Comments

Login | Register
Ad for sale 225 x 270 Position (2)
Position (2)