সাইফুল ইসলাম
সাংস্কৃতিক রাজধানী যশোরে এখন সাজ সাজ রব ছবি: ধ্রুব নিউজ
চৈত্রের তপ্ত রোদে যখন প্রকৃতি পুড়ছে, ঠিক তখনই এক পশলা নতুনের আনন্দ নিয়ে কড়া নাড়ছে বাংলা নববর্ষ। আর এই নতুন বছরকে খাঁটি বাঙালিয়ানায় বরণ করে নিতে দেশের সাংস্কৃতিক রাজধানী যশোরে এখন সাজ সাজ রব। দিনরাত এক করে রঙ-তুলি আর বাঁশ-কাগজের শৈল্পিক বুননে ব্যস্ত সময় পার করছেন জেলার কয়েকশ সাংস্কৃতিক কর্মী।
ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় প্রতিবছরই যশোরের সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো বর্ষবরণে ভিন্নধর্মী সব আয়োজন করে থাকে। এ বছরও তার ব্যতিক্রম হচ্ছে না। জেলার প্রায় ৩০টি ছোট-বড় সাংস্কৃতিক সংগঠন এখন মাঠপর্যায়ে ব্যাপক প্রস্তুতি চালাচ্ছে। শহরের অলিগলি থেকে শুরু করে সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলোতে এখন শুধুই উৎসবের আমেজ। হাতি, ঘোড়া, বাঘের প্রতিকৃতি থেকে শুরু করে বিশাল সব পাপেট আর ফেস্টুন তৈরির কাজ চলছে পুরোদমে। নগরবাসীকে বৈশাখী উৎসবে মাতিয়ে তুলতেই কর্মীদের এই অক্লান্ত পরিশ্রম।
এবারের মঙ্গল শোভাযাত্রার থিম নির্ধারণ করা হয়েছে— ‘নিত্য নতুনের অমৃতধারা’। তবে এবারের আয়োজনে সবচেয়ে বড় চমক হিসেবে থাকছে প্রকৃতির প্রতি দায়বদ্ধতা। শোভাযাত্রার প্রতিটি শিল্পকর্মে ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে পরিবেশ সংরক্ষণের বার্তা।
চারুতীর্থ যশোরের সাধারণ সম্পাদক সজল ব্যানার্জী জানান, এবারের শোভাযাত্রার মূল আকর্ষণ থাকবে সূর্য, গাছ আর পাখি। তবে এগুলো শুধু জড় কোনো বস্তু নয়; শোভাযাত্রায় এই প্রকৃতি মানুষের মতোই হাত-পা নেড়ে হাঁটবে আর কথা বলবে। তিনি বলেন:
"আমাদের পৃথিবী থেকে যেভাবে গাছ ধ্বংস হচ্ছে, প্রকৃতির প্রতিটি প্রাণী আজ হুমকির মুখে। তারা কোথায় যাবে? এই প্রশ্নটিই আমরা মানুষের সামনে তুলে ধরতে চাই।"
চারুতীর্থের শিক্ষক নীলজয় যোগ করেন, ইতোমধ্যে গিরগিটি, পেঁচা, বাঘের মুখোশ ও রাজা-রানীর মুকুট তৈরির কাজ প্রায় শেষ। তাদের সবটুকু মেধা আর শ্রম দিয়ে প্রকৃতিকে উপস্থাপনের চেষ্টা চলছে।
দেশে বর্ষবরণ শোভাযাত্রার উদ্ভাবক মাহবুব জামাল শামীম এবারের আয়োজনে এক ভিন্নধর্মী দর্শনের কথা জানান। তার মতে, এই উৎসব হবে ধর্ম-মত নির্বিশেষে সকলের। তিনি বলেন:
"আমরা চাই এই শোভাযাত্রা যেন কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের প্রতীক হয়ে না ওঠে। বিশ্বজুড়ে আজ যে যুদ্ধ আর অশান্তি, সেই মিসাইল-বোমার পরিবর্তে আমরা সবুজ-সুফলা এক প্রকৃতির বার্তা দিতে চাই।"
তিনি আরও জানান, এবারের মঙ্গল শোভাযাত্রায় অংশ নেওয়া সাংস্কৃতিক কর্মীদের পারফরম্যান্সের ওপর ভিত্তি করে বিশেষ পুরস্কারের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
সাংস্কৃতিক কর্মী সীমান্ত হরির কণ্ঠে ঝরল দৃঢ় প্রত্যয়। তিনি জানান, বড়সড় পরিকল্পনা নিয়েই অনেক আগে কাজে নেমেছিলেন তারা। তাই এখন কেবল চলছে শেষ মুহূর্তের ছোঁয়া। তাদের বিশ্বাস, অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে এবারের মঙ্গল শোভাযাত্রা হবে অনেক বেশি আনন্দময় ও উৎসবমুখর।
পহেলা বৈশাখ মানেই যশোরের মানুষের কাছে এক প্রাণের মিলনমেলা। সেই মেলবন্ধনে প্রকৃতি আর বাঙালিয়ানাকে এক সুতোয় গাঁথতে প্রস্তুত এখন যশোর। শিল্পীদের তুলির আঁচড় বলে দিচ্ছে—পুরনো জরাজীর্ণতাকে ধুয়ে মুছে নতুন সূর্যকে বরণ করতে আর একদমই দেরি নেই।