ধ্রুব ডেস্ক
একটু শীতলতার জন্য পানিতে গা ভিজিয়ে রাখার চেষ্টা। ছবি: সংগৃহীত
জুন মাস মানেই বাংলাদেশে বর্ষাকালের শুরু। এ সময় আকাশে ঘন কালো মেঘ আর ঝুম বৃষ্টির চেনা রূপ দেখার কথা সবার। কিন্তু প্রকৃতি এবার যেন একেবারেই উল্টো আচরণ করছে! এক ফোঁটা বৃষ্টির জন্য যখন চারদিকে হাহাকার, তখন আকাশ থেকে টগবগ করা সূর্য যেন চোখ রাঙাচ্ছে। প্রখর রোদে পুড়ছে সারা দেশ, দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে যশোরসহ ৪১টি জেলাই এখন তীব্র দাবদাহের কবলে। আবহাওয়ার এই ওলটপালট আচরণের পেছনে রয়েছে বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা এবং ধেয়ে আসা এক বৈশ্বিক আতঙ্ক, যার নাম ‘এল নিনো’।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) বড় ধরনের সতর্কতা দিয়ে জানিয়েছে, চলতি বছরের শেষার্ধে প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের অস্বাভাবিক উষ্ণতার কারণে অত্যন্ত শক্তিশালী ‘এল নিনো’ সক্রিয় হয়ে ওঠার আশঙ্কা প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ। এর সরাসরি প্রভাবে বাংলাদেশে দীর্ঘস্থায়ী দাবদাহ, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং তীব্র খরার মতো বড় ধরনের দুর্যোগের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস একে বৈশ্বিক জলবায়ুর জন্য ‘জরুরি সতর্কবার্তা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার মহাসচিব সেলেস্তে সাওলো সতর্ক করেছেন, বিশ্বের প্রায় সব অঞ্চলেই আগামী কয়েক মাস স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাপমাত্রা বিরাজ করতে পারে।
বিশ্বের এই চরম সংকটের চড়া মূল্য এখনই দিতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। গতকাল মঙ্গলবার খুলনা, রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের বিস্তীর্ণ অঞ্চল, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, টাঙ্গাইল, ফরিদপুর, মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, ময়মনসিংহ, চাঁদপুর, নোয়াখালী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, লক্ষ্মীপুর, বরিশাল, পটুয়াখালী ও ভোলা জেলার ওপর দিয়ে মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের দাবদাহ বয়ে গেছে। মঙ্গলবার দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় নীলফামারীর সৈয়দপুরে, ৩৮ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক মো. মমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, বর্তমানে বাতাসে জলীয় বাষ্পের মাত্রা অনেক বেশি থাকায় শরীর থেকে অতিরিক্ত ঘাম ঝরছে এবং মানুষের মধ্যে অস্বস্তি ও গরমে হাঁসফাঁস অবস্থা চরম আকার ধারণ করেছে।
সাধারণত জুন মাসে দেশে গড়ে ৪৫৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়, যা বছরের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। কিন্তু আবহাওয়া অধিদপ্তরের দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস বলছে, বৈশ্বিক জলবায়ুতে এল নিনোর প্রভাবের কারণে এবার জুনে স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টি হতে পারে। এই মাসে দেশে আরও ২ থেকে ৩টি মৃদু থেকে মাঝারি দাবদাহের আশঙ্কা রয়েছে এবং কিছু এলাকায় তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি পৌঁছে যেতে পারে। আবহাওয়াবিদদের মতে, গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে দাবদাহের প্রকৃতি দ্রুত বদলে গেছে। আগে যেখানে কয়েক দিনের জন্য তাপমাত্রা বাড়ত, এখন সেখানে দীর্ঘ সময় ধরে তাপদাহ থাকছে। রাতের তাপমাত্রাও আগের মতো না কমায় মানুষের শরীর পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও পুনরুদ্ধারের সুযোগ পাচ্ছে না।
এল নিনোর এই সম্ভাব্য প্রভাব বাংলাদেশের অর্থনীতি, কৃষি ও জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. শরিফুল হক ভূঞা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা বাড়ছে এবং প্রয়োজনের সময় বৃষ্টি পাওয়া যাচ্ছে না। জলবায়ুসহিষ্ণু ফসল উদ্ভাবন করতে না পারলে কৃষি খাত বড় সংকটে পড়বে। ইতিমধ্যেই দাবদাহের কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আম ও লিচুর বাগান থেকে ফল ঝরে পড়ছে। এছাড়া বৃষ্টি কম হলে আমন ও বোরো চাষে সেচ ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে, যার ফলে উৎপাদন খরচ বাড়বে এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাবে। উপকূলীয় অঞ্চলে নদীর মিঠাপানির প্রবাহ কমে গেলে লবণাক্ততা বৃদ্ধির নতুন ঝুঁকি তৈরি হবে, যা কৃষি ও মৎস্য সম্পদের ক্ষতি করবে। অন্যদিকে, দীর্ঘ দাবদাহের ফলে হিটস্ট্রোক, পানিশূন্যতা, কিডনি জটিলতা ও ডায়রিয়ার মতো স্বাস্থ্যসংকট মহামারি আকার ধারণ করতে পারে।
তবে এই তীব্র গরমে অতিষ্ঠ জনজীবনের জন্য সাময়িক কিছুটা সুখবরও দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। আজ বুধবার দুপুরের মধ্যে ঢাকা, রংপুর, চট্টগ্রাম, সিলেট ও কক্সবাজারসহ কিছু এলাকায় পশ্চিম অথবা উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে ৪৫ থেকে ৬০ কিলোমিটার বেগে ঝোড়ো হাওয়াসহ বৃষ্টি বা বজ্রবৃষ্টি হতে পারে। এসব এলাকার নদীবন্দরগুলোকে ১ নম্বর সতর্ক সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। এর ফলে তাপমাত্রা সামান্য কমলেও এখনই ভারী বা টানা বৃষ্টির কোনো সম্ভাবনা নেই। আবহাওয়াবিদরা স্পষ্ট জানিয়েছেন, জুনের প্রথমার্ধে (১ থেকে ১৫ জুনের মধ্যে) মৌসুমি বায়ু বা বর্ষা বাংলাদেশ উপকূলে পুরোপুরি সক্রিয় না হওয়া পর্যন্ত এই তীব্র ভ্যাপসা গরম থেকে স্থায়ী মুক্তি মিলছে না।
জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো দাবদাহকে এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগ’ হিসেবে স্বীকৃতি না দেওয়া। বায়ুমণ্ডল দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের পরিচালক অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার এবং বুয়েটের বন্যা ও পানি ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এ কে এম সাইফুল ইসলাম দাবদাহ মোকাবিলায় জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা, আলাদা বাজেট, নগর বনায়ন, জলাধার রক্ষা এবং কৃষকদের জন্য জলবায়ু ঝুঁকি বীমা চালুর পরামর্শ দিয়েছেন। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু অবশ্য জানিয়েছেন, তাপমাত্রা কমাতে আগামী পাঁচ বছরে দেশে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর এবং উপকূলীয় এলাকায় ম্যানগ্রোভ বাগান সম্প্রসারণের একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার।