Ad for sale 990 x 90 Position (1)
Position (1)
শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬
Ad for sale 870 x 100 Position (2)
Position (2)

আকাশছোঁয়া দালানে দড়িতে ঝুলে থাকা প্রবাসীর জীবন

ধ্রুব ডেস্ক ধ্রুব ডেস্ক
প্রকাশ : শনিবার, ১৫ আগস্ট,২০২৬, ১০:১৪ এ এম
আকাশছোঁয়া দালানে দড়িতে ঝুলে থাকা প্রবাসীর জীবন

কুয়ালালামপুরের আকাশছোঁয়া কন্ডোমিনিয়ামের ঝকঝকে আধুনিকতার পেছনে যে হাড়ভাঙা খাটুনি আর জীবনের ঝুঁকি লুকিয়ে থাকে, তার একটি জীবন্ত প্রতিচ্ছবি দেখা গেল গত দুপুরের এক ঘটনায়। দুপুরের খাবার শেষ করে রুমে বিশ্রাম নিচ্ছিলাম, বাইরে কড়া রোদ। বের হওয়ার প্রস্তুতি নিতে নিতে জানালার দিকে তাকাতেই চোখ আটকে গেল এক অভাবনীয় দৃশ্যে।

জানালার ওপাশে দড়িতে বাঁধা এক মানুষ অবলীলায় ঝুলে আছে। মুহূর্তের ঘোর কাটিয়ে দ্রুত ব্যালকনিতে গিয়ে দেখি, তিনি আমাদেরই এক বাংলাদেশি ভাই। ওপরের ২১ কি ২২ তলা থেকে ভবনের সংস্কার বা রেনোভেশনের কাজ করতে করতে নিচে নামছেন।

আমি তখন ৬ তলায়, আর তিনি দড়ি বেয়ে নামছিলেন ৪ তলার পোডিয়াম লেভেলের দিকে—যেখানে কন্ডোমিনিয়ামের সুইমিংপুল, আধুনিক জিম, খেলার মাঠ আর দোকানপাটের মতো নাগরিক সব সুবিধা ছড়ানো। অর্থাৎ একদিকে যখন বিলাসবহুল জীবনযাপনের হাতছানি, তার ঠিক সমান্তরালে জানালার ওপাশেই চলছে জীবন বাজি রেখে এক তরুণের বেঁচে থাকার লড়াই।

পোডিয়াম লেভেলে নামার পর তার সঙ্গে কিছুক্ষণ আলাপের সুযোগ হলো। মাথায় হেলমেট, শরীরে আর কোমরে ঝুলে থাকার হুক লাগানো দড়ি। কোমরে ঝুলছে রঙের একটি খালি বালতি। তিনি কেন জানি আমার জানালার কাছে এসে কিছুক্ষণ থেমেছিলেন। তখনই আমি ঝটপট তার দুটো ছবি তুলে নিলাম। তিনি যখন পুরোপুরি নিচে নামলেন, আমি বললাম, “ভাই, আমি তো ওপর থেকে আপনার ঝুলে থাকার ছবি তুলতে চেয়েছিলাম।” উত্তরে এক চিলতে আক্ষেপ নিয়ে তিনি বললেন, “আগে বলেন নাই কেন?”

আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, “এখন কি আবার ওপরে ওঠা যাবে?” তখন তিনি এই কাজের একটি কারিগরি সীমাবদ্ধতার কথা জানালেন। দড়ি বেয়ে কেবল নিচেই নামা যায়, ওপরে ওঠার কোনো রাস্তা নেই। ওপরে উঠতে হলে আবার লিফটে করে একেবারে ২৯ তলায় যেতে হয়, তারপর সেখান থেকে দড়ি বেঁধে নামতে হয় নির্দিষ্ট কাজের তলায়। সেদিনও তিনি ২৯ তলায় উঠে ২১-২২ তলার দিকে নেমে কাজ শেষ করেছেন।

এই লড়াকু তরুণের নাম শাওন। বাড়ি কুমিল্লার কোতোয়ালি এলাকায়। ৪ বছর আগে ভাগ্যের চাকা ঘোরাতে তিনি মালয়েশিয়ায় এসেছেন। মালয়েশিয়ায় আসার পর থেকেই তিনি এই রেনোভেশন বা সংস্কার কাজের সঙ্গে যুক্ত। কোনো নির্দিষ্ট ভবনে নয়, বরং তার মালিক যখন যেখানে কাজের চুক্তি পান, শাওনকেও সেখানে গিয়ে দড়িতে ঝুলতে হয়।

আর্থিক দিক থেকে এই কাজ অন্য সব সাধারণ কাজের চেয়ে অনেক বেশি লাভজনক। মালয়েশিয়ায় বর্তমানে সাধারণ কর্মীদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ১ হাজার ৭০০ রিঙ্গিত। মাসে ২৬ দিন কর্মদিবস হিসাবে ধরলে দৈনিক আয় দাঁড়ায় ৬৫ রিঙ্গিতের কিছু বেশি। কিন্তু শাওনের দৈনিক মজুরি ১২০ রিঙ্গিত। অর্থাৎ প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত কাজ করেই তিনি সাধারণ শ্রমিকের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ আয় করছেন। এর বাইরে ওভারটাইম করলে আয়ের অংকটা আরও বড় হয়।

শাওনের শারীরিক গঠন আর কাজের অভিজ্ঞতা দেখে আমার মনে হয়েছিল তার বয়স ৩০ বা ৩৫ হবে। কিন্তু যখন বয়স জানতে চাইলাম, অবাক হয়ে শুনলাম তার বয়স মাত্র ২৪ বছর। অর্থাৎ ২০ বছর বয়সেই তিনি এই কঠিন প্রবাস জীবন বেছে নিয়েছেন। তার বড় ভাইও ১০ বছর ধরে মালয়েশিয়ায় এই একই কাজ করছেন। দেশে কোনোদিন এমন ঝুঁকিপূর্ণ কাজ না করলেও মালয়েশিয়ায় এসে পেটের তাগিদে আজ তিনি এতেই অভ্যস্ত।

“দেশে এই ধরনের কাজ করেছিলেন কি না”, জানতে চাইলাম। বললো, “দেশে করি নাই। মালয়েশিয়ায় এসেই করছি।” “ভয় লাগে কি না?”—এমন প্রশ্নে একগাল সরল হাসি দিয়ে শাওন বললেন, “না ভয় লাগে না, অভ্যাস হয়ে গেছে। অনেকদিন ধরে করি তো।”

শাওনের এই কাজটিকে শ্রমবাজারের পরিভাষায় বলা হয় ‘থ্রি-ডি’ কাজ। অর্থাৎ ‘ডেঞ্জারাস’ বা ঝুঁকিপূর্ণ, ‘ডিফিকাল্ট’ বা কঠিন এবং ‘ডার্টি’ বা অপরিচ্ছন্ন। এ ধারণার উৎপত্তি হয়েছিল জাপানে। জাপানি ভাষায় একে বলা হয় ‘থ্রি-কে’—অর্থাৎ কিৎসুই (কঠিন), কিতানাই (অপরিচ্ছন্ন) এবং কিকেন (ঝুঁকিপূর্ণ)। পরবর্তীতে এটি ইংরেজি ভাষায় ‘থ্রি-ডি’ হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পায়।

মালয়েশিয়ার সাধারণ নাগরিকরা কেন এসব কাজে যোগ দেয় না, সেই বিতর্কের জেরে প্রায় সাত-আট বছর আগে দেশটির তৎকালীন উপ-প্রধানমন্ত্রী আহমদ জাহিদ হামিদি বলেছিলেন, বিদেশি কর্মীদের মূলত এই ‘থ্রি-ডি’ কাজের জন্যই আনা হয়, যা স্থানীয়রা করতে চায় না।

শাওনের কাজটিতে এই তিনটি উপাদানেরই রয়েছে। ২১ তলার উচ্চতায় ঝুলে থাকা যেমন ঝুঁকিপূর্ণ, ভারসাম্য বজায় রেখে সেখানে কাজ করা তেমনি কঠিন। আর রঙের রাসায়নিক ও ধুলোবালির মধ্যে কাজ করা নিশ্চিতভাবেই অপরিচ্ছন্ন। এই তিন স্তরের ঝুঁকি মাথায় নিয়েই শাওনরা মালয়েশিয়ার আধুনিকায়নে অবদান রাখছেন।

‘আধুনিক মালয়েশিয়ার রূপকার’ হিসেবে পরিচিত মাহাথির মোহাম্মদ একবার বিদেশি কর্মীদের প্রশংসা করে বলেছিলেন, “তারা অত্যন্ত পরিশ্রমী এবং কাজে ফাঁকি দেয় না।” এমনকি কৌতুক করে তিনি এও বলেছিলেন যে, বিদেশি কর্মীদের এই কর্মতৎপরতা দেখে মালয়েশিয়ার নারীরাও এখন তাদের ‘জীবনসঙ্গী হিসেবে পছন্দ’ করতে শুরু করেছে। গত বছর অভিবাসী দিবসের এক অনুষ্ঠানে মালয়েশিয়ান নিয়োগকর্তারাও স্বীকার করেছেন যে, বাংলাদেশিসহ বিদেশি কর্মীদের ঘাম আর শ্রম ছাড়া মালয়েশিয়ার এই আকাশচুম্বী দালান নির্মাণ করা অসম্ভব ছিল।

এত অবদান আর ত্যাগের মাঝেও নিরাপত্তার ঘাটতি বারবার চোখে পড়ে। শাওনের মাথায় হেলমেট থাকলেও পায়ে ছিল সাধারণ জুতো, কোনো পেশাদার ‘সেফটি সুজ’ নয়। তাকে প্রশ্ন করলে তিনি জানালেন, এই কাজে বিশেষ ধরনের জুতো পরার নিয়ম থাকলেও তার মালিক তা কিনে দেয়নি। কয়েকবার চেয়েও তিনি পাননি। আমি তাকে উপদেশ দিয়ে বললাম, “আপনার নিরাপত্তা আপনার কাছেই সবচেয়ে বড়। দরকার হলে নিজের টাকায় জুতো কিনে নেবেন, কিন্তু ঝুঁকি নেবেন না।”

মালয়েশিয়ার সরকারি হিসাবমতে সেখানে ৮ লাখের বেশি বৈধ বাংলাদেশি কাজ করছেন। তবে অভিজ্ঞ প্রবাসীদের মতে, অনথিভুক্ত কর্মীদের মিলিয়ে এই সংখ্যা ১০ লাখ ছাড়িয়ে যাবে। যাদের একটি বড় অংশই নির্মাণ ও সংস্কার খাতের মতো এই ঝুঁকিপূর্ণ বা ‘থ্রি-ডি’ কাজে নিয়োজিত।

শাওনের মতো হাজারো তরুণের শ্রমে আমাদের দেশের রেমিট্যান্সের চাকা সচল থাকে। আমরা কেবল তাদের পাঠানো অর্থের হিসাব করি, কিন্তু জানালার ওপাশে দড়িতে ঝুলে থাকা সেই জীবনের গল্প আর ঝুঁকির কথা কয়জন মনে রাখি? শাওনরা ভালো থাকুক, নিরাপদে থাকুক—এটুকুই আমাদের চাওয়া।

 সূত্র: বিডি নিউজ

ধ্রুব নিউজের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

💬 Comments

Login | Register
Ad for sale 270 x 225 Position (3)
Position (3)
Ad for sale 990 x 90 Position (4)
Position (4)