Ad for sale 990 x 90 Position (1)
Position (1)
শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬
Ad for sale 870 x 100 Position (2)
Position (2)

রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ : আইনি ধারাবাহিকতা, না কি সাংবিধানিক সংকট

ড. মো. মেসবাহ উদ্দীন ড. মো. মেসবাহ উদ্দীন
প্রকাশ : শুক্রবার, ২৪ জুলাই,২০২৬, ০৪:১৪ পিএম
আপডেট : শুক্রবার, ২৪ জুলাই,২০২৬, ০৪:২৮ পিএম
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ : আইনি ধারাবাহিকতা, না কি সাংবিধানিক সংকট

​সম্প্রতি দেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় রাষ্ট্রপতি পদত্যাগের বিষয়টি আলোচনার শীর্ষে উঠে এসেছে। সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জেগেছে—রাষ্ট্রপতি যদি পদত্যাগ করেন, তবে কি দেশে একটি নতুন সাংবিধানিক শূন্যতা বা সংকট তৈরি হবে ? নাকি বিদ্যমান সংবিধানের ভেতরেই এর সমাধান রয়েছে ? একজন নাগরিক হিসেবে কিংবা দেশের শাসনতান্ত্রিক ব্যবস্থার পর্যবেক্ষক হিসেবে এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা অত্যন্ত জরুরি। কারণ যেকোনো গণতান্ত্রিক বা রূপান্তরকালীন রাষ্ট্রে প্রধান নির্বাহী বা রাষ্ট্রপ্রধানের পদ খালি হওয়া খুবই স্বাভাবিক,তা কেবল ব্যক্তি পরিবর্তনের বিষয় নয়, রাষ্ট্রের প্রশাসনিক ও আইনি ধারাবাহিকতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত এবং তা সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় সমাধান করা সম্ভব !

 সাংবিধানিক সংকট আসলে কী?

​সহজ কথায়, সাংবিধানিক সংকট বলতে এমন একটি পরিস্থিতিকে বোঝায় যেখানে রাষ্ট্রের সংবিধানের বিধান অনুযায়ী সরকার গঠন, পরিচালনা বা কোনো বিশেষ সমস্যা সমাধানের স্পষ্ট দিকনির্দেশনা পাওয়া যায় না, অথবা সংবিধানের দুই বা ততধিক বিধানের মধ্যে এমন সংঘর্ষ ঘটে যা সমাধান করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
​রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের ক্ষেত্রে সংকটটি মূলত দুটি দিক থেকে আলোচিত হচ্ছে:

ক. রাষ্ট্রপতির পদ খালি হলে কে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হবেন?
খ.যদি সংবিধান নির্ধারিত সাধারণ নিয়মাবলি প্রয়োগের জন্য স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক পরিবেশ (যেমন: সচল জাতীয় সংসদ বা স্পিকার) উপস্থিত না থাকে, তবে পরিস্থিতি কী দাঁড়াবে?

বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্রপতির পদসংক্রান্ত বিধান :
​আমাদের সংবিধানের ৫০, ৫২ এবং ৫৪ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতির মেয়াদ, পদত্যাগ এবং অনুপস্থিতি সংক্রান্ত স্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে।

​অনুচ্ছেদ ৫০(৩) : রাষ্ট্রপতি স্পিকারের উদ্দেশ্যে স্বাক্ষরযুক্ত পত্রের মাধ্যমে পদত্যাগ করতে পারেন।
​অনুচ্ছেদ ৫৪ : রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে বা অনুপস্থিতি, অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হলে, ক্ষেত্রমত স্পিকার অথবা ডিপুটি স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন।
​সংবিধানের স্বাভাবিক ধারায় নিয়মটি অত্যন্ত স্পষ্ট—রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করলে স্পিকার অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট সাধারণ সময়ের মতো নয়। ফলে অনুচ্ছেদ ৫৪-এর সরাসরি প্রয়োগ নিয়ে একটি আইনি ও রাজনৈতিক প্রশ্ন সামনে চলে এসেছে।

স্পিকারের অনুপস্থিতি এবং 'শূন্যতার নীতি' :
​সংবিধান অনুযায়ী স্পিকার পদত্যাগ করলেও নতুন স্পিকার দায়িত্ব না নেওয়া পর্যন্ত তিনি পদে বহাল থাকেন বলে একটি মত চালু আছে (অনুচ্ছেদ ৫৭)। তবে স্পিকার যদি শারীরিকভাবে অনুপস্থিত থাকেন বা পদত্যাগের পর কার্যভার গ্রহণে অপারগ হন, তবে কে দায়িত্ব নেবেন?


​দুটি ধারায়  আইনজ্ঞদের মতামত 

​প্রথম ধারা: প্রথাগত ও কঠোর আইনি ব্যাখ্যা

​এই ধারা অনুযায়ী, স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার ছাড়া অন্য কারো কাছে রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করতে পারেন না। যদি স্পিকার না থাকেন এবং রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করেন, তবে রাষ্ট্রপ্রধানের পদ শূন্য হয়ে পড়ে, যা একটি স্পষ্ট সাংবিধানিক সংকটের জন্ম দেয়। এই ব্যাখ্যা মতে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে কোনো সংসদ না থাকায় নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সুযোগও তাৎক্ষণিকভাবে থাকে না।

​দ্বিতীয় ধারা : রাষ্ট্রচিন্তা ও 'প্রয়োজনীয়তার নীতি' (Doctrine of Necessity)

​আইনশাস্ত্রের একটি সুপ্রাচীন নীতি হলো—Salus Populi Suprema Lex (জনকল্যাণই সর্বোচ্চ আইন)। এর ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে 'প্রয়োজনীয়তার নীতি'। এই ধারার সমর্থকদের মতে, রাষ্ট্র কখনো অভিভাবকহীন থাকতে পারে না। রাজনৈতিক অভ্যুত্থান বা গণআন্দোলনের পর যখন দেশে এক অভূতপূর্ব পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, তখন সংবিধানের যান্ত্রিক প্রয়োগের চেয়ে রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা প্রধান বিবেচ্য হয়ে ওঠে।

​১৯৯০ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের দিকে তাকালে আমরা এর ঐতিহাসিক প্রমাণ পাই। তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ যখন প্রধান উপদেষ্টার (অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি) দায়িত্ব নেন, তখন সংবিধানের প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতেই সেই রূপান্তর ঘটানো হয়েছিল। পরবর্তীতে পঞ্চম জাতীয় সংসদে তা আইনি বৈধতা পায়।


 তিন স্তরের আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতা 

​রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ তাৎক্ষণিকভাবে যে সংকটগুলো তৈরি করতে পারে, সেগুলোকে তিনটি প্রধানভাগে ভাগ করা যায়:

ক. শপথ গ্রহণ ও আনুষ্ঠানিকতার সংকট :
​নতুন রাষ্ট্রপ্রধান বা অন্তর্বর্তী প্রধানকে শপথ পাঠ করাবেন কে? সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতিকে শপথ পাঠ করান স্পিকার। আবার অন্তর্বর্তীকালীন উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যদের শপথ পাঠ করিয়েছেন রাষ্ট্রপতি নিজে। রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে এবং স্পিকার না থাকলে একটি প্রশাসনিক অচলাবস্থা তৈরির ঝুঁকি থেকে যায়।

​খ. অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বৈধতার প্রশ্ন
​বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সংবিধানের বাইরে গণ-অভ্যুত্থানের জন আকাঙ্ক্ষার ওপর ভিত্তি করে গঠিত হলেও, প্রাতিষ্ঠানিক কাজের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতিই প্রশাসনিক আদেশের মূল ভিত্তি। রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করলে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধ্যাদেশ জারি বা নির্বাহী সিদ্ধান্ত গ্রহণের আইনি কাঠামো কিছুটা নড়বড়ে হতে পারে, যা আইনি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে পারে।

​গ. আন্তর্জাতিক বৈধতা ও কূটনৈতিক সম্পর্ক) 
​আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপ্রধানের পদটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশী রাষ্ট্রদূতদের পরিচয়পত্র গ্রহণ, চুক্তি অনুস্বাক্ষর এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্বের জন্য একজন আইনি প্রধান আবশ্যক। দীর্ঘমেয়াদে এই পদ খালি থাকলে বা বিতর্কিত হলে কূটনৈতিক ক্ষেত্রে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।

 সংকট নিরসনে সম্ভাব্য আইনি পথরেখা

​সংকট যাতে সৃষ্টি না হয়, বা হলেও যেন তা দ্রুত সমাধান করা যায়—তার জন্য বেশ কিছু আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক পথ খোলা রয়েছে-

ক.​আপিল বিভাগের অভিমত গ্রহণ (অনুচ্ছেদ ১০৬) : সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, জনগুরুত্বপূর্ণ যেকোনো আইনি বিষয়ে রাষ্ট্রপতি বা সরকার প্রধান আপিল বিভাগের কাছে ব্যাখ্যা বা পরামর্শ চাইতে পারেন। সুপ্রিম কোর্ট এ বিষয়ে নির্দেশনা দিলে তা সাংবিধানিক ভিত্তি পাবে।

খ.​প্রধান বিচারপতির ভূমিকা : স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতিতে রাষ্ট্রপ্রধানের শূন্যপদ পূরণে প্রধান বিচারপতি বা তাঁর মনোনীত জ্যেষ্ঠ বিচারপতিকে অস্থায়ী দায়িত্বে আনয়ন করা যেতে পারে—যা রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে অধ্যাদেশ বা ঘোষণার মাধ্যমে বাস্তবায়ন সম্ভব।

গ.​রাজনৈতিক ঐকমত্য ও 'সংবিধানিক ঘোষণাপত্র' : (Proclamation): গণআন্দোলন-পরবর্তী পরিস্থিতিতে অনেক সময় 'জরুরি রূপান্তরকালীন আদেশ' বা 'সংবিধানিক আদেশ' দিয়ে সংকট নিরসন করা হয়। বাংলাদেশের ইতিহাসেই এর একাধিক নজির রয়েছে ।

​সারসংক্ষেপ হলো—রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ একটি আইনি ও প্রযুক্তিগত জটিলতা তৈরি করবে ঠিকই, কিন্তু এটি কোনো অনিবার্য ধ্বংসাত্মক সংকট নয়—যদি দেশে রাজনৈতিক ঐকমত্য ও দূরদর্শিতা থাকে। ​সংবিধান মানুষের জন্য, মানুষ সংবিধানের জন্য নয়। রাষ্ট্রের অস্তিত্ব, জননিরাপত্তা এবং গণতান্ত্রিক উত্তরণের স্বার্থে আইনি কাঠামোর নমনীয় ব্যাখ্যা দেওয়া ইতিহাসজুড়েই দেখা গেছে। রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের ক্ষেত্রে কেবল প্রশাসনিক শূন্যতার ভয় না পেয়ে প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত একটি স্পষ্ট রূপরেখা তৈরি করা। আইন ও ইতিহাসের শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিলে যেকোনো বড় ধরনের সাংবিধানিক সংকট সহজেই এড়ানো সম্ভব।

লেখক: গবেষক, বিশ্লেষক ও গ্রন্থপ্রণেতা

আরও পড়ুন-

অশান্ত দিল্লির রাজপথ : অনিশ্চিত গন্তব্যে ভারতের রাজনীতি অশান্ত দিল্লির রাজপথ : অনিশ্চিত গন্তব্যে ভারতের রাজনীতি

 

ধ্রুব নিউজের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

💬 Comments

Login | Register
Ad for sale 270 x 225 Position (3)
Position (3)
Ad for sale 990 x 90 Position (4)
Position (4)