এন্ড্রু ফক্স
ইরানের ওপর আমেরিকার সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। কিন্তু আসল প্রশ্ন এটি নয় যে আমেরিকা ইরানের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করতে পারবে কি না; বরং প্রশ্ন হলো—তারা কি ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের শাসনব্যবস্থার পতন ঘটাতে পারবে? এবং পরবর্তী পরিস্থিতি কি তারা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে? আকাশপথে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন একটি সামরিক অবস্থা, কিন্তু শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন একটি রাজনৈতিক ফলাফল। ইরানের ওপর সম্ভাব্য মার্কিন হামলা নিয়ে আলোচনার সময় অনেকেই এই দুটি বিষয়কে গুলিয়ে ফেলেন। ২০২৩-২৫ সালে লেবানন ও সিরিয়ায় ইসরায়েলের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে যে, আধুনিক বিমান হামলা প্রতিপক্ষের কাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি করতে পারলেও তাদের অস্তিত্ব পুরোপুরি মিটিয়ে দিতে পারে না। রক্তাক্ত ও ক্ষতবিশত হওয়ার পরও প্রতিপক্ষ তাদের অবদমনমূলক যন্ত্রপাতি নিয়ে টিকে থাকতে পারে।
গত বছরের '১২ দিনের যুদ্ধ' ছিল এক সাহসী অভিযান, কারণ এটি কেবল বিমান হামলার ওপর নির্ভরশীল ছিল না। এতে ছিল সাইবার হামলা, গোপন নাশকতা এবং রাডার ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার ওপর একের পর এক নিখুঁত আঘাত। উদ্দেশ্য ছিল—শাসকগোষ্ঠীর নিরাপত্তা বোধ গুঁড়িয়ে দেওয়া এবং তাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকে পঙ্গু করা। এই অভিজ্ঞতাই অনেককে বিশ্বাস করতে বাধ্য করেছে যে, ইরানের শাসনব্যবস্থাকে উৎখাত করা কেবল সময়ের ব্যাপার। কিন্তু এই ধারণাটি ইরানের টিকে থাকার কৌশলকে উপেক্ষা করে। যেই শাসনব্যবস্থা বারবার হত্যার চেষ্টা থেকে বেঁচে ফেরে, তারা আরও বেশি সতর্ক ও বিবর্তিত হয়। ইরান এখন আর কোনো সাধারণ লক্ষ্যবস্তু নয় যা কোনো অফিসারের পাওয়ারপয়েন্ট স্লাইডে সহজেই ধরা দেবে। ২০২৫ সালের হামলার পর ইরানি নেতারা সামরিক ক্ষতির কথা স্বীকার করলেও দাবি করেছেন যে, তারা ইতিমধ্যেই গোপন ও সংরক্ষিত ব্যবস্থার মাধ্যমে সেগুলো প্রতিস্থাপন করেছেন। এটি কেবল দুর্বলতা লুকানোর চেষ্টা নয়, বরং এটি ইঙ্গিত দেয় যে ইরান যুদ্ধকে কোনো একক সংঘাত হিসেবে দেখে না; বরং তারা একে দীর্ঘমেয়াদী টিকে থাকার লড়াই হিসেবে বিবেচনা করে। যেখানে টিকে থাকাই হলো তাদের বিজয়।
যুক্তরাষ্ট্র খুব সহজেই ইরানের আকাশসীমার নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে। কিন্তু এই স্বাধীনতা রাজনৈতিকভাবে কতটা কার্যকর হবে? ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কোনো দুর্ভেদ্য দেয়াল নয়, তবে তারা এখন অনেক বেশি অভিজ্ঞ। ২০২৫ সালের পর তারা তাদের রাডার কভারেজ বাড়িয়েছে এবং সফটওয়্যার পুনর্গঠন করেছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, ইরান কেবল আত্মরক্ষায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। তেহরান মার্কিন শ্রেষ্ঠত্বের পাল্টা জবাব দিতে পারে সমুদ্রপথে প্রক্সি যুদ্ধ, সাইবার হামলা এবং উত্তেজনাকর রাজনীতির মাধ্যমে। চীনের কাছ থেকে সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র কেনার চুক্তি সেই ইঙ্গিতই দেয়। ওয়াশিংটনকে পরাজিত করা ইরানের লক্ষ্য নয়; তাদের লক্ষ্য হলো আমেরিকার জন্য এই যুদ্ধকে অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও বিপজ্জনক করে তোলা।
একটি শাসনব্যবস্থা কেবল কয়েকজন নেতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না। এটি নিরাপত্তা সংস্থা, অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক এবং ধর্মীয় কাঠামোর এক জটিল জাল। শীর্ষ নেতাদের হত্যা করা হলেও বাকিরা আত্মগোপনে চলে যাবে। তখন তাদের একমাত্র লক্ষ্য হবে 'টিকে থাকা'। আর এই টিকে থাকার লড়াইয়ে 'সময়' তাদের সবচেয়ে বড় সম্পদে পরিণত হয়। একনায়কতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা সাধারণত প্রতিপক্ষের ধৈর্যের পরীক্ষা নেয়। যেখানে আমেরিকা সংবাদ চক্র, জনমত এবং নির্বাচনী হিসাব-নিকাশে বন্দি, সেখানে ইরানি শাসকরা কেবল সময়ক্ষেপণ করেই সফল হতে পারে। সাম্প্রতিক জরিপগুলো বলছে, আমেরিকানরা ইরানকে শত্রু হিসেবে দেখলেও বড় ধরনের যুদ্ধে জড়ানোর বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের ওপর তাদের আস্থা কম। যদি দ্রুত জয় না আসে, তবে ওয়াশিংটন একসময় 'মিশন সফল' ঘোষণা করে পিছু হটতে বাধ্য হতে পারে।
মার্কিন জয়েন্ট চিফস ইতিবাচক ফলাফল নিয়ে সতর্ক করেছেন। গোলাবারুদ ফুরিয়ে আসা এবং মধ্যপ্রাচ্যের মিত্রদের ঝুঁকি নেওয়ার অনীহা বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। যদি শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন হয়ও, তবে তার ফলাফল কী হবে? ভেনেজুয়েলার উদাহরণ আমাদের শেখায় যে, ক্ষমতা কাঠামো অক্ষুণ্ণ থাকলে কেবল নেতা পরিবর্তন করে বিশেষ লাভ হয় না। ইরানেও হয়তো কেবল কিছু দৃশ্যমান মুখ বদলে যেতে পারে, যা ওয়াশিংটনকে একটি সাময়িক চুক্তির সুযোগ দেবে। অন্য বিকল্পটি আরও ভয়াবহ। নেতৃত্বের পতন ঘটালে ইরানে গৃহযুদ্ধ বা চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে। যদি শাসকগোষ্ঠী নিজেদের অস্তিত্ব সংকটে দেখে, তবে তারা রাসায়নিক বা জৈবিক অস্ত্রের মতো আত্মঘাতী পথও বেছে নিতে পারে।
আমেরিকা ইরানের সামরিক ক্ষমতা ভেঙে দিতে পারবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু তারা কি ইরানের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ নিতে পারবে? এবং সেই শূন্যস্থানে কী আসবে? আকাশপথে আধিপত্য মানেই রাজনৈতিক বিজয় নয়। ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে 'বিজয়' ঘোষণা করা সহজ, কিন্তু সেই ধ্বংসস্তূপ থেকে একটি স্থিতিশীল ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা প্রায় অসম্ভব। যুক্তরাষ্ট্র হয়তো ইরানের ক্ষমতা গুঁড়িয়ে দেবে, কিন্তু শাসনব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ ভাঙা এবং একটি মসৃণ সমাপ্তি নিশ্চিত করা—আজও এক বিরাট অনিশ্চয়তা।
ইরান ইন্টারন্যাশনাল থেকে রূপান্তর ও সংক্ষিপ্তকরণ : মহিউদ্দীন মোহাম্মদ