তহীদ মনি
শপথ গ্রহণের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের আকাশসীমায় দীর্ঘ ৬,৩১৪ দিন পর যখন একটি ডানা মেলানো উড়োজাহাজ প্রবেশ করল, সেটি কেবল একজন নেতার ঘরে ফেরা ছিল না, সেটি ছিল বাংলাদেশের রাজনীতির এক মহাকাব্যিক মোড়। ১৭ বছরের দীর্ঘ প্রবাস জীবন, অসংখ্য মামলা, শারীরিক নির্যাতন আর বিদেশের মাটিতে বসে দলকে আগলে রাখার এক রুদ্ধশ্বাস লড়াই শেষে আজ সেই মানুষটিই বসলেন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আসনে। আজ ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬; বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান থেকে তারেক রহমান এখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী।
ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি জারি হওয়া জরুরি অবস্থা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ধারায় এক বিশাল ক্ষত তৈরি করেছিল। সেই উত্তাল সময়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া গ্রেপ্তার হন। রাজনৈতিক অঙ্গনে তখন দানা বাঁধে কুখ্যাত ‘মাইনাস ফর্মুলা’। ষড়যন্ত্রের নীল নকশা তৈরি হয় প্রধান দুই দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে রাজনীতি থেকে চিরতরে মুছে ফেলার।
সেই ঝড়ের কবলে পড়ে ২০০৭ সালের ৭ মার্চ গ্রেপ্তার হন বিএনপির তৎকালীন সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান। কারাগারে থাকাকালীন তার ওপর চালানো হয় অমানবিক শারীরিক নির্যাতন। আদালতে দেওয়া জবানবন্দি এবং পেশ করা মেডিকেল নথিতে সেই নির্যাতনের ক্ষতচিহ্ন ফুটে ওঠে বিশ্ববাসীর সামনে। অবশেষে চিকিৎসার তাগিদে ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর তিনি পাড়ি জমান লন্ডনে। কেউ ভাবেনি, এই যাত্রা তাকে দীর্ঘ ১৭ বছর স্বদেশ থেকে দূরে রাখবে।
লন্ডনের প্রবাস জীবন তারেক রহমানের জন্য কোনো আরামদায়ক নির্বাসন ছিল না। ২০১৮ সালে খালেদা জিয়া পুনরায় কারারুদ্ধ হলে দলের সব দায়িত্ব এসে পড়ে তার কাঁধে। আদালতের নিষেধাজ্ঞা আর সরকারের কঠোর সেন্সরশিপের কারণে দেশে তার কণ্ঠস্বর স্তব্ধ করার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তি আর ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেন তিনি।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে লন্ডনের ঘর থেকেই তিনি পৌঁছে যান বাংলাদেশের প্রতিটি কোণে, প্রতিটি তৃণমূল কর্মীর ড্রয়িংরুমে। দলীয় সূত্র দাবি করে, আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের করুণ দশা তুলে ধরতে তিনি এক মুহূর্ত বিশ্রাম নেননি। তার এই কৌশলগত পরিচালনা বিএনপিকে এক কঠিন সময়ে ভেঙে পড়া থেকে রক্ষা করে।
তারেক রহমানের আহ্বানে সাড়া দিয়ে বিএনপি যখন রাজপথে আন্দোলনে নামে, তখন তা কেবল একটি রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। দমন-পীড়নের চরমে পৌঁছে আন্দোলনটি স্বৈরাচারবিরোধী গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। মূলত ছাত্রদের কল্যাণে শুরু হওয়া এই আন্দোলন সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে ‘জুলাই বিপ্লব’ হিসেবে বিশ্বজুড়ে নন্দিত হয়। আধুনিক প্রযুক্তি আর ভার্চুয়াল বার্তার মাধ্যমে তারেক রহমান এই আন্দোলনে জ্বালানি জোগান। শেখ হাসিনার একচ্ছত্র আধিপত্যকে চূর্ণ করে দিয়ে এই বিপ্লব প্রমাণ করে—নেতৃত্ব যখন জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া হয়, তখন তা অপরাজেয় হয়ে ওঠে।
২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর। ১৭ বছরের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান। তারেক রহমান যখন বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখলেন, তখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার সেই পোস্টটি দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে। উড়োজাহাজের জানালার পাশে তোলা একটি ছবি শেয়ার করে তিনি লিখেছিলেন, “দীর্ঘ ৬ হাজার ৩১৪ দিন পর বাংলাদেশের আকাশে!”।
রাজধানীর পূর্বাচলের ‘৩৬ জুলাই এক্সপ্রেস’ সংবর্ধনা মঞ্চে লাখো মানুষের ঢল নামে তাকে বরণ করে নিতে। কিন্তু আনন্দের মাঝেই নেমে আসে শোকের ছায়া। ৩০ ডিসেম্বর বিদায় নেন তিনবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির প্রাণভোমরা খালেদা জিয়া। শোককে শক্তিতে রূপান্তর করে ৯ জানুয়ারি ২০২৬-এ দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির সিদ্ধান্তে আনুষ্ঠানিকভাবে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন তারেক রহমান।
চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি ঘোষণা করেন ৩১ দফার এক ঐতিহাসিক ইশতেহার, যার মূল মন্ত্র ছিল ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। রাষ্ট্র পরিচালনায় জবাবদিহি, নির্বাচন ব্যবস্থার আমূল সংস্কার এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি নির্বাচনী ময়দানে নামেন। বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত সিলেট থেকে প্রচারণা শুরু করে দেশের প্রতিটি প্রান্তে তিনি জনসভা করেন। নির্বাচনের দুই দিন আগে রাজধানীর ১৪টি পথসভায় সাধারণ মানুষের চোখের ভাষা পড়ার চেষ্টা করেন তিনি।
ফলাফল আসে ১২ ফেব্রুয়ারি। ২৯৭টি আসনের মধ্যে ২১২টি আসনে জয়লাভ করে বিএনপি এক অপ্রতিরোধ্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। তারেক রহমান নিজে ঢাকা ও বগুড়ার দুটি আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মনোনীত হন।
মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) সকাল সাড়ে ১১টা। জাতীয় সংসদ ভবনের শপথ কক্ষে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ পড়ান। এরপর বিকেল ৪টায় শুরু হয় সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায়, যেখানে এর আগে কখনো কোনো প্রধানমন্ত্রী শপথ নেননি, সেখানে দাঁড়িয়ে ২২তম রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিনের কাছে শপথ বাক্য পাঠ করেন তারেক রহমান।
একই পরিবারের তিন সদস্যের রাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায়ে দায়িত্ব নেওয়ার ঘটনাটি বিশ্ব রাজনীতিতে এক অনন্য অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হলো। এখন তার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ—জুলাই যোদ্ধাদের হাত ধরে গড়ে ওঠা নতুন বাংলাদেশকে বিশ্বমঞ্চে এক মর্যাদাপূর্ণ স্থানে নিয়ে যাওয়া।
আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মোবাশ্বের হোসেন এই প্রত্যাবর্তনকে ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে— ‘তারেক রহমানের এই অর্জনের পেছনে তার মা খালেদা জিয়ার দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি ও ত্যাগের অবদান অনস্বীকার্য। ২০০৮ সালে বিদেশে গিয়েও তিনি রাজনীতি ছাড়েননি, বরং নিজেকে আরও পরিণত করেছেন।’
‘তারেক রহমান তরুণদের মধ্যে এক নতুন স্পৃহা তৈরি করেছেন। যে দলকে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা হয়েছিল, সেই দল আজ তার মনোবল ও সংঠন দক্ষতায় ক্ষমতার কেন্দ্রে।’
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী আসলামের মতে, ‘স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তারেক রহমানের ভার্চুয়াল দিকনির্দেশনা ছিল যুগের চেয়েও অগ্রগামী। মেধা আর ত্যাগের মাধ্যমেই তিনি আজ বাংলাদেশের মানুষের আস্থার প্রতীকে পরিণত হয়েছেন।’
নির্বাসন থেকে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে—তারেক রহমানের এই দীর্ঘ পথচলা যেন এক হার না মানা সংগ্রামের আখ্যান। এখন সারা বিশ্বের নজর থাকবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বের দিকে; তিনি কীভাবে তাঁর নির্বাচনী অঙ্গীকার পূরণ করেন এবং রাষ্ট্র সংস্কারের নতুন পথ দেখান।