❒ বসন্তের প্রথম দিনে
ড. মহিউদ্দীন মোহাম্মদ
আজ পহেলা ফাল্গুন। ঋতুরাজ বসন্তের প্রথম দিনে প্রকৃতি যখন কৃষ্ণচূড়া আর শিমুলের রাঙা হাসিতে সেজে উঠেছে, ঠিক তখনই আমাদের প্রিয় যশোর এক নতুন রাজনৈতিক ও সামাজিক বসন্তের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে। "বসন্ত জাগ্রত দ্বারে"—এই সত্য আজ কেবল প্রকৃতির জন্য নয়, আমাদের যশোরের মানুষের হৃদয়েও প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। আজ উৎসবের দিন, খুশির দিন, আবার দীর্ঘদিনের রুদ্ধশ্বাস যন্ত্রণার অবসান ঘটিয়ে নতুন করে দাবি ও স্বপ্নের কথা উচ্চস্বরে বলার দিন। এই ফাল্গুনের দখিনা বাতাসে আমরা আমাদের নবনির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাছে একরাশ প্রত্যাশার ডালি মেলে ধরেছি।
বিজয়ের অভিনন্দন ও আগামীর আহ্বান
যশোরবাসী তাদের ভোটাধিকার ফিরে পাওয়ার এক দীর্ঘ সংগ্রাম শেষে আজ নতুন প্রতিনিধিদের বেছে নিয়েছে। অভিনন্দন জানাই সেই তরুণ তুর্কি, আমাদের প্রাণের স্পন্দন অনিন্দ্য ইসলাম অমিতকে। অভিনন্দন অধ্যাপক গোলাম রসুল, অধ্যাপক মোক্তার আলী, মাওলানা আজীজুর রহমান, অ্যাডভোকেট গাজী এনামুল হক এবং ডাক্তার মোসলেহ উদ্দিন ফরিদকে। আপনারা কেবল বিজয়ী হননি, আপনারা কয়েক লক্ষ মানুষের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত হাহাকার আর আগামীর স্বপ্নের জিম্মাদার হয়েছেন।
যারা পরাজিত হয়েছেন, তাদের প্রতিও জানাই আন্তরিক মোবারকবাদ। আপনাদের অংশগ্রহণ এই নির্বাচনকে দীর্ঘকাল পর একটি উৎসবে রূপ দিয়েছে। এবার মানুষ নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে যেতে পেরেছে, যা গত দেড় দশকে ছিল অকল্পনীয়।
ফ্যাসিস্ট শাসনের স্মৃতি ও ভোটাধিকারের পুনরুদ্ধার
আমরা ভুলিনি সেই বিভীষিকাময় রাতের ভোটগুলোর কথা। ফ্যাসিস্ট শক্তির দাপটে মানুষ যখন নিজ অধিকার হারিয়ে নিভৃতে কেঁদেছে। সেই সময় রাতের আঁধারে কেন্দ্রের আশপাশে ফ্যাসিস্টদের পাহারা আমরা দেখেছি। সাধারণ মানুষ বুঝতেও পারতো না ভোটকেন্দ্রে কী হচ্ছে, অথচ পরদিন সকালে জানা যেত 'ভোট হয়ে গেছে'।
ব্যক্তিগত এক অভিজ্ঞতার কথা মনে পড়ে—একবার সকাল বেলা বংশের অনেকজন একসাথে হয়ে ভোট দিতে রওনা দিয়েছিলাম। পথে পথে ফ্যাসিস্টদের বাধা। তারা দম্ভভরে বলেছিল, "ভোট হয়ে গেছে আপনার, কোথায় যাচ্ছেন?" আমি বলেছিলাম, সবাই মিলে ভোট দিতে যাচ্ছি। তারা ভ্রূকুটি করে বলেছিল, "বাড়ি ফিরে যান।" আমরা সেদিন দৃঢ়চেতা ছিলাম বলে আমাদের পিছু হটানোর জন্য পেছনে ককটেল ফোটানো হয়েছিল। সেদিনের পশ্চিম বারান্দী পাড়ার সেই চিত্র ছিল পুরো যশোরের প্রতিচ্ছবি। কিন্তু এবারের চিত্র ভিন্ন। এবার আমরা ভোট দিয়েছি, উৎসবে শামিল হয়েছি। ফ্যাসিস্ট শাসনের সেই অবসান আমাদের মনে অনেক আশা আর ভরসার সঞ্চার করেছে। আশা করি, জনপ্রতিনিধিরা আমাদের এই মুক্তির স্বাদ অক্ষুণ্ণ রাখবেন।
তরিকুল ইসলাম: উন্নয়নের অবিনাশী কারিগর
যশোরের কথা বলতে গেলে একজনের নাম ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে—তিনি আমাদের অভিভাবক, তরিকুল ইসলাম। অন্য জেলায় গেলে যখন মানুষ জিজ্ঞেস করে, "আপনার বাড়ি কি তরিকুল ইসলামের জেলায়?"—তখন বুকটা গর্বে ভরে ওঠে। তিনি ছিলেন উন্নয়নের কারিগর, এক ক্লান্তিহীন স্বপ্নবাজ রাজনীতিক। যশোরের যা কিছু দৃশ্যমান উন্নয়ন আজ আমরা দেখি, তার প্রতিটিতে হৃদস্পন্দনের মতো মিশে আছেন তরিকুল ইসলাম। তরিকুল ইসলাম স্বপ্ন দেখতেন এবং সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করতেন। তার সেই শূন্যতা কোনোদিন পূরণ হবার নয়, কিন্তু তার অসামান্য অবদান আমাদের পথ দেখাবে।
যশোরের মৃত্তিকা ও কৃতি সন্তানদের আখ্যান
যশোর কেবল একটি ভৌগোলিক সীমারেখা নয়, এটি একটি জীবন্ত মহাকাব্য। এই মাটির গন্ধে মিশে আছে বিদ্রোহী কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের কপোতাক্ষ নদের কুলুকুলু ধ্বনি। এই জনপদেই অনুরণিত হয় বিশ্ববন্দিত সেতার বাদক পন্ডিত রবিশঙ্করের তিন তারের সম্মোহনী ঝঙ্কার। এখানেই জন্ম নিয়েছেন বিশ্বখ্যাত নৃত্যশিল্পী উদয়শঙ্কর, যার তনুমুদ্রায় লাস্য ও তাণ্ডবের ধ্রুপদী ছন্দ খুঁজে পায় বিশ্ববাসী।
আমাদের আধ্যাত্মিক চেতনার বাতিঘর হয়ে আছেন হজরত গরীব শাহ, হজরত শাহসুফী আবদুল করিম এবং মুন্সী মেহেরুল্লাহর অমৃতময় বাণী। এই জনপদ যেমন মধুসূদনকে দুফোঁটা চোখের জল ফেলতে সাগরদাঁড়িতে ফিরিয়ে আনে, তেমনি ফররুখ আহমদের সাত সাগরের মাঝিকে সিন্দাবাদের যাত্রায় আহ্বান করে। আশরাফ আলী খান যেমন মানুষের হাহাশ্বাস ধরে রেখেছেন তার কাব্যে, তেমনি শিল্পী এস এম সুলতান তার তুলির আঁচড়ে শ্রমজীবী মানুষের পেশি ও প্রাণশক্তিকে অমর করে রেখেছেন। আহমদ আলী এনায়েতপুরের সেই ঐতিহ্যের বাড়ির কথা আমরা ভুলিনি। যশোর কেবল যশোর নয়, এটি বাংলাদেশের কবিতা-তীর্থ, নৃত্য-সংগীত ও অভিনয়ের অনন্ত উৎসভূমি।
জনপ্রতিনিধিদের প্রতি আমাদের মিনতি
জনপ্রতিনিধিদের কাছে আমাদের চাওয়া খুব সামান্য কিন্তু গভীর। গ্রামীণ প্রবাদে আছে, "ভোটের আগে ফস করে, ভোটের পরে করে না"—আমরা চাই না আমাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা এই প্রবাদের সত্যতা প্রমাণ করুন। যশোরের রাজনীতিতে চরদখল বা ভ্রাতৃঘাতী হাঙ্গামা তুলনামূলক কম, এটি আমাদের ঐতিহ্যের এক পরম সুন্দর দিক। আমরা আশা করি, আপনারা এই জেলাকে একটি প্রস্ফুটিত ফুলের বাগানের মতো সৌন্দর্যময় ও শান্তিময় করে রাখবেন।
বিশেষ করে অ্যাডভোকেট গাজী এনামুল হকের কাছে আমাদের প্রত্যাশা অনেক। তিনি শুধু একজন সফল আইনজীবী নন, তিনি একজন সংবেদনশীল কবি। আর কবিরা স্বপ্ন দেখেন এবং জাতিকে স্বপ্ন দেখান। একজন কবির হৃদয় যখন সংসদে আমাদের হয়ে কথা বলবে, তখন যশোরের সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্ট নিশ্চয়ই সেখানে যথাযথ মর্যাদা পাবে। অধ্যাপক গোলাম রসুল, অধ্যাপক মোক্তার আলী, মাওলানা আজীজুর রহমান এবং ডাক্তার মোসলেহ উদ্দিন ফরিদ—আপনারা প্রত্যেকেই নিজ নিজ ক্ষেত্রে অসামান্য ব্যক্তিত্ব। আপনাদের শিক্ষা, জীবনের অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞা যশোরের সামগ্রিক কল্যাণে নিবেদিত হবে, এটাই আমাদের বড় প্রাপ্তি।
অনিন্দ্য ইসলাম অমিত: এক মানবিক আস্থার প্রতিচ্ছবি
তরুণ নেতা অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের প্রতি আমাদের ভালোবাসা ও প্রত্যাশা একটু অতিরিক্ত। এর কারণ কেবল তার রাজনৈতিক পরিচয় নয়, বরং তার অসামান্য মানবিক গুণাবলী ও সাধারণ মানুষের সাথে তার নিবিড় সংযোগ। তিনি এমন এক দলের নেতা যার ভিশনারি প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, যাকে মাতৃসম মমতায় আগলে রেখেছিলেন দেশনেত্রী খালেদা জিয়া এবং যার বর্তমান সুযোগ্য কাণ্ডারি তারেক রহমান।
ব্যক্তিগত এক অভিজ্ঞতার কথা না বললেই নয়—হাসপাতালের সেই যন্ত্রণাকাতর দিনগুলোতে আমি অনিন্দ্য ইসলাম অমিতকে বারবার পাশে পেয়েছি। যখনই কোনো বিপদে বা অসুস্থতায় পড়েছি, এই মানুষটিকে পাশে পেয়েছি। অপারেশন কেবিন থেকে যখন জ্ঞান ফিরে পেলাম, চোখ মেলতেই দেখলাম অমিত ভাই আমার শিয়রে বসে আছেন। এই যে বদান্যতা, এই যে মানুষের বিপদে ছায়ার মতো পাশে থাকা—এটাই তাকে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে আসীন করেছে।
তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন—সারা জেলা থাকবে হাঙ্গামামুক্ত ও সন্ত্রাসমুক্ত। আমরা বিশ্বাস করি, তার সুযোগ্য নেতৃত্বে যশোর হবে বাংলাদেশের শান্তির এক নতুন মডেল। তার ওপর দায়িত্ব এখন পাহাড়সম, কারণ তার দল রাষ্ট্রপরিচালনার গুরুভার গ্রহণ করতে যাচ্ছে।
সবাই মিলে যশোর গড়ি
আসুন, রাজনৈতিক ভেদাভেদ ভুলে আমরা সবাই মিলে এক আধুনিক, বৈষম্যহীন ও শান্তিময় যশোর গড়ি। বসন্তের এই শুভলগ্নে আমাদের এই স্বপ্ন, ভালোবাসা আর দাবির কথাগুলো যেন আপনাদের হৃদয়ে চিরস্থায়ী আসন পায়। জনপ্রতিনিধিদের উদার হস্ত যেন সাধারণ মানুষের জন্য সর্বদা অবারিত থাকে। যশোরের প্রতিটি ধূলিকণা যেন উন্নয়নের ছোঁয়ায় আবার প্রাণ ফিরে পায়।
পরিশেষে, নবনির্বাচিত সকল প্রতিনিধির সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করছি। আল্লাহ আপনাদের সহায় হোন। বসন্তের এই আলোয় যশোরের জয় হোক, জয় হোক সাধারণ মানুষের।
যশোরের জয়ধ্বনি আকাশ ছোঁয়াক!
লেখক: কবি, গবেষক ও ধ্রুব নিউজের উপদেষ্টা সম্পাদক