শেখ জালাল
বাচ্চু রহমান ছবি: ধ্রুব নিউজ
হাল না ছাড়ার জেদ আর অদম্য ইচ্ছাশক্তি থাকলে যেকোনো ব্যর্থতাকে যে সাফল্যে রূপান্তর করা যায়, তার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন যশোরের তরুণ বাচ্চু রহমান। ৪৫তম বিসিএসের প্রিলিমিনারির গণ্ডি পার হতে না পারা এবং ৪৬তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষায় ব্যর্থ হওয়া সেই তরুণই সব বাধা ডিঙিয়ে ৪৭তম বিসিএসে পুলিশ ক্যাডারে প্রথম স্থান অধিকার করেছেন। তার এই অভাবনীয় সাফল্য আজ দেশের লাখো চাকরিপ্রত্যাশী শিক্ষার্থীর জন্য এক বড় অনুপ্রেরণা ও শিক্ষণীয় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যশোরের কেশবপুর উপজেলার কানাইডাঙ্গা গ্রামের এক সাধারণ পরিবার থেকে উঠে এসেছেন বাচ্চু রহমান। তার বাবা মো. নজরুল ইসলাম বাংলাদেশ আনসার বাহিনীর সদস্য এবং মা বিলকিস বেগম গৃহিণী। পরিবারের দুই সন্তানের মধ্যে বাচ্চু ছোট। কানাইডাঙ্গা প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে ২০১৮ সালে বাণিজ্য বিভাগে এসএসসি পাস করার পর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগে ভর্তি হন।
নিজের শুরুর দিকের ব্যর্থতা ও ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প শুনিয়ে বাচ্চু রহমান বলেন, ‘আমি অনেক পড়াশোনা করতাম, তাও ৪৫তম বিসিএসে প্রিলিমিনারিতে ফেল করি। তখন মনে মনে জেদ করেছিলাম, নিজেকে এমনভাবে প্রস্তুত করব যাতে যেকোনো প্রিলিতে ২০০-এর মধ্যে ১৫০ পাওয়া যায়। প্রিলিতে ব্যর্থ হওয়া এবং ৪৬তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষায় ব্যর্থতা আমাকে আরও পরিশ্রমী করেছে। আমি কখনো হতাশ হইনি; বরং ব্যর্থতা আমার দুর্বলতাগুলো খুঁজে বের করতে সাহায্য করেছে।’
বাচ্চু রহমানের বিসিএস জয়ের এই লড়াইয়ে প্রস্তুতির কৌশলটিও অন্য যেকোনো শিক্ষার্থীর জন্য দারুণ শিক্ষণীয়। কমার্স ব্যাকগ্রাউন্ডের ছাত্র হওয়ায় তিনি কখনোই মুখস্থনির্ভর প্রস্তুতিতে বিশ্বাস করেননি। শুধু তথ্য মুখস্থ করার চেয়ে বিষয়টি কেন ঘটছে এবং তার সমাধান কী— সেটি গভীরভাবে বোঝার চেষ্টা করতেন। বিসিএসের প্রথাগত বইয়ের বাইরেও তিনি নিয়মিত জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পত্রিকা পড়তেন। বিজ্ঞান, সমসাময়িক বিষয়, অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে বিস্তারিত জানতে তিনি গুগল, কুয়োরা ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক শিক্ষামাধ্যম ব্যবহার করতেন।
লিখিত পরীক্ষার কৌশল নিয়ে তিনি জানান, পরীক্ষায় অপ্রয়োজনীয় কোনো ভূমিকা না লিখে সরাসরি পয়েন্ট আকারে সংক্ষিপ্ত ও তথ্যভিত্তিক উত্তর দিতেন। পাশাপাশি টাইম ম্যানেজমেন্ট বা সময় ব্যবস্থাপনায় বিশেষ জোর দিয়েছিলেন, যা তাঁকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সব প্রশ্নের উত্তর শেষ করতে সাহায্য করেছে।
ছোটবেলায় বাবার আনসারের ইউনিফর্ম, বুট আর বেল্ট নিয়ে খেলতে খেলতেই পুলিশ হওয়ার স্বপ্নের বীজ বুনেছিলেন বাচ্চু। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় লক্ষ্য স্থির করেন এএসপি হওয়ার। ক্যাম্পাস জীবনে নিয়মিত পত্রিকা পড়ার সুবাদে নারী নির্যাতন, ধর্ষণ, মাদক ও সাইবার অপরাধের যে চিত্র দেখতেন, তার বিরুদ্ধে কাজ করার প্রবল ইচ্ছা থেকেই পুলিশ ক্যাডারের প্রতি তার টান তৈরি হয়।
ভবিষ্যতে পিবিআই, সিআইডি বা ডিবির মতো তদন্তভিত্তিক ইউনিটে কাজ করার তীব্র আগ্রহের কথা জানিয়ে বাচ্চু রহমান বলেন, ‘আমি ক্রিমিনোলজিতে উচ্চশিক্ষা নিতে চাই। বিশেষ করে নারী নির্যাতন, মাদক ও সাইবার অপরাধ প্রতিরোধে এমন কিছু করতে চাই যাতে সাধারণ মানুষ পুলিশের প্রতি পূর্ণ আস্থা রাখতে পারে।’
ব্যর্থতার স্তূপ ডিঙিয়ে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে উঠে আসা বাচ্চু রহমানের দেশসেবার এই অনন্য কৃতিত্বে আজ গর্বিত পুরো কেশবপুরবাসী। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বাচ্চু ছোটবেলা থেকেই অত্যন্ত বিনয়ী ও মেধাবী ছিলেন। তার এই সাফল্য প্রমাণ করে, সঠিক কৌশল আর ধৈর্য থাকলে যেকোনো বড় স্বপ্নই ছোঁয়া সম্ভব।