তহীদ মনি
২৭ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যশোরের ঐতিহ্যবাহী যশোর ইনস্টিটিউট পাবলিক লাইব্রেরি পরিদর্শন করেন ছবি: ধ্রুব নিউজ
যশোর উপশহর এলাকায় নিবন্ধিত পাঠাগার অনেক। শুধু বি-ব্লক বাজারের আশেপাশে অন্তত ৫টি পাঠাগার। যেগুলি সরকারের গণগ্রন্থাগারের মাধ্যমে অনুদানপ্রাপ্ত। এরমধ্যে ডি-৯৮ বাসার হাসান লাইব্রেরিটির অস্থিত্ব পাওয়া যায়নি, স্থানীয়রাও তেমন তথ্য দিতে পারেনি। সি ব্লকের ৩০৩ নম্বর বাসার আহম্মদ স্মৃতি পাঠাগারের কক্ষে বহুদিন কোনো মানুষ ঢোকেনি, ধুলোর কড়া স্তর পড়েছে; সাইকেল, কয়েকটি চেয়ার তার মধ্যে উল্টাপাল্টাভাবে রাখা—পুরোটা যেন গুদামঘরের মতো। ডি ব্লকের ২২১ নম্বর বাসার উপশহর গ্রন্থাগারের কক্ষটি একটু পরিচ্ছন্ন দেখা গেল। আর বি ব্লক বাজারের কবি শিমুল আজাদ পাঠাগারের একটি সাইনবোর্ড ভাড়া দোকানঘরের সামনে চোখে পড়ল; সেখানে নিয়মিত বই লেনদেন হয় বলে জানালেন স্থানীয়রা।
এই চিত্র শুধু উপশহরে নয়, বলা চলে পুরো যশোরের ৯৪টি লাইব্রেরির ছবি এটি। হাতেগোনা কয়েকটি নিয়মিত চললেও পাঠকের যেমন অভাব আছে, ঠিক তেমনি ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে ওঠা লাইব্রেরিগুলো খাতা-কলম ঠিক রাখা ও নিজেদের শখ মেটানো ছাড়া খুব বেশি কাজে আসে না বলে সংশ্লিষ্ট এলাকার বাসিন্দাদের অভিমত।
যশোরে অধ্যাপক শরীফ হোসেন স্যারের হাত ধরে শুরু হয় লাইব্রেরি আন্দোলন। বলা চলে এটি ছিল বাংলাদেশের প্রথম বই আন্দোলন। একুশের বই মেলার সূচনাও শরীফ হোসেন ও যশোর ইন্সটিটিউটের মাধ্যমে হয়েছে ইতিহাস সাক্ষি দেয়। বর্তমানে কাগজে-কলমে সে আন্দোলন অনেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানে ছড়িয়ে পড়েছে। শুধু পাঠক নেই। বইমুখী মানুষ খুঁজে পাওয়া যায় না তেমন। শিক্ষিত-অশিক্ষিত সব বয়সী মানুষ সারাদিন নেটে ইউটিউব, ফেসবুকে আসক্ত হলেও বই পড়ার মানুষ নেই। এক সময় প্রবাদের মতো শোনাত যে ৩টি পেশার মানুষ সর্বদাই পড়ার মধ্যে থাকেন—তারা হলেন চিকিৎসক, শিক্ষক ও আইনজীবী। কিন্তু এখন তাদের মধ্যেও মোবাইল আসক্তি প্রবল। আশেপাশে একপ্রকার প্রতিদিনই নতুন নতুন স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, কিন্ডারগার্টেনের মতো প্রতিষ্ঠান জন্ম নিলেও সেখানে লাইব্রেরি সচল দেখা যায় না।
যশোর সরকারি এম এম কলেজ, সরকারি মহিলা কলেজ, সরকারি সিটি কলেজসহ বিভিন্ন স্কুল-কলেজের লাইব্রেরিতে ৮০ বা ৯০-এর দশকে বই পড়ার জন্য সিরিয়াল দিয়ে অপেক্ষা করতে হতো; এখন সেই কক্ষগুলো বেশিরভাগ সময় খালি পড়ে থাকে। যশোর ইনস্টিটিউটের পাঠ কক্ষে তিল ধারণের ঠাঁই থাকত না। এখন অবশ্য প্রচুর পড়ুয়া পাওয়া যায়, তবে তারা চাকরির পড়া পড়তে নিরিবিলিতে এখানে আসে। এমন মন্তব্য করেছেন জাফর ইকবাল, আজাদ রহমান, অনাবিল হোসেনসহ বেশ কয়েকজন সাবেক পাঠক। একই চিত্র দেখা যায় যশোর সরকারি গণগ্রন্থাগারেও। গত রোববার সরেজমিনে দেখা যায় অন্তত ৭০-৮০ জন চাকরিপ্রার্থী সেখানে পড়াশোনা করছে বাড়ি থেকে বই এনে। তারাও স্বীকার করেন যে তারা চাকরির পড়া পড়ছেন। গণগ্রন্থাগারের সিনিয়র লাইব্রেরিয়ান তাজমুল ইসলাম তাজও জানান, লাইব্রেরিতে প্রতিদিন গড়ে দেড় শতাধিক পাঠক আসছেন, তবে প্রায় সবাই চাকরির পড়া পড়েন।
যশোরে জেলা সরকারি গণগ্রন্থাগার অফিসের তথ্যমতে, জেলায় ৬৪টি নিবন্ধিত পাঠাগার রয়েছে। আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জন্য জেলার ৩২টি লাইব্রেরি জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র থেকে আর্থিক সুবিধা পেয়েছে। ক, খ, গ—এই ৩ শ্রেণিতে বিভক্ত লাইব্রেরিগুলোতে বই কেনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সরকারের তহবিল থেকে এই আর্থিক সুবিধা দেয়া হয়। যদিও জেলা সরকারি গণগ্রন্থাগারের তদন্ত ও অনুমোদন সাপেক্ষে এইসব লাইব্রেরি সরকারি অনুদানের জন্য বিবেচিত হয়, তবুও অনুদান প্রাপ্তির কোনো তালিকা গণগ্রন্থাগারকে দেয়া হয় না। ফলে প্রতিষ্ঠানটি জানতেও পারে না তাদের ছাড়পত্র নিয়ে কোন কোন প্রতিষ্ঠান অনুদানের তালিকায় যোগ হলো এবং তারা চলছে কীভাবে।
তথ্যমতে, ক শ্রেণিভুক্ত লাইব্রেরি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জন্য ৬৯ হাজার টাকা, খ শ্রেণিভুক্ত লাইব্রেরি ৫৫ হাজার টাকা এবং গ শ্রেণিভুক্ত লাইব্রেরি ৪৪ হাজার টাকা অনুদান পেয়েছে। এই অনুদানের অর্ধেক দিয়ে নতুন বই কিনতে হয়, অবশিষ্ট অর্থ প্রতিষ্ঠানটির রক্ষণাবেক্ষণে ও পরিচালনায় ব্যয় করা যায়। যশোরে মাত্র ৩টি প্রতিষ্ঠান ক শ্রেণিভুক্ত। সেই তিনটি হলো—চৌগাছার ফুলসারায় বাড়ীয়ালী যুব পাঠাগার, মণিরামপুরের হাজরাকাঠিতে মণিরামপুর ইনস্টিটিউট পাবলিক লাইব্রেরি ও যশোর ইনস্টিটিউট পাবলিক লাইব্রেরি। এছাড়া ১২টি পাঠাগার খ শ্রেণিভুক্ত এবং অবশিষ্টগুলো গ শ্রেণিভুক্ত।
গ্রন্থ আন্দোলন, সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়, গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তর এমনকি জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের মাধ্যমে সরকার যতই বই আন্দোলন ও বইপড়ার প্রতি আগ্রহ তৈরি করতে নানান সুবিধা দিচ্ছে, বস্তুত তা কয়েকজন সুবিধাভোগী ছাড়া আর তেমন কাজে আসছে না বলে সচেতন মহল মনে করছেন। সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। শিক্ষার্থী-শিক্ষকসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষ এখন অতিরিক্ত মোবাইল আসক্ত হয়ে যাচ্ছে। বর্তমান সরকার হয়তো এর থেকে সবাইকে বের করে এনে বই আন্দোলনকে জোর দিতে চাচ্ছে। চলতি বছরের গত ২৭ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যশোরের ঐতিহ্যবাহী যশোর ইনস্টিটিউট পাবলিক লাইব্রেরি পরিদর্শন করেন এবং এই সংগ্রহ ও সমৃদ্ধির ভূয়সী প্রশংসা করেন। মোবাইল আসক্তি ছাড়াতে তিনি বই পড়ার প্রতি গুরুত্বরোপ করেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, পাঠক বৃধ্ধির জন্য প্রতিযোগিতার আয়োজন করতে হবে। পড়ুয়াদের পুরস্কৃত করতে হবে। তিনি জানান, সরকার লাইব্রেরি আন্দোলটাকে ছড়িয়ে দিতে চায়। এজন্য প্রতিটি উপজেলায় অন্তত দুটি লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করতে চান। সেখানে কোন রাজনৈতিক বই থাকবে না, থাকবে শিশুদের মেধা বিকাশ ও সৃজনশীলতা বাড়ানোর পুস্তক। বই পড়ার জন্য থাকবে পুরস্কারের ব্যবস্থা।
প্রধানমন্ত্রীর মত অনেকে মনে করেন লাইব্রেরি আন্দোলন জোরদার হওয়া দরকার, তেমনি প্রকৃত লাইব্রেরি ও পাঠকদের আরও উৎসাহিত করা দরকার। শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের আরও বেশি তৎপর হতে হবে। প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে লাইব্রেরি আন্দোলনকে বেগবান করতে হবে।
এ প্রসঙ্গে যশোরের সরকারি গণগ্রন্থাগারের সিনিয়র লাইব্রেরিয়ান তাজমুল ইসলাম তাজ বলেন, এখন যদিও চাকরির পড়া ছাড়া লাইব্রেরিতে তেমন পাঠক পাওয়া যায় না, তবে মানুষ বই পড়ে, হয়তো ফরম্যাটটা পরিবর্তন হয়ে গেছে। মোবাইল আসক্তি যেমন আছে তেমনি অনেকে প্রয়োজনে গুগল, এআই, জেমিনির কাছে এবং ই-বুক থেকে বই পড়ে। আর সঠিকভাবে পরিচালনা করলে লাইব্রেরি আন্দোলন এখনো স্থানীয় পাঠকদের কাছে জনপ্রিয় হতে পারে—পাঠক সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখতে পারে। এর জন্য সরকারকে শুধু অনুদান দিলেই হবে না। মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর ও জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের মধ্যে সঠিক ও যথাযথ সমন্বয়ও প্রয়োজন।