শেখ জালাল
কারণ দর্শানো নোটিশ ছবি: সংগৃহীত
সরকারি কলেজের পরীক্ষার হল—যেখানে কঠোর নজরদারি থাকার কথা, সেখানে হল ফেলে খোদ কক্ষ পরিদর্শকই গায়েব! অবিশ্বাস্য মনে হলেও এই ঘটনারই সাক্ষী হলো যশোরের ঐতিহ্যবাহী সরকারি মাইকেল মধুসূদন (এমএম) কলেজ। অভিযুক্ত ব্যক্তি গণিত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক পংকোজ মন্ডল। পরীক্ষার ডিউটি ফেলে নিজের কোচিং সেন্টারে ক্লাস নিতে গিয়ে তিনি কলেজের অধ্যক্ষের কাছে ‘নাতে-নাতে’ ধরা পড়েছেন।
গত ১৮ জানুয়ারি ছিল জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স তৃতীয় বর্ষের পরীক্ষা। এমএম কলেজের পুরাতন বিজ্ঞান ভবনের ৩০৪ নম্বর কক্ষে পরিদর্শকের দায়িত্বে ছিলেন পংকোজ মন্ডল। কিন্তু পরীক্ষা শুরু হওয়ার কিছুক্ষণ পরই তিনি কাউকে কিছু না জানিয়ে কেন্দ্র ত্যাগ করেন। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর এস এম শফিকুল ইসলাম ও পরীক্ষা কমিটির সদস্য মো. নাজমুল কবীর যশোর স্টেডিয়াম মার্কেটে অবস্থিত পংকোজ মন্ডলের নিজস্ব কোচিং সেন্টারে এইচএসসি ম্যাথ উইথ পংকোজ স্যার’-এ হানা দেন। সেখানে দেখা যায়, কলেজের ডিউটিতে থাকা সেই পংকজ স্যার শিক্ষার্থীদের কোচিং করাচ্ছেন।
সরকারি বিধিমালা লঙ্ঘন, পরীক্ষার দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে ওই দিনই তাকে কারণ দর্শানো নোটিশ দিয়েছে কলেজ কর্তৃপক্ষ। অধ্যক্ষ প্রফেসর এস. এম. শফিকুল ইসলাম সাক্ষরিত কারণদর্শানো নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে ‘গত ১৮/০১/২০২৬ তারিখ রবিবার ২০১৪ সালের অনার্স ৩য় বর্ষ পরীক্ষায় আপনার (পংকোজ মণ্ডল) পুরাতন বিজ্ঞান ভবনের ৩০৪ নম্বর কক্ষে ইনভিজিলেটর (কক্ষ পরিদর্শক) হিসেবে দায়িত্ব ছিল। কিন্তু পরীক্ষা চলাকালীন আপনাকে পরীক্ষা কক্ষ ত্যাগ করে ক্যাম্পাসের বাইরে কোচিং পরিচালনা অবস্থায় কলেজের অধ্যক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট পরীক্ষা কমিটির সদস্য (জনাব মো: নাজমুল কবীর) দেখতে পান। এই কাজটিকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশোধিত পরীক্ষা রেগুলেশন-২০১৫ (আংশিক) এর নীতিমালার ২৪ এর গ ও ঘ বিধি এবং সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ এর ২ (অ), (আ) বিধি লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিধি লঙ্ঘনের দায়ে কেন আপনার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না, তার লিখিত জবাব এই নোটিশ ইস্যুর ০৩ (তিন) কার্য দিবসের মধ্যে অধ্যক্ষের নিকট দাখিল করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’
চিঠিটির অনুলিপি সদয় অবগতি ও প্রয়োজনীয় কার্যের জন্য মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব এবং মহাপরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরেও পাঠানো হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, পংকোজ মন্ডলের বিরুদ্ধে অভিযোগ শুধু দায়িত্ব অবহেলারই নয়, বরং আরও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। ২৬ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে তাকে প্রথমবার শোকজ করা হয়। সে সময় অভিযোগ ছিল পরীক্ষার হল থেকে চলমান পরীক্ষার প্রশ্নপত্র কৌশলে বাইরে দিয়ে দেয়া এবং তার সমাধান তৈরি করে নিজ কোচিংয়ের শিক্ষার্থীদের কাছে সরবরাহ করার। এছাড়া কলেজের অভ্যন্তরীণ পরীক্ষার প্রশ্নও অর্থের বিনিময়ে আগেভাগে ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
এ ব্যাপারে বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ জিল্লুর রহমান ভিটু বলেন, ‘দেশের অলিতে-গলিতে কোচিংয়ে ভরে গেছে। শিক্ষকরাই কোচিং ব্যবসা চালাচ্ছেন, যা অবৈধ। এদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।’
বিশিষ্ট কলামিস্ট, লেখক, গবেষক ও সাংবাদিক বেনজিন খান বলেন, ‘শিক্ষকতা একটি মহান পেশা। আমাদের অনেক শিক্ষক সেই কথা ভুলে গেছেন। সে কারণে তাদের মধ্যে চরম নৈতিক অবক্ষয় দেখা দিয়েছে।’
বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ প্রফেসর মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘একজন শিক্ষক পরীক্ষার হলে তার দায়িত্ব ছেড়ে যেতে পারেন না। কৌশলে দায়িত্ব এড়িয়ে কোচিং করানো অপরাধ। ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে নিশ্চয়ই কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নেবেন, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এ ধরনের কাজে উৎসাহিত না হয়।’
এ ব্যাপারে সহকারী অধ্যাপক পংকজ মণ্ডল পরীক্ষার ডিউটি বাদ দিয়ে কোচিংয়ে ক্লাস নেওয়ার বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি। তিনি জানান, এ বিষয়ে সব কিছু অধ্যক্ষ জানেন। তবে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ সত্য নয় বলে তিনি দাবি করেন।
এ বিষয়ে যশোর সরকারি এম.এম কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর এস.এম শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘পরীক্ষার ডিউটি রেখে কোচিংয়ে ক্লাস নেওয়ার অভিযোগ পেয়েছি। তাকে শোকজ করা হয়েছে। বিষয়টি বর্তমানে অফিশিয়াল প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে।’