ড. মো. মেসবাহ উদ্দীন
অর্থনীতির মূল স্পন্দন লুকিয়ে থাকে তার ব্যাংকিং ব্যবস্থার ভেতরে। আর এই ব্যাংকিং ব্যবস্থার একমাত্র চালিকাশক্তি কোনো পণ্য বা কাঁচামাল নয়; তা হলো—‘আমানতকারীর বিশ্বাস ও আস্থা’। সুনির্দিষ্ট নীতি, স্বচ্ছতা এবং নির্ভরযোগ্যতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এই আস্থার জায়গায় সামান্যতম চিড় ধরলেও তার প্রভাব পড়ে পুরো জাতীয় অর্থনীতিতে।
আমাদের দেশে বিশেষ করে ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থা দীর্ঘ চার দশক ধরে বিপুল ধর্মপ্রাণ ও সাধারণ মানুষের আমানত ও বিশ্বাসের সুদৃঢ় কেন্দ্রবিন্দু ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নজিরবিহীন অনিয়ম, পরিচালনা পর্ষদে আগ্রাসী হস্তক্ষেপ, বেনামী ঋণ বিতরণ এবং সুশাসনের চরম অভাবে দেশের সামগ্রিক ব্যাংকিং খাত—বিশেষ করে কয়েকটি শীর্ষ ইসলামী ব্যাংক নজিরবিহীন আস্থার সংকটে নিপতিত হয়েছে। আমানতকারীদের মনে যে ভয় ও সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছে, তা কেবল কয়েকটি ব্যাংকের অস্তিত্বকেই হুমকিতে ফেলেনি, বরং পুরো আর্থিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতাকে নড়বড়ে করে দিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে, ব্যাংকিং খাতের এই গভীর ক্ষতে প্রলেপ দিয়ে কীভাবে আবার গ্রাহকের হারিয়ে যাওয়া আস্থা ফিরিয়ে আনা যায়—তা এখন বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ !
ইসলামী ব্যাংকিংয়ের গতিপথ ও বর্তমান সংকট
বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকিং শুধু একধরনের ব্যবসায়িক মডেল নয়, এটি বিপুলসংখ্যক মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস ও আবেগের সাথে গভীরভাবে জড়িত। মোট ব্যাংকিং খাতের একটি বড় অংশ দখল করে থাকা এই ব্যবস্থাটি দীর্ঘদিন ধরে বেশ জনপ্রিয় ছিল। কিন্তু পর্ষদে অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপ, বেনামী ঋণ বিতরণ, শরীয়াহ নীতি পরিপালনে উদাসীনতা এবং সুশাসনের অভাবের কারণে কয়েকটি প্রতিষ্ঠিত ইসলামী ব্যাংক চরম তারল্য সংকটে পড়ে। একই ঘটনা ঘটেছে সাধারণ কিছু ব্যাংকের ক্ষেত্রেও। ফলে ভালো ও খারাপ ব্যাংক উভয়ই গ্রাহকের আস্থার সংকটের মুখোমুখি হয়েছে।
ব্যাংকিং খাতে সংকট তৈরির মূল কারণসমূহ
বাংলাদেশী ব্যাংকিং খাতে—বিশেষ করে একসময় অত্যন্ত সফল ইসলামী ব্যাংকগুলোতে—আজকের এই সংকট একদিনে তৈরি হয়নি। এটি মূলত সুশাসনের অভাব, নীতিগত দুর্বলতা এবং অনিয়মের ধারাবাহিক ফল। মূল কারণগুলোকে কয়েকটি প্রধান পয়েন্টে ভাগ করা যায় :
মালিকানা ও পরিচালনা পর্ষদে আগ্রাসী পরিবর্তন (Hostile Takeover)
পর্ষদ দখল : গত কয়েক বছরে নির্দিষ্ট কিছু প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠী ও কায়েমী স্বার্থান্বেষী মহল কৃত্রিমভাবে শেয়ার কিনে কয়েকটি শীর্ষস্থানীয় ইসলামী ব্যাংকের পর্ষদের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেয়।
পেশাদারিত্বের অভাব : অভিজ্ঞ ব্যাংক পরিচালক ও ব্যবস্থাপকদের সরিয়ে নিজেদের পছন্দসই ও অনুগত ব্যক্তিদের কে ব্যাংকের বড় বড় দায়িত্বশীল পদে বসানো হয়, এমনকি ব্যক্তিগত সচিব কে এনে ব্যাংকের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর পর্যন্ত করা হয়। যার ফলে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ তদারকি ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে।
নামসর্বস্ব ও বেনামী ঋণ (Shell Company Loans)
কাগজে-কলমে প্রতিষ্ঠান : কোনো বাস্তব ব্যবসা বা পর্যাপ্ত জামানত (Collateral) ছাড়াই শত শত কোটি টাকার ঋণ ছাড় করা হয়েছে।
একই গোষ্ঠীর কাছে পুঞ্জীভূত ঋণ : বাংলাদেশ ব্যাংকের একক গ্রাহক ঋণসীমা (Single Borrower Limit) আইন লঙ্ঘন করে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বেনামী প্রতিষ্ঠানের নামে ব্যাংকের সিংহভাগ অর্থ বের করে নেওয়া হয়েছে।
আরও পড়ুন-
অশান্ত দিল্লির রাজপথ : অনিশ্চিত গন্তব্যে ভারতের রাজনীতি
শরীয়াহ নীতি ও অডিটের অবমূল্যায়ন
নামমাত্র শরীয়াহ পর্ষদ : ইসলামী ব্যাংকিংয়ের প্রধান ভিত্তি হলো শরীয়াহ নীতি পরিপালন। কিন্তু সংকটগ্রস্ত ব্যাংকগুলোতে নামমাত্র শরীয়াহ বোর্ড ছিল, তাও আবার নিষ্ক্রিয় বা দুর্বল করে রাখা হয়েছিল।
ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা উপেক্ষা : ইসলামী ব্যাংকিংয়ের 'প্রফিট-লস শেয়ারিং' (লাভ-লোকসান অংশীদারিত্ব) নীতি তোাক্কা না করে অনিয়মিত উপায়ে বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ খাতে বিশাল অংকের বিনিয়োগ করা হয়।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার (বাংলাদেশ ব্যাংক) নজরদারির শিথিলতা
নীতিনির্ধারণী দুর্বলতা : কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে অনিয়মগুলো সময়মতো শক্ত হাতে দমন না করা এবং রাজনৈতিক চাপের মুখে ছাড় দেওয়ার প্রবণতা সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে।
বিশেষ সুবিধা প্রদান : খেলাপিদের বারবার পুনঃতফসিলীকরণ (Rescheduling) এবং বিশেষ তারল্য সুবিধা দিয়ে কৃত্রিমভাবে ভালো দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছিল, যা মূল সমস্যা গোপন রাখতে সাহায্য করে।
আমানতকারীদের আতঙ্কে 'প্যানিক উইথড্রয়াল' (Panic Withdrawal)

যখনই বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম বিশেষ করে ফেসবুকে তারল্য ঘাটতি ও বেনামী ঋণের খবর প্রকাশ্যে আসে, সাধারণ আমানতকারীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। হাজার হাজার গ্রাহক একসঙ্গে ব্যাংক থেকে টাকা তুলতে শুরু করায় ব্যাংকগুলো তীব্র তারল্য সংকটে (Liquidity Crisis) পড়ে যায়,যা চূড়ান্ত আস্থার সংকটে রূপ নেয়।
আস্থা পুনর্গঠনে জরুরি করণীয় -
সংকট কাটিয়ে ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা এবং সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে সমন্বিত ও প্রয়োজনীয় যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি -
১. সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও স্বাধীন পরিচালনা পর্ষদ :
ব্যাংক পরিচালনায় রাজনৈতিক ও কায়েমী স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর প্রভাব পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে। পেশাদার, অভিজ্ঞ এবং সৎ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করতে হবে, যাতে সিদ্ধান্ত গ্রহণে কোনো একক ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থ প্রাধান্য না পায়।
২. শরীয়াহ গভর্ন্যান্স জোরদারকরণ :
ইসলামী ব্যাংকগুলোর প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থার অন্যতম মূল কারণ শরীয়াহ নীতি অনুসরণ। শরীয়াহ বোর্ডের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে প্রতিটি ইসলামী ব্যাংকে কঠোর শরীয়াহ অডিটের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে শরীয়াহ ভঙ্গের মাধ্যমে কোনো অনিয়ম ঢাকা না পড়ে।
৩. খেলাপি ও অনিয়ম চিহ্নিতকরণ এবং দৃশ্যমান শাস্তি :
কারা জালিয়াতি করে অর্থ বের করে নিয়েছে, কারা এদেরকে পেছনে থেকে সহযোগিতা করেছে এবং কারা ইচ্ছাকৃত খেলাপি, তাদের তালিকা স্পষ্ট করে আইনের আওতায় আনতে হবে। প্রভাবশালী বা বড় খেলাপিদের ক্ষেত্রে এবং যারা জালিয়াতি করে ব্যাংক থেকে অর্থ আত্মসাৎ করেছে তাদের ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করে আইনের কঠোর প্রয়োগ দেখানো গেলে সাধারণ মানুষের আস্থা দ্রুত ফিরে আসবে।
৪. স্বচ্ছতা ও সঠিক তথ্য প্রকাশ :
তথ্য গোপন রাখা বা ভুয়া পরিসংখ্যান দেওয়ার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। ব্যাংকের প্রকৃত আর্থিক চিত্র এবং সম্পদ উদ্ধার বা পুনর্গঠনের বাস্তবসম্মত তথ্য জনগণের সামনে আনতে হবে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী অডিট নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
৫. ছোট আমানতকারীদের সুরক্ষা ও ডিপোজিট ইন্স্যুরেন্স :
ছোট ও সাধারণ আমানতকারীদের অর্থ যেকোনো মূল্যে নিরাপদ—এই বার্তাটি সাধারণ জনগনের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। প্রয়োজন হলে 'আমানত সুরক্ষা আইন'-এর আওতায় বীমা দাবির পরিমাণ বাড়িয়ে ছোট আমানতকারীদের অর্থ ফেরতের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
আরও পড়ুন-
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুবছর পূর্তি : রক্তে লেখা ইতিহাসের দায়
৬. কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর ও নিরপেক্ষ ভূমিকা :
বাংলাদেশ ব্যাংককে শতভাগ স্বায়ত্তশাসিত ও স্বাধীন তদারককারী সংস্থা হিসেবে ভূমিকা পালন করতে হবে। রাজনৈতিক চাপ উপেক্ষা করে নীতিমালার কঠোর প্রয়োগ, দুর্বল ব্যাংকগুলোকে একীভূতকরণ (Merger) বা উদ্ধার কর্মসূচির আওতায় এনে কঠোর মনিটরিংয়ে রাখতে হবে।
মূলকথা- ব্যাংকিং খাতে আস্থা অর্জনে সময় লাগে কয়েক দশক, কিন্তু রাজনৈতিক বা কায়েমী স্বার্থের কাছে সুশাসন বলি দিলে সেই আস্থা ধ্বংস হতে সময় লাগে মাত্র কয়েক ঘন্টা। আজ ইসলামী ব্যাংকসহ সংকটগ্রস্ত ব্যাংকগুলোতে যে তারল্য ও বিশ্বাসের ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তা কোনো অলৌকিক উপায়ে রাতারাতি দূর হবে না। এর জন্য প্রয়োজন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শতভাগ স্বাধীন ও আপসহীন তদারকি, ঋণের নামে অর্থ পাচারকারী ও ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা এবং ব্যাংকিং পর্ষদে পেশাদারিত্ব ও শরীয়াহ গভর্ন্যান্সের পূর্ণ পুনর্বাসন। ছোট ও সাধারণ আমানতকারীদের অর্থ সম্পূর্ণ নিরাপদ—এই নিশ্চয়তা মাঠপর্যায়ে পৌঁছে দিতে না পারলে কোনো সংস্কারই টেকসই হবে না। সংকট যত গভীরই হোক না কেন, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও আমূল প্রশাসনিক সংস্কারের মাধ্যমে যদি স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যায়, তবে ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার স্বকীয়তা এবং সার্বিক ব্যাংকিং খাতের হারানো গৌরব পুনর্গঠন করা সম্ভব।
লেখক: গবেষক, বিশ্লেষক ও গ্রন্থপ্রণেতা