ছবি: সংগৃহীত
আটবার হাতবদল হওয়া একটি সাধারণ মুঠোফোনই শেষ পর্যন্ত চিনিয়ে দিল রাজশাহীর বাগমারার চাঞ্চল্যকর মা-ছেলে হত্যাকাণ্ডের খুনিদের। কখনো ৫০০, কখনো ৭০০ টাকায় বিক্রি হওয়া এই ফোনটির সূত্র ধরেই প্রায় এক বছর পর অন্ধকার থেকে আলোয় এলো ক্লুলেস এক জোড়া খুনের নেপথ্য কাহিনি। নেত্রকোনা থেকে উদ্ধার হওয়া সেই মুঠোফোনের আইএমইআই (IMEI) নম্বর ধরে উল্টো পথে হেঁটে তদন্তকারীরা শেষ পর্যন্ত পৌঁছে গেলেন মূল পরিকল্পনাকারীদের ডেরায়।
একটি খুনের ঘটনা। কোনো প্রত্যক্ষদর্শী নেই, নেই কোনো চাক্ষুষ প্রমাণ। কুয়াশাচ্ছন্ন শীতের রাতে নিস্তব্ধ এক গ্রাম। ধারালো অস্ত্রের নির্মম আঘাতে শেষ করে দেওয়া হলো দুটি প্রাণ। হত্যাকাণ্ডের পর ঘাতকেরা শুধু একটি জিনিস সাথে করে নিয়ে গেল—ভুক্তভোগীর ব্যবহৃত একটি অতি সাধারণ মুঠোফোন।
কে জানত, ৫০০ আর ৭০০ টাকায় বিক্রি হওয়া এই সস্তা ফোনটিই একদিন হয়ে উঠবে এক অদৃশ্য সুতো, যা টেনে বের করবে পর্দার আড়ালে থাকা খুনিদের! আটবার হাতবদল হওয়া সেই মুঠোফোনের সূত্র ধরেই উন্মোচিত হলো রাজশাহীর বাগমারায় মা–ছেলের চাঞ্চল্যকর ও আলোচিত জোড়া হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের অন্ধকার রহস্য।
অন্ধকার সেই রাত এবং ব্যর্থতা
সময়টা ছিল ২০১৪ সালের ২৩ নভেম্বর। বাগমারা উপজেলার দেউলা গ্রামের এক নিঝুম রাত। নিজের বাড়িতে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিলেন আকলিমা বেওয়া (৫৫) ও তার ছেলে জাহিদ হাসান (২৮)। রাত তখন সাড়ে ৮টা থেকে সোয়া ৯টার ভেতর। ঘুটঘুটে অন্ধকারের বুক চিরে বাড়িতে ঢুকে পড়ে একদল নরপিশাচ। ধারালো অস্ত্রের নির্মম আঘাতে, জবাই করে হত্যা করা হয় মা ও ছেলেকে।
পরদিন আকলিমার আরেক ছেলে দুলাল উদ্দিন বাদী হয়ে রাজশাহীর বাগমারা থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। শুরু হয় পুলিশি তদন্ত। সন্দেহভাজন হিসেবে পুলিশ পাঁচজনকে গ্রেপ্তারও করে। কিন্তু তদন্তের গোলকধাঁধায় পড়ে যায় পুলিশ; পরে জানা যায়, ধৃত এই পাঁচজনের কেউই খুনের সাথে জড়িত ছিলেন না। তদন্তের খাতা তখন শূন্য। রহস্যের কোনো কূলকিনারা না পেয়ে কেটে গেল দীর্ঘ একটা বছর।
নেত্রকোনার ফোন ও পিবিআই-এর প্রবেশ
হত্যাকাণ্ডের এক বছর পর, ঘটনার মোড় ঘুরিয়ে দিতে তদন্তভার দেওয়া হয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই)। পিবিআই কর্মকর্তারা যখন ফাইল হাতে নেন, তখন তাদের সামনে কোনো চাক্ষুষ প্রমাণ ছিল না। কিন্তু তাদের তীক্ষ্ণ নজর আটকায় একটি জায়গায়—খুনের রাতে আকলিমার ঘর থেকে নিখোঁজ হওয়া মুঠোফোনটি।
তদন্তকারীরা ফোনটির আইএমইআই (IMEI) নম্বর ধরে এক অদৃশ্য জালের মতো অনুসন্ধান শুরু করেন। প্রযুক্তির সহায়তায় দেখা যায়, ফোনটি আর রাজশাহীতে নেই। সেটি তখন সীমান্ত-জেলা পেরিয়ে, নদী-নালা পার হয়ে চলে গেছে বহুদূরের জেলা নেত্রকোনায়! এক ব্যক্তির হাতে দিব্যি চলছে সেটি।
শুরু হলো পিবিআই-এর রিভার্স কাউন্টডাউন। ফোনটি কার কাছ থেকে, কার কাছে গেছে? প্রতিটি ধাপের চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হলো। দেখা গেল, ফোনটি হাতবদল হয়েছে মোট আটবার! কখনো ৫০০ টাকা, কখনো ৭০০ টাকায় সেটি বিক্রি হয়েছে চোর-কারবারিদের হাটে। এই হাতবদলের প্রতিটি শিকল ধরে উল্টো পিঠে হাঁটতে হাঁটতে পিবিআই অবশেষে পৌঁছে গেল সেই প্রথম ব্যক্তির কাছে, যিনি খুনের রাতে ফোনটি ঘটনাস্থল থেকে পকেটে পুরেছিলেন। তিনি আর কেউ নন—প্রতিবেশী হাবিবুর রহমান।
১৮ কিলোমিটার দূরের চক্রান্তকারী
ফোন চুরির সূত্র ধরে টান দিতেই বেরিয়ে এলো এক ভয়ঙ্কর নীল নকশা। পিবিআই-এর জালে একে একে ধরা পড়লেন নিহত আকলিমার আপন চাচাতো দেবর, স্থানীয় মাতবর আবুল হোসেন মাস্টার এবং প্রতিবেশী হাবিবুর রহমানসহ মোট সাতজন।
রহস্যের জট খুলতেই জানা গেল, আকলিমার সাথে দীর্ঘদিনের বিরোধ ছিল মাতবর আবুল হোসেন মাস্টারের। অন্যদিকে, মাদকের ব্যবসাকে কেন্দ্র করে প্রতিবেশী হাবিবুর রহমানের সাথেও আকলিমার শত্রুতা চরম রূপ নিয়েছিল। এই দুই শত্রু হাত মেলায় আকলিমাকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিতে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ভাড়াটে খুনি সংগ্রহের দায়িত্ব নেন হাবিবুর রহমান। রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে ভাড়া করা হয় পাঁচ দুর্ধর্ষ খুনিকে। ২০১৪ সালের ২৩ নভেম্বর রাতে, ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী আবুল হোসেন মাস্টার নিজে মোটরসাইকেল চালিয়ে ১৮ কিলোমিটার দূর থেকে সেই ভাড়াটে খুনিদের পথ দেখিয়ে আকলিমার বাড়ির সামনে নিয়ে আসেন। খুনিরা যখন ভেতরে ঢুকে মা-ছেলের ওপর তাণ্ডব চালাচ্ছিল, তখন বাইরে মোটরসাইকেল নিয়ে পাহারায় ছিলেন আরেক ব্যক্তি। মিশন শেষ হতেই আকলিমার ফোনটি নিয়ে খুনিরা রাতের অন্ধকারে মিলিয়ে যায়।
আইনের শেষ হাসি
একটি তুচ্ছ মুঠোফোনের সূত্র ধরে পিবিআই-এর এই নিখুঁত তদন্তের বিবরণ উঠে এসেছে পিবিআই সদর দপ্তর থেকে প্রকাশিত ‘পরিচয়হীন অজ্ঞাতনামা মৃতদেহ এবং ক্লুলেস মার্ডার মামলার তদন্ত’ শীর্ষক বইয়ে।
দীর্ঘ তদন্ত আর আইনি লড়াই শেষে ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে আদালত এই লোমহর্ষক মামলার চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেন। বিজ্ঞ আদালত এই হত্যাকাণ্ডের মাস্টারমাইন্ড ও খুনিদের কঠোর শাস্তি দেন:
মৃত্যুদণ্ড (৩ জন): প্রধান পরিকল্পনাকারী ও পথপ্রদর্শক চাচাতো দেবর আবুল হোসেন মাস্টার, পরিকল্পনাকারী ও খুনি সংগ্রহকারী প্রতিবেশী হাবিবুর রহমান এবং বিজিবির চাকরিচ্যুত সদস্য ও ভাড়াটে খুনি দলের নেতা দুর্গাপুরের দেবীপুরের বাসিন্দা আবদুর রাজ্জাক।
যাবজ্জীবন কারাদণ্ড (৪ জন): হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেওয়া দুর্গাপুরের শ্যামপুরের আবদুল্লাহ আল কাফি, রুহুল আমিন, খিদ্রকাশিপুর গ্রামের রুস্তম আলী এবং খিদ্রলক্ষ্মীপুর গ্রামের মনিরুল ইসলাম ওরফে মনির।
অপরাধীরা ভেবেছিল সস্তায় ফোনটি বিক্রি করে দিলে রক্তের দাগ মুছে যাবে, কিন্তু আটবার হাতবদল হওয়া সেই ৫০০ টাকার মুঠোফোনটিই শেষ পর্যন্ত খুনিদের গলার ফাঁসি হয়ে দাঁড়াল।