সংস্কৃতি ডেস্ক
ছবি: সংগৃহীত
এ বছর জন্মশতবার্ষিকীতে পা দিচ্ছেন বাংলার এই মহানায়ক। কিন্তু অনেকেই হয়তো জানেন না, ৩ সেপ্টেম্বর নিজের জন্মদিন পালন করতেন না উত্তর কুমার। মহানায়কের স্ত্রী গৌরী চট্টোপাধ্যায়ের জন্মদিন ২৭ সেপ্টেম্বর এবং উত্তম কুমারের ছেলে গৌতমের জন্মদিন ৭ সেপ্টেম্বর। তিনি স্ত্রীর জন্মদিনে অর্থাৎ ২৭ সেপ্টেম্বরে তার ও ছেলের জন্মদিন উদযাপন করতেন।
আমি যখন 'শেষ অঙ্ক' ছবি করছি, তখন 'উত্তম-সুচিত্রা' কিংবা 'উত্তম-সাবিত্রী' জুটির জনপ্রিয়তা তুঙ্গে। তবুও শুটিং ফ্লোরে সবাইকেই খুব নিজের মনে হয়েছিল, সবাই বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করতেন। কখনো কোনো অযাচিত আচরণের সম্মুখীন হতে হয়নি। আর উত্তম বাবুর অত নামডাক হওয়ার পরেও উনি কিন্তু আমাকে কখনো 'আমি পারি না', 'আমি বয়সে ছোট', 'অভিজ্ঞতা কম' কিংবা 'আমার থেকে শেখো' এই জাতীয় কোনো কিছুই বোঝাতে চাননি। এই স্বাধীনতা পেয়েছিলাম বলেই বোধহয় স্বতঃস্ফূর্ত হতে পেরেছিলাম।
শর্মিলা ঠাকুরের স্মৃতিচারণমূলক লেখনীতে এভাবেই উঠে এসেছে বাংলা চলচ্চিত্রের নক্ষত্র উত্তম কুমারের কথা। কিন্তু রাতারাতিই কি নক্ষত্র হয়ে উঠতে পেরেছিলেন তিনি? একেবারেই তেমনটি নয়। বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন ছেলেবেলায় যেমনি অংকে ফেল করেছিলেন বলে কথিত আছে, তেমনি উত্তম কুমার অভিনীত সিনেমাও ফ্লপ করার এক ইতিহাস আছে বৈকী!
আমরা ইতিহাস ভরে রাখি সাফল্যগাঁথায়। এই সাফল্যগাঁথার ভিড়ে হারিয়ে যায় প্রত্যেকের জীবনের সেই পরিস্থিতি যেখানে আছে পরাজয়ের গ্লানি আর অদজত সংগ্রামের কথা।
সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের এক কর্তার জীবন যেমন হয়। সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নিতে কলকাতা পোর্ট কমিশন অফিসে সাধারণ কেরানির চাকরি করছেন তখন। ১০টা-৫টার যাঁতাকলের মাঝে সময় পেলেই মনের খোরাক মেটাতে অভিনয়ের টানে কখনো কখনো ছুটে যেতেন থিয়েটারে।
সালটা ১৯৪৭। প্রথম সুযোগ পেয়েছিলেন হিন্দি ছবি মায়াডোরে। কিন্তু ভাগ্য প্রসন্ন হলো না, সে ছবি মুক্তি পেল না।
মায়াডোরে দৈনিক পাঁচসিকে পারিশ্রমিকের পরে 'দৃষ্টিদান' সিনেমায় নায়কের ছেলেবেলার চরিত্রে অভিনয় করে পারিশ্রমিক মিলেছিল ২৭ টাকা। যিনি সুযোগ করে দিলেন তাকে কমিশন দিয়ে অভিনেতার হাতে এল সাড়ে ১৩ টাকা। পারিশ্রমিক নিয়ে তখন এত মাথা ঘামাতেন না অভিনেতা।
তবে 'দৃষ্টিদান'র প্রকাশিত বিজ্ঞাপনে নিজের নামের অস্তিত্ব না দেখে বেশ আশাহত হয়েছিলেন বলে লিখেছিলেন আত্মজীবনীতে। ১৯৪৮ সালে এই সিনেমার মাধ্যমে প্রথমবার বড়পর্দায় দেখা গিয়েছিল তাকে। তবে নায়ক হিসেবে নয়, নেহাতই এক ছোট্ট চরিত্রে। রবি ঠাকুরের লেখা এক ছোটগল্পের ছায়ায় নির্মিত চলচ্চিত্র। কিন্তু সিনেমাটি সফলতার মুখ দেখল না বক্স অফিসে।
পর পর ৭টি ছবিতে অভিনয় করলেন তিনি। সবগুলো ছবিই বক্স অফিসে সাড়া ফেলতে ব্যর্থ। ইন্ডাস্ট্রিতে অরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায় (উত্তম কুমারের আসল নাম) হয়ে উঠলেন হাসি তামাশার পাত্র। তার ডাক নাম হয়ে গেল ফ্লপ মাস্টার জেনারেল। এই ফ্লপ মাস্টার জেনারেলই যে একদিন সবার হৃদয়ের মধ্যমণি হয়ে উঠবেন, তা ভাবতে পারেননি ইন্ড্রাস্ট্রির কেউই।
যখন উত্তম বাবুর সিনেমাগুলো একের পর এক মুখ থুবড়ে পড়তে থাকে, তখন চারপাশে নানা মন্তব্য। তবে তিনি হাল ছাড়েননি। নিজেকে তৈরি করার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছেন, সংলাপ আয়ত্তের কৌশল কিংবা এক্সপ্রেশন নিজের ত্রুটিগুলোকে খুঁটিয়ে দেখতেন নিজেই। এমনিভাবেই একদিন সুযোগ এল। ১৯৫২ সালে এমপি প্রোডাকশনের বসু পরিবারে অভিনয়ের সুযোগ মিলল। প্রথম বক্স অফিসে সবুজ সংকেতের দেখা মিলল এই নবীন অভিনেতার। এরপর আর ফিরে তাকাতে হয়নি। 'সাড়ে চুয়াত্তর', 'অগ্নিপরীক্ষা', 'হারানো সুর', 'সপ্তপদী', 'ঝিন্দের বন্দী', 'চাওয়া পাওয়া', 'চিড়িয়াখানা', 'অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি' কিংবদন্তীতুল্য করে তুলল তাকে।
''আপনাকে আমার ফ্যানদের বিষয়ে দু'টি অদ্ভুত ঘটনা বলি। একরাশ ফুল নিয়ে মিনিস্কার্ট পরে এক বিলিতি স্কুলে পড়া আহ্লাদী মেয়ে সোজা চলে এল আমার শোবার ঘরে। ওর মা টেলিফোনে কান্নাকাটি করছে। উত্তম বাবু আমার মেয়েকে বাঁচান। বাপস! ওই মেয়েকে বোঝানো সেকি চাট্টিখানি কথা? কত বোঝাই। সেই মেয়ে গোঁ ধরে বসে আছে, আমার বাড়িতেই থাকবে। এখন অবশ্য বিয়ে করে সুখে-স্বচ্ছন্দে স্বামীর ঘর করছে।''
''একবার মফস্বলে সিনেমা হলের ফাংশনে গিয়েছি। একটি ছেলে কোথা থেকে ছুটে এসে আমার বুকে মাথা ঘষতে লাগল। আমি খুব বিরক্তবোধ করছিলাম। একজন পুরুষ হয়ে, ওভাবে একজন পুরুষের... পরে শুনেছিলাম ছেলেটি বলেছে, 'মাথা ঘষব না? ওই বুকে কত হিরোইন এসে পড়ে!''
''হ্যাঁ, অদ্ভুত মজার ঘটনা আমার জীবনেও ঘটেছে। একবার সন্ধের পর গঙ্গার ধারে, নিরিবিলিতে একটু বেড়াচ্ছি, পাশ দিয়ে একদল ছেলে চলে গেল। একটু গিয়েই তাদের একজন বলল: 'এই দ্যাখ, উত্তম কুমার। আর একজন তাকে ধমক দিয়ে বলল– হুঁ, তোর যেমন কথা, উত্তম কুমার! উত্তম কুমার তোকে দেখা দেবে বলে সন্ধেবেলা ময়দানে বেড়াচ্ছে'!''
১৯৭৪ সালে আনন্দবাজার পত্রিকাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এভাবেই খ্যাতির বিড়ম্বনার গল্প শুনিয়েছিলেন মহানায়ক।
যেই মানুষটিকে ঝুঁকি নিয়ে কোনো প্রযোজক বড় বাজেটের কাজ দিতে চাইতেন না, তিনিই হয়ে উঠলেন নয় থেকে নব্বইয়ের আবেগ। মহানায়কের সবচেয়ে প্রশংসিত সিনেমাগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ১৯৬৬ সালে সত্যজিত রায় পরিচালিত 'নায়ক'। উত্তম কুমারকে মাথায় রেখেই এই সিনেমার চিত্রনাট্য লিখেছিলেন সত্যজিৎ রায়। ১৯৪৮ থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত মোট ২১২টি সিনেমা করেছেন তিনি। তার অভিনীত সবকয়টি সিনেমাই বাংলা সিনেমার অনন্য প্রাপ্তিনামা।
এ বছর জন্মশতবার্ষিকীতে পা দিচ্ছেন বাংলার এই মহানায়ক। কিন্তু অনেকেই হয়তো জানেন না, ৩ সেপ্টেম্বর নিজের জন্মদিন পালন করতেন না উত্তর কুমার। মহানায়কের স্ত্রী গৌরী চট্টোপাধ্যায়ের জন্মদিন ২৭ সেপ্টেম্বর এবং উত্তম কুমারের ছেলে গৌতমের জন্মদিন ৭ সেপ্টেম্বর। তিনি স্ত্রীর জন্মদিনে অর্থাৎ ২৭ সেপ্টেম্বরে তার ও ছেলের জন্মদিন উদযাপন করতেন।
এই জন্মদিনের উৎসবে হাজির হতো গোটা ইন্ডাস্ট্রি। শুধু তাই নয়, মুম্বাই থেকে জন্মদিন উদযাপনে যোগ দিতেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, আর ডি বর্মনের মতো ব্যক্তিরা। কথিত আছে একবার কিশোর কুমারও এসেছিলেন উত্তমের নিমন্ত্রণে। একসঙ্গে তারা গানও গেয়েছিলেন।
উত্তম-সুচিত্রা জুটির কথা বলতে গেলেই মাথায় আসে সাদা-কালো ছবির সেই অনবদ্য বাইক রোমান্সের দৃশ্য, ব্যাকগ্রাউন্ডে বেজে চলেছে- এই পথি যদি না শেষ হয়, তবে কেমন হতো তুমি বলো তো?
১৯৫৩ সালে সুচিত্রা সেনের সঙ্গে জুটি বেঁধে উত্তম কুমার 'সাড়ে চুয়াত্তর' ছবিতে অভিনয় করলেন। সিনেমাটি মুক্তি পেতেই প্রেক্ষাগৃহে ব্লকবাস্টার হয়ে যায়। একটানা ৬৫ সপ্তাহ ধরে সিনেমা হলে দর্শকদের মন যোগায় উত্তম-সুচিত্রার 'সাড়ে চুয়াত্তর' সিনেমাটি। সেই থেকে শুরু।
এরপর উত্তম-সুচিত্রা জুটি একের পর এক সুপারহিট সিনেমা দিয়ে দর্শকদের মন জোগাতে শুরু করে। এই জুটি একসাথে প্রায় ৩০টি ছবিতে অভিনয় করেছেন। সবগুলো ছবিই দর্শকদের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। উত্তম কুমার ও সুচিত্রা সেন অভিনীত সিনেমার মধ্যে হারানো সুর, অগ্নি পরীক্ষা, প্রিয় বান্ধবী, শাপ মোচন, ইন্দ্রাণী, সপ্তপদী'র কথা না বললেই নয়।
২৪ জুলাই ১৯৮০, মহানায়ক উত্তম কুমারের মহাপ্রয়াণ দিবস ছিল সেদিন। মধ্যরাতে সুচিত্রা সেন গিয়ে উত্তম কুমারের মরদেহতে শেষ মালা পরিয়ে দিয়েছিলেন। সেটাই ছিল পরের দিন সংবাদপত্রের সব থেকে বড় ব্রেকিং নিউজ। কিন্তু উত্তম-সুচিত্রার চেয়ে উত্তম-সাবিত্রী জুটি কোন অংশে কম, সেই প্রশ্ন জুড়ে দিলে উত্তর মেলা বড্ড কঠিন।
উত্তম-সুচিত্রার রোমান্স যেমন বাঙালির প্রেমের সংজ্ঞাকে নতুন করে লিখেছিল, তেমনই উত্তম-সাবিত্রীর জুটিও তৈরি করেছিল নিজস্ব দর্শক-আবেগ। আসলে উত্তম কুমারের সাফল্য কোনো একখানা জুটির মধ্যে আটকে ছিল না। তার অভিনয়ের বৈচিত্র্যই তাকে বারবার নতুন করে দর্শকের কাছে ফিরিয়ে দিয়েছে।
আজও একটা প্রজন্মের কাছে উত্তম কুমার মানে প্রথম প্রেম, লুকিয়ে সিনেমা দেখতে যাওয়া, সাদা-কালো ছায়াছবির জন্য দিনভর অপেক্ষা, ডায়েরির পাতায় জুড়ে রাখা মহানায়কের মূল্যবান ছবি আরও কত পাগলামি। আজ ইন্টারনেটের যুগে সবই বড্ড সহজলভ্য। জেন জি কিংবা জেন আলফা হয়তো এই আবেগকে ধরতে পারবে না।
স্ক্রিনের আলো নিভে যায়, কিন্তু কিছু মায়াজাল কখনো ফিকে হয় না। আজ হাতের মুঠোয় হাজারো অপশন, ওটিটি-র ভিড়। অথচ একলা কোনো অলস দুপুরে কিংবা ঝুম বৃষ্টির রাতে যখন দূর থেকে ভেসে আসে সেই চেনা সুর 'তুমি না হয় রহিতে কাছে...', তখন হঠাৎ বুকটার ভেতর কেমন যেন এক নাম না জানা অনুভূতি, যা লিখে ফেলা যায় না চট করে। জেন জি আর জেন আলফার দ্রুতগতির ভালোবাসার ভিড়ে সেই অনুভূতির হদিস হয়তো মিলবে না। ওটা বুঝতে হলে একটু থামতে হয়, থমকে দাঁড়াতে হয়।
উত্তম কুমার তো স্রেফ একখানা নাম বা কতগুলো সুপারহিট সিনেমার স্মৃতি নন; তিনি লুকিয়ে আছেন আমাদের মা-বাবার প্রথম মোলাকাতের লাজুক হাসিতে, পুরোনো অ্যালবামের পাতায় জমে থাকা স্মৃতিতে, আর বাঙালির ভালোবাসতে শেখার প্রথম পাঠে। সময়ের ধূলোবালি যতই জমুক না কেন, সাদা-কালো পর্দার সেই চিরচেনা একটুখানি বাঁকা হাসি আজও যেন চুপিচুপি বলে যায়, তুমি রবে নীরবে, হৃদয়ে মম।
বাঙালির হৃদয়ের সেই গোপন একাকীত্বে, সেই গভীর অনুরাগে, উত্তম কুমার থেকে যাবেন এক চিরন্তন, অমর অনুভূতির নাম হয়ে।