সান্ত্বনা শাহরিন
১৭ জুন, শিল্পী সোহেল প্রাণনের জন্মদিন। জন্মদিন মানেই ফিরে দেখা, ফিরে পাওয়া। কিন্তু এই জন্মদিনটি এখন কেবল স্মৃতির ফ্রেমে বাঁধানো। তবে সোহেল প্রাণন নেই মানেই যে তিনি হারিয়ে গেছেন, তা নয়। তার তুলির আঁচড়, ক্যানভাস আর চিন্তার জগতে তিনি প্রতিনিয়ত বেঁচে আছেন। আর সেই বেঁচে থাকাকে উদযাপন করতেই জন্ম নিয়েছে এক অনন্য শিল্প প্রয়াস।
যশোরের চারুপীঠ গ্যালারিতে এখন চলছে বর্ণিকা আর্ট স্টুডিওর আয়োজনে শিশুদের চিত্র প্রদর্শনী—"ইচ্ছেগুলো আঁকো"। এই প্রদর্শনীর মূল উদ্দেশ্য শিল্পী সোহেল প্রাণনের জন্ম উৎসবকে স্মরণীয় করে রাখা। ১২ জুন শুরু হওয়া এই প্রদর্শনী চলবে ২০ জুন পর্যন্ত। শিশুদের আঁকা সরল রেখা আর রঙের খেলায় যেন সোহেল প্রাণনের সেই সৃষ্টিশীল মনটাই খুঁজে পাওয়া যায়। ব্যস্ত সময়ের ভিড়ে অনেকেই প্রদর্শনীতে এসে শিশুদের চোখের ভাষা ও রঙের দ্যুতি দেখে মুগ্ধ হয়েছেন, কেউবা দূর থেকেই জানিয়েছেন ভালোবাসা।
সোহেল প্রাণনের সাথে পথ চলা জীবনের অনেকটা সময়জুড়ে। শিল্পী হিসেবে তার রূপান্তর, চিন্তার গভীরতা এবং ইচ্ছেগুলোর অদলবদল খুব কাছ থেকে দেখা হয়েছে। তিনি বন্ধু মহলে ছিলেন তুমুল জনপ্রিয়। অসংখ্য মানুষের সাথে পরিচয়, আলাপ আর আড্ডায় মুখর থাকতেন। কিন্তু জীবনের শেষ দিকে অসুস্থতার কারণে আড্ডার পরিধি কমে এলেও শিল্পের প্রতি তার মনোযোগী সত্তা আরও বিকশিত হয়েছিল। নির্দিষ্ট সময়ে রং-তুলি নিয়ে বসা, দোতারায় নতুন সুর তোলা, আর জীবন-প্রকৃতি-সমাজের অসঙ্গতি নিয়ে ভাবনা—এসবই তার চিত্রভাষাকে করেছে আরও সমৃদ্ধ।
তার প্রথম একক প্রদর্শনী থেকে চতুর্থ একক প্রদর্শনীর দিকে তাকালে শিল্পী হিসেবে তার উত্তরোত্তর উন্নতির ছাপ স্পষ্ট। "Vertical Civilization", "Branded Apple", "Black Water", "Bongomata" সিরিজের মতো কাজগুলোতে তিনি সমাজ ও সময়ের প্রতিফলন ঘটিয়েছেন। এছাড়া ষাঁড়ের লড়াইকে কেন্দ্র করে তার ভাস্কর্য ও চিত্রকর্মগুলোতে জীবনের সংগ্রাম ফুটে উঠেছে অনন্য উচ্চতায়। জীবনের সময় হয়তো খুব বেশি পাননি, কিন্তু রেখে গেছেন অসংখ্য কাজের সম্পদ।
সোহেল প্রাণন আজ পাশে নেই, এই শূন্যতা তাকে নিয়ে কাজ করার অনুপ্রেরণায় রূপান্তরিত হয়েছে। আমার ব্যক্তিগত তৃপ্তি এখানেই যে, সাংসারিক জীবনে কোনোদিন তাকে চাকরিতে বাধ্য করিনি। হয়তো সেই স্বাধীনতার কারণেই তার চিন্তার এই বিশাল ব্যাপ্তি আমরা দেখতে পেয়েছি। জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত তার কাছে ছিল এক একটি ছবি। চায়ের আড্ডা, বন্ধু-মহলের পোর্ট্রেট, প্রাণীকুল, প্রকৃতি কিংবা জড় জীবন—সবই তার স্কেচ খাতার পাতায় বারবার ধরা দিয়েছে।
আগামী ২০ জুন, শনিবার, সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় প্রদর্শনীটির সমাপনী দিন। এই বিশেষ সন্ধ্যায় সোহেল প্রাণনের জীবন ও কর্ম নিয়ে একটি সচিত্র উপস্থাপনার আয়োজন থাকছে। শিল্পীর কাজ, তার ভাবনা এবং তার উত্তরাধিকার পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতেই এই ক্ষুদ্র প্রয়াস।
আসুন, শিল্পীর জন্মদিনে তার সৃষ্টিকে উদযাপন করি। শিল্পী সোহেল প্রাণনের সময়গুলো বেঁচে থাকুক আমাদের মাঝে, ক্যানভাসে, আর আগামী প্রজন্মের অভিজ্ঞতায়।
লেখক: সোহেল প্রাণনের সহধর্মিণী ও খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার শিক্ষক
সূত্র: লেখাটি লেখকের ফেবু ওয়াল থেকে নেওয়া, ঈষৎ সম্পাদিত