ক্রীড়া ডেস্ক
পিএসজির হয়ে বিজয়ের রাতে এনরিকে হয়তো স্মৃতিচারণ করছিলেন ২০১৫ এর সেই লীগ জয়ী রাতের, যেদিন তার সাথে ছিলো কন্যা জানা মার্তিনেজ ছবি: এ এফ পি
ডাউন দ্য মেমোরি লেন ধরে হাঁটলে ম্যাচটিতে কত ‘যদি-কিন্তু’র সমীকরণ মিলতে পারত! দারুণ ডিফেন্ডিং করা আর্সেনাল যদি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে পেনাল্টিটা হজম না করত; উসমান দেম্বেলের শটটি যদি ডেভিড রায়া সঠিক দিকে ডাইভ দিয়ে আটকে দিতেন; কিংবা ননি মাদুয়েকেকে নুনো মেন্দেস বক্সের ভেতর ধাক্কা দেওয়ার পর আর্সেনাল যদি পেনাল্টিটা পেয়ে যেত!
কিন্তু ফুটবলের নিষ্ঠুর বাস্তবতায় ‘যদি’ শব্দের কোনো স্থান নেই। ২০ বছর পর আর্সেনালের চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে ওঠার রূপকথা মুহূর্তেই বিষাদে রূপ নিল, যখন গ্যাব্রিয়েল ম্যাগালায়েস বল আকাশের ঠিকানায় উড়িয়ে মারলেন। পুরো মৌসুমজুড়ে দুর্দান্ত খেলে দলের নায়ক বনে যাওয়া গ্যাব্রিয়েল এক শটেই যেন পরিণত হলেন 'ট্র্যাজিক হিরো'তে।
অন্য দিকে, এই রাতটি যেন আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল লুইস এনরিকেকে নায়ক থেকে ‘মহানায়ক’ বানানোর জন্য। আর্সেনালের হৃদয় ভেঙে টানা দ্বিতীয়বারের মতো উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগের ট্রফি উঁচিয়ে ধরল পিএসজি (প্যারিস সাঁ-জার্মেই)।
এলিট ক্লাবে এনরিকে: ছুঁলেন জিদানের রেকর্ড
২০১৪-১৫ মৌসুমে বার্সেলোনার হয়ে প্রথমবার ইউরোপসেরা হয়েছিলেন লুইস এনরিকে। এরপর গত মৌসুমে পিএসজিকে এনে দিয়েছিলেন ইতিহাসের প্রথম চ্যাম্পিয়নস লিগ শিরোপা। এবার টানা দ্বিতীয় ট্রফি জিতে স্প্যানিশ এই মাস্টারমাইন্ড প্রবেশ করলেন ফুটবল ইতিহাসের এলিট ক্লাবে।
ইতিহাসের পঞ্চম কোচ হিসেবে তিনটি বা তার বেশি চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়ের কীর্তি গড়লেন তিনি। ৫টি শিরোপা জিতে সবার ওপরে থাকা কার্লো আনচেলত্তির পরেই এখন এনরিকের অবস্থান। ৩টি করে শিরোপা জিতে তাঁর সঙ্গী হিসেবে আছেন বব পেসলি, জিনেদিন জিদান ও পেপ গার্দিওলা।
টানা দুই শিরোপা: চ্যাম্পিয়নস লিগের বর্তমান ফরম্যাটে রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে টানা তিনবার শিরোপা জিতে অনন্য রেকর্ড গড়েছিলেন জিনেদিন জিদান। তাঁর পর একমাত্র কোচ হিসেবে টানা দুটি চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়ের ব্যাক-টু-ব্যাক কীর্তি গড়লেন এনরিকে।
শোককে শক্তিতে রূপান্তরের এক অনুপ্রেরণাদায়ী গল্প
এনরিকের এই সাফল্যের পথটা একেবারেই সহজ ছিল না। ৯ বছর বয়সী মেয়ে জানাকে ক্যানসারে হারানোর পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন তিনি। ২০১৫ সালে বার্সেলোনার হয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়ের পর মাঠের মাঝে বাবা-মেয়ের বার্সার পতাকা পুঁতে দেওয়ার সেই আইকনিক ছবি ও ভিডিও আজ ফেসবুক-টুইটারে ভাইরাল। কাছের মানুষকে হারানোর সেই তীব্র শোককে শক্তিতে রূপান্তর করেই আজ আবারও সাফল্যের চূড়ায় এই স্প্যানিশ কোচ।
তারকা নয়, দর্শনই শেষ কথা
লিওনেল মেসি, নেইমার এবং কিলিয়ান এমবাপ্পের মতো মহাতারকাদের নিয়েও যে পিএসজি কখনো চ্যাম্পিয়নস লিগের ট্রফি ছুঁতে পারেনি, সেই ক্লাবকে টানা দুবার ইউরোপসেরা বানালেন এনরিকে। এই সাফল্য ফুটবল বিশ্বকে আরও একবার মনে করিয়ে দিল—ফুটবলে বড় নামের চেয়ে কোচের ‘ট্যাকটিকস’ এবং নিজস্ব ‘ফুটবল ফিলোসফি’ বা দর্শনই শেষ কথা। ডাগআউট থেকেই যে ম্যাচের ভাগ্য নিয়ন্ত্রিত হয়, এনরিকে তার জীবন্ত প্রমাণ।
ম্যাচ শেষে নিজের উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে পিএসজি বস লুইস এনরিকে বলেন:
"এই সাফল্য আমাদের কাছে আরও অনেক বড় মনে হচ্ছে, কারণ আমরা জানতাম আর্সেনালের বিপক্ষে খেলা কতটা কঠিন ছিল। এমন একটি হাই-কোয়ালিটি দলের মুখোমুখি হয়ে পুরো টুর্নামেন্ট জেতাটা আমাদের ক্লাব এবং পুরো প্যারিস শহরের জন্য অবিশ্বাস্য এক অর্জন।"
নিজেদের হৃদয়ে ক্ষত নিয়ে এক হওয়া দুটি সত্ত্বা—লুইস এনরিকে এবং পিএসজি; ফুটবল মহাকাশে এখন তারা এক রূপকথার নাম। টানা দুই ট্রফি জয়ের পর এনরিকের এই জয়রথ আগামী মৌসুমে জিদানের টানা তিন শিরোপার রেকর্ড স্পর্শ করতে পারে কি না, এখন সেটাই দেখার বিষয়।