বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ডেস্ক
ফেলিক্স গ্রেটারসনের হাত হারানো ও হাত প্রতিস্থাপনের পরের ছবি ছবি: সংগৃহীত
১৯৯৮ সালের ১২ জানুয়ারি। ২৬ বছরের তরুণ ইলেকট্রিশিয়ান গুডমুন্ডুর ফেলিক্স গ্রেটারসনের জীবন এক মুহূর্তেই ওলটপালট হয়ে যায়। আইসল্যান্ডের হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় হাই ভোল্টেজ বৈদ্যুতিক লাইনে কাজ করার সময় হঠাৎই তার শরীরে ছড়িয়ে পড়ে ১১ হাজার ভোল্টের প্রাণঘাতী বিদ্যুৎ। মরণঘাতী সেই শকে ঝলসে গিয়ে তিনি প্রায় ১০ মিটার ওপর থেকে আছড়ে পড়েন শক্ত বরফে।
গুরুতর আঘাত নিয়ে টানা তিন মাস মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে যখন তার জ্ঞান ফেরে, তখন নির্মম সত্যের মুখোমুখি হতে হয় তাকে। প্রাণ বাঁচাতে চিকিৎসকেরা তার দুই হাতই কেটে বাদ দেন। দুটি ছোট সন্তানের জনক ফেলিক্সের জন্য সবচেয়ে যন্ত্রণাদায়ক বিষয় ছিল সন্তানদের কখনো আর বুকে জড়িয়ে ধরতে না পারা।
তবে নিয়তির কাছে হার মানেননি ফেলিক্স। ১৯৯৮ সালে ফ্রান্সের লিয়নে প্রথমবারের মতো সফল হাত প্রতিস্থাপনের কথা জানতে পেরে নতুন আশায় বুক বাঁধেন তিনি। ২০০৭ সালে আইসল্যান্ডের এক সম্মেলনে প্রখ্যাত ফরাসি সার্জন জ্যঁ-মিশেল দুবারনারের সঙ্গে সাক্ষাতের পর শুরু হয় স্বপ্নের পথে দীর্ঘ যাত্রা। ২০১৩ সালে উপযুক্ত দাতার অপেক্ষায় তিনি পাড়ি জমান ফ্রান্সে।
দীর্ঘ ২৩ বছরের প্রতিক্ষার পর আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। ২০২১ সালের ১৩ জানুয়ারি লিয়নের এদুয়ার এরিও হাসপাতালে প্রায় ৫০ জন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর এক দল ১৫ ঘণ্টার এক জটিল অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করেন। ফেলিক্সের বাম হাত কাঁধ থেকে এবং ডান হাত ওপরের বাহু থেকে প্রতিস্থাপন করা হয়, যা চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে বিশ্বে প্রথম পূর্ণাঙ্গ দ্বিপাক্ষিক বাহু প্রতিস্থাপনের মাইলফলক স্পর্শ করে।
অস্ত্রোপচার পরবর্তী দীর্ঘ ও কঠিন পুনর্বাসন প্রক্রিয়া পেরিয়ে ফেলিক্সের নতুন বাহুতে স্নায়ুর অনুভূতি ও স্বাভাবিক নড়াচড়া ফিরতে শুরু করে। আস্তে আস্তে নিজের হাতে গ্লাস ধরে পানি খাওয়া, চামচ দিয়ে খাওয়া, পোশাক পরা থেকে শুরু করে দৈনন্দিন কাজগুলো করার সক্ষমতা অর্জন করেন তিনি। কিন্তু সব সাফল্যকে ছাপিয়ে যায় সেই মুহূর্তটি, যখন দীর্ঘ দুই দশক পর তিনি তার সন্তান ও নাতি-নাতনিদের হাত বাড়িয়ে পরম মমতায় জড়িয়ে ধরেন।
হাত হারিয়ে যিনি একসময় নিজেকে অদৃশ্য এক বুদ্বুদে বন্দি মনে করতেন, সেই ফেলিক্সের এই পুনরাগমন কেবল আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিস্ময় নয়, বরং মানুষের অদম্য ইচ্ছাশক্তির এক অনন্য নিদর্শন।