প্রযুক্তি ডেস্ক
তিনি হলেন ইউরোপের জানা ইতিহাসে সবচেয়ে প্রাচীন প্রাকৃতিক মমি ছবি: সংগৃহীত
প্রায় ৫ হাজার বছর আগে ইতালি ও অস্ট্রিয়ার বর্তমান সীমান্ত সংলগ্ন আল্পাইন অঞ্চলে এক নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিলেন ‘উতজি দ্য আইসম্যান’ নামের এই ব্যক্তি।
প্রায় পাঁচ হাজার তিনশ বছর আগের প্রাচীন এক মমির দেহে গতিশীল অণুজীব জগতের সন্ধান পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা।গবেষণায় উঠে এসেছে, তীব্র ঠান্ডায় জমে থাকা ‘উতজি দ্য আইসম্যান’ নামের এ মৃত মমিটি আসলে কোনো নিষ্ক্রিয় বস্তু নয়, বরং জ্যান্ত এক বাস্তুতন্ত্র। মমির ভেতরে ও বাইরে পাঁচ হাজার বছরের পুরানো ব্যাকটেরিয়ার পাশাপাশি এখনও সক্রিয়ভাবে বেড়ে উঠছে বিভিন্ন ঠান্ডাপ্রিয় ইস্ট ও আধুনিক অণুজীব।
রয়টার্স লিখেছে, পাঁচ হাজার তিনশ বছর আগে ইতালি ও অস্ট্রিয়ার বর্তমান সীমান্ত সংলগ্ন আলপাইন অঞ্চলে এক নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিলেন ‘উতজি দ্য আইসম্যান’।
পার্বত্য অঞ্চলে আক্রান্ত হওয়ার সময় এক তীরের ফলা তার বাঁ কাঁধে বিঁধে গিয়েছিল, যার ফলে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু হয়েছে। নতুন গবেষণা বলছে, এক অর্থে উতজি এখনও বেঁচে আছেন।
বিজ্ঞানীরা উতজির মমি থেকে ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক ও ইস্টের মতো অণুজীবের উপস্থিতি বিশ্লেষণ করে এ যাবৎকালের সবচেয়ে বিস্তৃত তথ্য প্রকাশ করেছেন। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে বিভিন্ন টিস্যু থেকে নমুনা সংগ্রহ করে এ গবেষণা চালানো হয়।
১৯৯১ সালে বরফাবৃত হিমবাহের নিচে হাজার বছর ধরে সংরক্ষিত থাকা অবস্থায় উতজির দেহটির খোঁজ মিলেছিল। তিনি হলেন ইউরোপের জানা ইতিহাসে সবচেয়ে প্রাচীন প্রাকৃতিক মমি।
গবেষকরা উতজির দেহের ভেতরে ও বাইরে তিনটি ভিন্ন অণুজীব জগতের সন্ধান পেয়েছেন। যার মধ্যে একটি প্রাচীন অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়া, জীবিত অবস্থায় যা তার দেহের অণুজীব ব্যবস্থার অংশ ছিল।
দ্বিতীয়টি হিমবাহের পরিবেশ থেকে আসা ঠান্ডা আবহাওয়ায় মানিয়ে নেওয়া অণুজীব, যেখানে তার দেহটি পড়েছিল এবং তৃতীয়টি হচ্ছে গত তিন দশক ধরে জাদুঘরে সংরক্ষণের সময় তার দেহে যোগ হওয়া আধুনিক অণুজীব।
গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘মাইক্রোবায়োম’-এ।
এ গবেষণার প্রধান লেখক ও ইতালির বলজানোতে অবস্থিত ‘ইউরাক রিসার্চ ইনস্টিটিউট ফর মমি স্টাডিজ’-এর অণুজীববিজ্ঞানী মোহামেদ সারহান বলেছেন, “আমাদের এ গবেষণায় প্রমাণ মেলে, উতজি কেবল এক স্থবির বা জৈবিকভাবে নিষ্ক্রিয় প্রাচীন অবশেষ নন, বরং তিনি নিজেই গতিশীল এক বাস্তুতন্ত্র।
“তার দেহে কিছু জীবন্ত ও বিপাক করতে পারে এমন অণুজীব বাস করছে, যা সক্রিয়ভাবে এদের আশপাশের পরিবেশের সঙ্গে প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে। ঠান্ডা আবহাওয়ায় মানিয়ে নেওয়া এসব ইস্ট এখনও সংখ্যায় বাড়ছে।
“নির্দিষ্ট কিছু ব্যাকটেরিয়া তার দেহের টিস্যুগুলোতে জায়গা করে নিয়েছে এবং কয়েক দশক ধরে টিকে আছে। বাস্তব অর্থেই এ মমিটি জ্যান্ত এক জৈবিক সংযোগস্থল, যা প্রাচীন বিশ্ব ও বর্তমানের এক মিলনমেলা, যেখানে পাঁচ হাজার বছর আগের বিবিন্ন অণুজীব গত দশকে আসা অণুজীবদের সঙ্গে সহাবস্থান করছে।”
সারহান বলেছেন, প্রত্নতত্ত্ব ও মানব ইতিহাসের দৃষ্টিকোণ থেকে এসব প্রাচীন অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়া তাম্র যুগের একজন মানুষের পেটের ভেতরের বাস্তুতন্ত্রকে জানার এক বিরল সুযোগ করে দিয়েছে।
শিল্পায়ন, অ্যান্টিবায়োটিক ও প্রক্রিয়াজাত খাবার মানুষের দেহের ভেতরের ও বাইরের স্বাভাবিক অণুজীবের পরিবেশ বা ‘মাইক্রোবায়োম’ বদলে দেওয়ার আগের অবস্থাটি কেমন ছিল তা এখান থেকে বোঝা যায়। অন্যদিকে, মমি সংরক্ষণ বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে বেশ কিছু প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে এ আবিষ্কার।
ইতালির বলজানোতে অবস্থিত ‘সাউথ টাইরল মিউজিয়াম অফ আর্কিওলজি’তে উতজিকে মাইনাস ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় রাখা হয়েছে, যাতে তার হিমবাহে চাপা পড়ে থাকার পরিবেশটি হুবহু বজায় থাকে।
তবে এমন হাড়কাঁপানো ঠান্ডার মধ্যেও ঠান্ডাপ্রিয় এসব ইস্ট যেভাবে সক্রিয়ভাবে বেড়ে উঠছে তা দীর্ঘ মেয়াদে এ মমির সুরক্ষাকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে বলেও উল্লেখ করেছেন সারহান।
উতজির অন্ত্রে তার সময়ের যেসব অণুজীবের সন্ধান মিলেছে সেগুলোর মধ্যে এমন কিছু ব্যাকটেরিয়া রয়েছে যা প্রাক-শিল্পায়ন যুগের আঁশওয়ালা খাবারের সঙ্গে সম্পর্কিত।
আধুনিক পশ্চিমা জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত মানুষের দেহে সাধারণত এসব ব্যাকটেরিয়ার আর দেখাই মেলে না।
সারহান বলেছেন, “পশ্চিমা বিশ্বের মানুষের অন্ত্র থেকে এসব ব্যাকটেরিয়া হারিয়ে যাওয়ার পেছনে সম্ভবত খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন, অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার ও প্রাকৃতিক পরিবেশের সংস্পর্শে কম আসার বিষয়টি দায়ী।
“উতজি আমাদের দেখাচ্ছেন, আমরা কী হারিয়েছি ও স্বাস্থ্যগত কারণে ভবিষ্যতে হয়ত কোনো একদিন আমরা আবার কী ফিরিয়ে আনতে চাইতে পারি।”
তবে আদি অন্ত্রের এসব অণুজীবের কোনোটি কি এখনও জৈবিকভাবে সক্রিয় আছে?
সারহান বলেছেন, “এমনটা আমাদের গবেষণার সবচেয়ে সূক্ষ্ম প্রশ্নগুলোর একটি। এ প্রাচীন অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়াগুলোতে ডিএনএ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার স্পষ্ট লক্ষণ রয়েছে, যা হাজার হাজার বছর ধরে রাসায়নিক ক্ষয়ের কারণে হয়, যা আমাদের নিশ্চিত করেছে, এসব ডিএনএ সত্যিই প্রাচীন।
“তবে কেবল ডিএনএ বিশ্লেষণ করে এসব কোষের মধ্যে এখনও কোনো বিপাকীয় কার্যকারিতা অবশিষ্ট আছে কি না তা আমরা পুরোপুরি নিশ্চিত করতে পারছি না। আমরা কেবল এটুকু বলতে পারি, অন্ত্রের সুরক্ষিত ও অক্সিজেনহীন পরিবেশে এগুলো পাঁচ হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে বিস্ময়করভাবে সংরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে।”
‘অতীতের মূল্যবান বার্তা’
উতজির পাকস্থলীর উপাদান নিয়ে করা আগের বিভিন্ন গবেষণা থেকে তার শেষ খাবার সম্পর্কে জানা গিয়েছিল। তিনি হরিণ ও ছাগলের মাংসের পাশাপাশি গম খেয়েছিলেন।
আগে বিভিন্ন গবেষণায় ইঙ্গিত মিলেছে, মৃত্যুর সময় তার বয়স ছিল প্রায় ৪৫ বছর, যা সেই যুগের তুলনায় বেশ দীর্ঘ এবং তিনি শারীরিকভাবে বেশ হৃষ্টপুষ্ট ও শক্তিশালী ছিলেন।
উতজি বিভিন্ন পশুর চামড়া দিয়ে তৈরি পোশাক পরতেন ও তার সঙ্গে তামার কুঠার, দীর্ঘ ধনুক, তীর ও তূণীর, চকমকি পাথরের তৈরি ছুরি এবং একটি ব্যাকপ্যাক ছিল। তার দেহে জ্যামিতিক নকশার ট্যাটুও আঁকা ছিল।
এ গবেষণার সহ-লেখক ও ‘ইউরাক ইনস্টিটিউট ফর মমি স্টাডিজ’-এর পরিচালক অণুজীববিজ্ঞানী ফ্রাঙ্ক মাইক্সনার বলেছেন, “উতজি অতীতের এমন একজন পরিব্রাজক, যিনি আমাদের ইতিহাসের এক মূল্যবান ধারণা দিয়েছেন।”
গবেষকরা সফলভাবে আলাদা করতে পেরেছেন, কোন অণুজীবগুলো উতজির জীবিত অবস্থায় তার দেহে ছিল আর কোনগুলো মৃত্যুর পরে সেখানে বাসা বেঁধেছে।
মৃত্যুর পর হিমবাহের পরিবেশ তার দেহে নিজস্ব অণুজীবের এক নতুন জগত তৈরি করেছিল, যার মধ্যে ছিল আশপাশের বরফ ও মাটি থেকে আসা ঠান্ডা সহনশীল ব্যাকটেরিয়া ও ইস্ট।
সারহান বলেছেন, যেসব অণুজীব কেবল দেহের অভ্যন্তরীণ টিস্যুগুলোতে পাওয়া গেছে এবং যেগুলোর ডিএনএ’তে মারাত্মক ক্ষয়ের চিহ্ন রয়েছে, সেগুলো নিশ্চিতভাবেই উতজির জীবিত অবস্থায় বা মৃত্যুর ঠিক পরপরই সেখানে ছিল।
অন্যদিকে, যেসব অণুজীবের ডিএনএ’তে কোনো ক্ষয়ের চিহ্ন নেই ও যেগুলো জাদুঘরের সংরক্ষণ পরিবেশের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়, সেগুলো আধুনিক সময়ে যোগ হওয়া অণুজীব। আর হিমবাহ থেকে আসা অণুজীবগুলোর অবস্থান এ দুইয়ের মাঝামাঝি, যা তার মৃত্যুর পর থেকে আবিষ্কারের আগ পর্যন্ত সময়ে সেখানে ছড়িয়ে পড়েছিল।
বর্তমানে উতজির ত্বক ও দেহের ভেতরে জমে থাকা তরলে যে জ্যান্ত ও জৈবিকভাবে সক্রিয় বিভিন্ন অণুজীবের সন্ধান মিলছে, সেগুলো আসলে ঠান্ডা আবহাওয়ায় টিকে থাকা ইস্টই।
তবে মমিটি আবিষ্কারের পর জাদুঘরে স্থানান্তরের সময় অণুজীবের আক্রমণের এক নতুন ঢেউ শুরু হয়।
সারহান বলেছেন, “আমরা দেখেছি, মমিটির আর্দ্রতা ধরে রাখার জন্য যে পানি স্প্রে করা হয় তা তার দেহের বাইরের অংশে এক ধরনের ব্যাকটেরিয়ার আধিপত্য তৈরি করেছে।
“আধুনিক সময়ের এ অনুপ্রবেশ মমিটির বাইরের অংশের অণুজীবের পরিবেশকে কার্যকরভাবে বদলে দিচ্ছে। এর আগে, সংরক্ষণ পদ্ধতির এমন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াটি কখনোই চিহ্নিত করা যায়নি।”