Ad for sale 990 x 90 Position (1)
Position (1)
রবিবার, ১৭ মে ২০২৬
Ad for sale 870 x 100 Position (2)
Position (2)

জলবায়ু সংকটের সমাধান? চুনাপাথর ছাড়াই তৈরি হবে পরিবেশবান্ধব সিমেন্ট!

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ডেস্ক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ডেস্ক
প্রকাশ : সোমবার, ১৮ মে,২০২৬, ০৭:১৫ এ এম
জলবায়ু সংকটের সমাধান? চুনাপাথর ছাড়াই তৈরি হবে পরিবেশবান্ধব সিমেন্ট!

বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে যে লড়াই চলছে, তাতে সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হলো সিমেন্ট শিল্প। বর্তমানে বিশ্বব্যাপী মোট কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমনের প্রায় ৮ শতাংশ আসে কেবল সিমেন্ট উৎপাদন থেকে। এই বিপুল পরিমাণ দূষণ কমাতে গবেষকরা দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। কারখানার কার্যক্ষমতা বাড়ানো বা জ্বালানি হিসেবে জীবাশ্ম জ্বালানির বদলে নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহার করে কিছুটা লাভ হলেও মূল সমস্যাটি অন্য জায়গায় রয়ে গেছে।

সিমেন্ট তৈরির মূল উপাদান হলো ‘লাইম’ বা চুন, যা পাওয়া যায় চুনাপাথর গলিয়ে। আর এই চুনাপাথরকে চুনে রূপান্তর করার রাসায়নিক প্রক্রিয়াজাতকরণের সময়ই উপজাত বা বাই-প্রোডাক্ট হিসেবে বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্যাস বাতাসে মেশে। একে বলা হয় ‘ডিরেক্ট প্রসেস এমিশন’ বা সরাসরি প্রক্রিয়াগত নির্গমন। অবাক করার মতো বিষয় হলো, সিমেন্ট কারখানার বিশাল চুল্লি বা কিলন গরম করতে যে জ্বালানি পোড়ানো হয়, তার চেয়েও বেশি কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত হয় এই রাসায়নিক প্রক্রিয়ার কারণে।

এই কঠিন বাস্তবতাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে ‘কমিউনিকেশনস সাসটেইনেবিলিটি’ সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি নতুন গবেষণা প্রবন্ধ এক যুগান্তকারী সম্ভাবনার পথ দেখিয়েছে। গবেষকরা প্রশ্ন তুলেছেন, সিমেন্ট তৈরিতে যদি আর চুনাপাথরের প্রয়োজনই না হয়, তবে কেমন হবে।

ঊনবিংশ শতাব্দীতে আবিষ্কৃত ‘পোর্টল্যান্ড সিমেন্ট’ আজও বিশ্বজুড়ে বহুল ব্যবহৃত। এটি তৈরির প্রচলিত পদ্ধতিটি বেশ সহজ—চুনাপাথরের সাথে কাদা মাটি বা কয়লার ছাই মিশিয়ে উচ্চ তাপমাত্রায় পোড়ানো। এর ফলে ক্যালসিয়াম কার্বনেট থেকে কাঙ্ক্ষিত ক্যালসিয়াম অক্সাইড বা চুন পাওয়া যায় ঠিকই, কিন্তু কার্বনেট থেকে একটি অক্সিজেন পরমাণু আলাদা হয়ে যাওয়ার কারণে উপজাত হিসেবে তৈরি হয় ক্ষতিকর কার্বন ডাই-অক্সাইড।

নতুন এই গবেষণার সাথে যুক্ত প্রকৌশলীরা দাবি করেছেন, তারা গবেষণাগার পর্যায়ে চুনাপাথরের পরিবর্তে ‘ব্যাসাল্ট’ বা কৃষ্ণশিলা (এক ধরনের আগ্নেয় শিলা) ব্যবহার করে সফলভাবে পোর্টল্যান্ড সিমেন্ট তৈরি করতে পেরেছেন। ব্যাসাল্ট পাথরের ভেতরে রয়েছে ক্যালসিয়াম, অ্যালুমিনিয়াম, আয়রন বা লোহা, ম্যাগনেসিয়াম, সোডিয়াম, সিলিকন এবং অক্সিজেনের মতো উপাদানের এক চমৎকার মিশ্রণ। খেয়াল করার মতো বিষয় হলো, এই তালিকায় কোনো ‘কার্বন’ নেই। অর্থাৎ, ক্যালসিয়াম অক্সাইড পাওয়ার জন্য আমাদের আর কার্বন-সমৃদ্ধ চুনাপাথরের ওপর নির্ভর করার কোনো প্রয়োজন নেই।

চুনাপাথর সরাসরি চুল্লিতে ফেলে দেওয়ার মতো সহজ নয় ব্যাসাল্টের প্রক্রিয়াটি। এটি অনেকটা খনিজ শোধন বা পুনর্ব্যবহার প্রক্রিয়ার মতো। প্রথম ধাপে অ্যাসিড ব্যবহার করে ব্যাসাল্ট থেকে ক্যালসিয়ামের মতো উপাদানগুলোকে আলাদা বা লিচিং করা হয়। দ্বিতীয় ধাপে একটি রাসায়নিক বা শক্তিচালিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সেই ক্যালসিয়ামকে ক্যালসিয়াম হাইড্রোক্সাইডে রূপান্তর করা হয়। শেষ ধাপে এই ক্যালসিয়াম হাইড্রোক্সাইডকে প্রয়োজনীয় উপাদানের সাথে মিশিয়ে চুল্লিতে পোড়ানো হয়।

সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এই পদ্ধতিতে প্রচলিত চুনাপাথরের চেয়ে অনেক কম তাপমাত্রার প্রয়োজন হয়। আর এর ফলে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর কার্বন ডাই-অক্সাইডের বদলে উপজাত হিসেবে নির্গত হয় কেবল নিরীহ জলীয় বাষ্প। এছাড়া প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত অ্যাসিড বা অন্যান্য রাসায়নিকগুলোকেও পুনরায় ব্যবহারের উপযোগী করে নেওয়া সম্ভব।

তবে এই নতুন পদ্ধতির একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো শক্তির ব্যবহার। সাধারণ পদ্ধতির তুলনায় প্রচলিত প্রযুক্তিতে ব্যাসাল্ট থেকে সিমেন্ট তৈরি করতে প্রায় দ্বিগুণ শক্তির প্রয়োজন হয়। কিন্তু ‘থার্মোডাইনামিকস’ বা তাপগতিবিদ্যার সূত্র অনুযায়ী, ব্যাসাল্টের খনিজকে ক্যালসিয়াম অক্সাইডে রূপান্তর করতে তাত্ত্বিকভাবে চুনাপাথরের চেয়ে অর্ধেক শক্তির প্রয়োজন হওয়ার কথা। বর্তমানে প্রযুক্তিগুলো এই রূপান্তরের ক্ষেত্রে যথেষ্ট দক্ষ নয় বলেই শক্তির অপচয় বেশি হচ্ছে। অর্থাৎ, প্রযুক্তির আরও উন্নয়ন ঘটলে এই শক্তির খরচ নাটকীয়ভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব।

দ্বিগুণ শক্তি খরচ হওয়ার পরেও ব্যাসাল্ট থেকে সিমেন্ট উৎপাদন করা পরিবেশের জন্য অনেক বেশি লাভজনক। এর প্রধান কারণ হলো, এই প্রক্রিয়ায় চুনাপাথর থেকে সরাসরি কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমনের পথটি সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। পাশাপাশি এই পুরো প্রক্রিয়াটি জীবাশ্ম জ্বালানির বদলে সম্পূর্ণ বিদ্যুৎ দিয়ে পরিচালনা করা সম্ভব। গবেষকদের হিসাব মতে, যদি প্রচলিত কয়লা বা গ্যাসভিত্তিক গ্রিডের বিদ্যুৎ ব্যবহার করেও এই কারখানা চালানো হয়, তাও কার্বন নির্গমন প্রায় ৩০ শতাংশ কমে যাবে। আর যদি গ্রিডের বিদ্যুৎ পরিবেশবান্ধব বা গ্রিন এনার্জি যেমন সৌর বা বায়ু বিদ্যুৎ হয়, তবে কার্বন নির্গমনের মাত্রা প্রায় শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা সম্ভব।

বাণিজ্যিক দুনিয়ায় পরিবেশের চেয়ে লাভের অংকটাই সবসময় বড় হয়ে দাঁড়ায়। দ্বিগুণ শক্তি খরচের কারণে এই সিমেন্টের উৎপাদন খরচ কিছুটা বেশি হতে পারে। তবে গবেষকরা এর একটি দারুণ অর্থনৈতিক সমাধানের পথও দেখিয়েছেন। ব্যাসাল্ট শোধন করার সময় কেবল সিমেন্টের উপাদানই পাওয়া যায় না, বরং এর থেকে লোহা, ম্যাগনেসিয়াম এবং অ্যালুমিনিয়ামের মতো মূল্যবান ধাতুও আলাদা করে সংগ্রহ করা সম্ভব, যার বাজারে ভালো বাণিজ্যিক মূল্য রয়েছে। এছাড়া অবশিষ্টাংশ সিলিকন উপাদানটিকে কয়লার ছাইয়ের বিকল্প হিসেবে সরাসরি সিমেন্ট তৈরিতেই ব্যবহার করা যাবে। ফলে এই উপজাত ধাতুগুলো বিক্রি করে সিমেন্ট উৎপাদনের বাড়তি খরচ অনায়াসেই পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব।

যদিও ল্যাব থেকে এটিকে শিল্প পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার মাঝে এখনো অনেক চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে, তবুও এই প্রাথমিক বিশ্লেষণটি ভবিষ্যতের একটি টেকসই পথ দেখাচ্ছে। বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস কমানোর লড়াইয়ে সিমেন্ট খাতকে যেখানে সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ মনে করা হচ্ছিল, সেখানে এই ‘ব্যাসাল্ট সিমেন্ট’ এক চমৎকার এবং নিরেট সমাধান হতে পারে।

ধ্রুব নিউজের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

💬 Comments

Login | Register
Ad for sale 270 x 225 Position (3)
Position (3)
Ad for sale 990 x 90 Position (4)
Position (4)