বাঁকড়া (যশোর) প্রতিনিধি
একে একে দাফন করতে নিয়ে যাওয়া হয় ৪ মরদেহ। ছবি: ধ্রুব নিউজ
যে বাড়িতে এত বছর পর ফেরা ছেলেকে নিয়ে ধুমধাম আয়োজন হওয়ার কথা ছিল, নতুন পুত্রবধূ ঘরে তোলার আনন্দ থাকার কথা ছিল—সেখানে এখন সারিবদ্ধ চার-চারটি খাটিয়া। এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় শেষ হয়ে গেছে তিনটি পরিবার। গতকাল সোমবার রাতে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যখন মালয়েশিয়া প্রবাসী আরিফ ইসলাম পা রাখেন, তখন তাকে জড়িয়ে ধরে মা নুর জাহানের চোখ থেকে ঝরেছিল আনন্দের অশ্রু। কিন্তু কে জানত, সেই পরম আনন্দের মুহূর্তটিই হতে যাচ্ছে পুরো পরিবারের এক শেষ যাত্রা! আজ মঙ্গলবার রাত ১০টা ৩০ মিনিটে মরহুমদের নিজ বাসভবনে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে পাশাপাশি শায়িত হয়েছেন একই পরিবারের সেই চার সদস্য।
আজ মঙ্গলবার (২ জুন) ভোর পৌনে চারটার দিকে ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ের মালিগ্রাম নামক স্থানে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় মা, দুই ভাই ও এক বোনসহ প্রাণ হারিয়েছেন। নিহতরা হলেন—যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার বালিযাডাঙ্গা (উজ্জ্বলপুর) গ্রামের ইজিবাইক চালক শহিদুল ইসলামের স্ত্রী নুর জাহান (৫০), বড় ছেলে প্রবাসী আরিফ ইসলাম (২৫), ছোট ছেলে রাকিব (১৮) এবং বিবাহিতা মেয়ে আয়েশা খাতুন (২৮)। একই দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন তাদের বহনকারী প্রাইভেটকার চালক মনিরামপুর উপজেলার গৌরীপুর গ্রামের জাহিদ হাসান (৩৫)। এই এক দুর্ঘটনা মূলত তিনটি পরিবারকে ধ্বংস করে দিয়েছে। ইজিবাইক চালক বৃদ্ধ বাবা শহিদুল ইসলামের পুরো পরিবার এখন নিশ্চিহ্ন। অন্যদিক আয়েশা খাতুনকে হারিয়ে নিস্প্রদীপ হয়ে গেছে স্বামী ইলিয়াছের সংসার, যেখানে তাদের দুই অবুঝ শিশুসন্তান আশরাফুল হোসাইন (৭) ও তাসফিয়া (৩) গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে আছেন। নিহত চালক জাহিদের পরিবারেও নেমে এসেছে অন্ধকার।
ভাঙ্গা থানায় নিহত আয়েশার স্বামী ইলিয়াছের দায়ের করা এজাহার থেকে জানা যায়, ঢাকা থেকে যশোরগামী প্রাইভেটকারটি (ঢাকা মেট্রো-গ-২৫-৩১৫৫) এক্সপ্রেসওয়ের মালিগ্রাম নামক স্থানে পৌঁছালে অন্ধকার সড়কে কোনো ব্যারিয়ার বা সংকেত ছাড়া অবৈধভাবে দাঁড়িয়ে থাকা একটি গ্যাস সিলিন্ডার ভর্তি ট্রাকের (ঢাকা মেট্রো-ট-১৮-১১৫৮) পেছনে সজোরে ধাক্কা দেয়। ধাক্কার তীব্রতায় প্রাইভেটকারটি দুমড়ে-মুচড়ে ট্রাকের নিচে ঢুকে যায়। ঘটনাস্থলেই আয়েশা, নুর জাহান, আরিফ ও চালক জাহিদ মারা যান। গুরুতর আহত ছোট শ্যালক রাকিবকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকেও মৃত ঘোষণা করেন।
রাতে মরহুমদের নিজ বাসভবন প্রাঙ্গণে জানাজায় মানুষের ঢল নামে। জানাজায় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর জেলা কর্মপরিষদ ও মজলিসে শূরা সদস্য অধ্যাপক জয়নাল আবেদীন, ঝিকরগাছা উপজেলা আমির মাওলানা আঃ আলিম, উপজেলা যুব বিভাগের সভাপতি আবিদুর রহমান, ওলামা বিভাগের সভাপতি অ্যাডভোকেট মুফতি আবু জাফর, বাঁকড়া ইউনিয়নের আমির মাওলানা আঃ খালেক, সেক্রেটারি মামুনুর রহমান এবং ১১ নং বাঁকড়া ইউনিয়ন জামায়াত মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থী অ্যাডভোকেট হাবিব কায়সার।
এর আগে বিকেলে নিহতের বাড়িতে এসে শোকার্ত স্বজনদের সমবেদনা জ্ঞাপন করেন সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি সাবিরা সুলতানা মুন্নি, বাঁকড়া ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি এস এম আলী আকবার, মাস্টার মনিরুল ইসলাম প্রমুখ।
পারিবারিক অভাব-অনটন ঘোচাতে প্রায় ১০ বছর আগে মালয়েশিয়ায় পাড়ি দিয়েছিলেন আরিফ ইসলাম। ঋণের বোঝা চুকানো আর ঘরবাড়ির কাজ শেষ করতে গিয়ে দীর্ঘ এক দশকে আর বাড়ি ফেরা হয়নি। এবার ৩ মাসের ছুটিতে দেশে ফিরছিলেন চিরতরে পরবাসের ক্লান্তি মুছে নতুন জীবনে পা রাখতে, বিয়ে করতে। ওদিকে গ্রামের বাড়িতে বাবা শহিদুল ইসলাম অধীর আগ্রহে পথ চেয়ে বসেছিলেন। ছেলে ফিরবে, পুরো ঘর আলো করে সবাই একসাথে বসবে—কত শত পরিকল্পনা! কিন্তু সবকিছু শেষ হয়ে গেল মাটির গহীনে।