ধ্রুব ডেস্ক
ব্যাংকের পর্ষদে এস আলমের নিয়ন্ত্রণ থাকার সময়কালে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তাদের আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ব্যাপক আকারে ছাঁটাই করা হয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে চাকরিচ্যুতদের পুনর্বহালের দাবি জাতীয় সংসদে তুলেছেন চট্টগ্রামের দুই সংসদ সদস্য; যাদের বেশির ভাগকে আলোচিত ব্যবসায়ী এস আলমের নিয়ন্ত্রণাধীন পর্ষদের ব্যাংক থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল।
সোমবার রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনীত ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় বিএনপির এই দুই সংসদ সদস্য এ দাবি তোলেন।
চট্টগ্রাম-১২ আসনে বিএনপির সংসদ সদস্য মোহাম্মদ এনামুল হক বলেন, পটিয়াসহ চট্টগ্রাম অঞ্চলে ১০ হাজারের উপরে ছেলে-মেয়েকে ব্যাংক থেকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। তাদের চাকরিতে পুনর্বহাল করা দরকার।
একই দাবি তুলে চট্টগ্রাম-১৪ আসনে বিএনপির সংসদ সদস্য জসিম উদ্দিন আহমেদ বলেন, সঠিক তদন্ত করে চাকরিচ্যুত ব্যাংক কর্মীদের আবার কাজে ফেরানোর ব্যবস্থা করতে হবে।
চব্বিশের আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর যেসব ব্যাংকের পর্ষদ চট্টগ্রামের শিল্প গ্রুপ এস আলমের নিয়ন্ত্রণে ছিল সেগুলো ভেঙে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। পাশাপাশি পর্ষদে এস আলমের নিয়ন্ত্রণ থাকার সময়কালে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তাদের ছাঁটাই করা হয়।
এ নিয়ে গত দুই বছরে বেশ কয়েকবার আন্দোলন ও বিক্ষোভ করেন চাকরিচ্যুতরা। তাদের ভাষ্য, চব্বিশের ৫ অগাস্টের পর ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, আল আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক থেকে বিনা নোটিসে ‘চট্টগ্রাম ট্যাগ’ দিয়ে সাত হাজারের বেশি কর্মকর্তা কর্মচারীকে চাকুরিচ্যুত করা হয়। এই সবগুলো ব্যাংকের পর্ষদ আওয়ামী লীগের শেষ দুই মেয়াদের বেশিরভাগ সময় এস আলম ও ভাইদের নিয়ন্ত্রণে ছিল।
এদিন জাতীয় সংসদে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আলোচনা হয়। পরে মঙ্গলবার বিকাল ৩টা পর্যন্ত বৈঠক মুলতবি করা হয়।
এনামুল হক বলেন, “আমি এখানে আপনার (স্পিকার) মাধ্যমে আবেদন জানাই, যাদেরকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে তাদেরকে চাকরিতে পুনরায় বহাল করার জন্য।”
জসিম উদ্দিন বলেন, “ব্যাংকার ভাইরা তাদেরকে ইন্টেরিম গভর্নমেন্টের সময় চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। তাদের বেহাল অবস্থা। তদন্ত করে তাদের চাকরিতে ফেরানো উচিত।”
জুলাই নিয়ে তারেক রহমানকে ‘মাস্টার মাইন্ড’ বললেন এমরান
সিলেট-৬ আসনে বিএনপির সংসদ সদস্য এমরান আহমদ চৌধুরী আলোচনায় বলেন, জুলাই বিপ্লব নিয়ে বিভাজন তৈরির দিন শেষ হওয়া উচিত।
নিজেকে ‘জুলাই যোদ্ধা’ হিসেবে তুলে ধরে তিনি বলেন, “জুলাই বিপ্লব মানে আমাদের সিনিয়র নেতৃবৃন্দকে অপমান করে কথা বলার জুলাই বিপ্লব নয়। জুলাই বিপ্লব মানে জুলাইয়ের নামে মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রণালয়ে গিয়ে চাঁদাবাজি করার জন্য জুলাই বিপ্লব হয় নাই।
“জুলাই বিপ্লবের মাস্টারমাইন্ড ছিলেন আমাদের প্রিয় নেতা তারেক রহমান। জুলাই বিপ্লব’ হয়েছিল বৈষম্যহীন একটা সমাজ ব্যবস্থার জন্য এবং গণতান্ত্রিক ভোটাধিকারের জন্য।”
সিলেট অঞ্চলের বঞ্চনার কথাও তুলে ধরেন এই সংসদ সদস্য।
রাষ্ট্রপতিকে ধন্যবাদ দেওয়া যাবে?
ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় একাধিক সংসদ সদস্য রাষ্ট্রপতির ভাষণকে ঘিরে ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান তুলে ধরেন।
নওগাঁ-৪ আসনে বিএনপির সংসদ সদস্য ইকরামুল বারী টিপু বলেন, “রাষ্ট্রপতি তার ভাষণে অতীতের দুঃশাসন, গুম-খুন, রাজনৈতিক অধিকারহীনতার বহু সত্য স্বীকার করেছেন। সে কারণে অতীতের ভুলত্রুটি ক্ষমা করে তাকে ধন্যবাদ দেওয়া যায়।”
ঝিনাইদহ-৩ আসনে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মতিউর রহমান বলেন, তিনি রাষ্ট্রপতির ভাষণকে ‘রাজনৈতিক বিচারে’ অভিনন্দন জানাতে পারছেন না। তার অভিযোগ, অতীতে রাষ্ট্রপতি ফ্যাসিবাদী শাসনের সময় নীরব ছিলেন।
ঝিনাইদহ-৪ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য আবু তালেবও বলেন, বিগত সরকারের ‘দোসর’ হিসেবে রাষ্ট্রপতির দায় এড়িয়ে যাওয়া যায় না। তাই ব্যক্তিগতভাবে তিনি রাষ্ট্রপতিকে ধন্যবাদ দিতে পারছেন না।
নরসিংদী-৫ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য আশরাফ উদ্দিন রাষ্ট্রপতির ভাষণের অর্থনৈতিক অংশের প্রশংসা করলেও বলেন, তার ব্যক্তিগত ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন আছে। তিনি সংসদে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ‘ঘৃণা প্রস্তাব’ আনার কথাও তোলেন।
‘মব’ ঠেকাতে বিশেষ আইনের দাবি
ময়মনসিংহ-৮ আসনে বিএনপির সংসদ সদস্য লুতফুল্লাহেল মাজেদ ‘মব’ ঠেকাতে বিশেষ আইন করার দাবি জানান।
তিনি বলেন, ৫ অগাস্টের পর ‘মিস ইনফরমেশন, ম্যাল ইনফরমেশন, ডিজ ইনফরমেশন’ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপপ্রয়োগ বড় সংকট হয়ে উঠেছে। গুজবের ভিত্তিতে মানুষ পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটছে, যা বন্ধ না করলে সামনে বড় জাতীয় সমস্যা তৈরি হবে।
চা শিল্প ‘সিসিইউতে’, বাঁচাতে দাম বাড়ানোর প্রস্তাব
মৌলভীবাজার-১ আসনে বিএনপির সংসদ সদস্য নাসিরউদ্দিন আহমেদ চা শিল্প রক্ষার প্রশ্নটিকে জাতীয় বিষয় হিসেবে তুলে ধরেন। বলেন, বাংলাদেশে ২০০টির বেশি চা বাগান আছে, কিন্তু শিল্পটি এমন সংকটে পড়েছে যে, মেডিকেলের ভাষায় এটি ‘সিসিইউতে’ বলা যায়।
এবার সমাধান না হলে আগামী বছর ‘আইসিইউতে’ চলে যেতে পারে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
তার অভিযোগ, সার, কীটনাশকসহ উৎপাদন উপকরণের দাম ৩০০ থেকে ৫০০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে, কিন্তু চায়ের দর গত ১০ বছরে বাড়েনি। চা শ্রমিকের মজুরি বাড়ানোর দাবিও আছে, কিন্তু তার সমাধান হবে উৎপাদিত চায়ের ন্যায্য দর নিশ্চিত করলে।
তিনি বলেন, নিলামে চায়ের দর বর্তমান প্রায় আড়াইশ টাকা থেকে ৪০০ টাকায় উন্নীত করা গেলে শিল্প ও শ্রমিক দুটোই টিকে থাকবে।
রংপুরে বৈষম্য, বেকারত্ব, স্বাস্থ্যসেবা
রংপুর-৩ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমান বেলাল অভিযোগ করেন, তার অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে আঞ্চলিক বৈষম্যের শিকার।
তার দাবি, রংপুরে শিক্ষিত বেকারের হার ২৮ শতাংশ, যা দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ।
তিনি রংপুর সিটি করপোরেশনের দুর্বল অবকাঠামো, খাল দখল, মেডিকেল কলেজে বেড-জনবল সংকট, শিশু হাসপাতাল চালু না হওয়া এবং কর্মসংস্থানের ঘাটতির কথা তুলে ধরেন।
রংপুর-৫ আসনে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য গোলাম রব্বানী বলেন, তার এলাকায় ৮ লাখ মানুষের জন্য একটিমাত্র ৫০ শয্যার হাসপাতাল আছে, যেখানে একজন ক্লিনার দিয়ে কাজ চলছে।
রংপুর-৬ আসনে জামায়াতে ইসলামীর সদস্য নুরুল আমিন বলেন, তার এলাকায় কয়লা খনি, লোহার খনি, আইটি পার্ক ও কৃষিভিত্তিক শিল্পের সম্ভাবনা আছে। সেগুলো কাজে লাগাতে সরকারের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা দরকার।
বন্ধ কারখানা চালুর দাবি
নরসিংদী-৫ আসনে বিএনপির সংসদ সদস্য আশরাফ উদ্দিন বলেন, কর্মসংস্থান বাড়াতে বন্ধ শিল্পকারখানা চালু করা জরুরি।
তার ভাষায়, শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন বহু শিল্প ইউনিট বন্ধ হয়ে আছে, ফলে অর্থনীতি ও চাকরির বাজার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
ফরিদপুর-৩ আসনে বিএনপির সংসদ সদস্য নায়েব ইউসুফ আহমেদ বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ফরিদপুরবাসী বিভাগ ঘোষণার আশ্বাস পেলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। তার আশা, এবার দ্রুত ফরিদপুরকে বিভাগ ঘোষণা করা হবে।
একই সঙ্গে ফরিদপুরে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং পদ্মা রক্ষায় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
নওগাঁ-৫ আসনে বিএনপির সদস্য জাহিদুল ইসলাম ধলু নওগাঁ শহরের প্রধান সড়ক চার লেনে উন্নীত করা এবং হাসপাতালের বেড ও চিকিৎসা সুবিধা বাড়ানোর দাবি তোলেন।
দিনাজপুর-৫ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য এ জেড এম রেজওয়ানুল হক বলেন, তার এলাকায় কয়লা ও তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সেগুলো পুরোপুরি কাজে লাগানো হচ্ছে না।
গোপালগঞ্জ-২ আসনে বিএনপির সংসদ সদস্য কে এম বাবর বলেন, গত বছরের একটি রাজনৈতিক কর্মসূচিকে ঘিরে দায়ের হওয়া মামলায় বহু নিরীহ মানুষ আসামি হয়েছেন। সঠিক তদন্তের ভিত্তিতে তাদের অব্যাহতির দাবি জানান তিনি।
ধ্রুব/এস.আই