ড. আবদেল আজিজ আলুওয়াইশেগ
মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল এই অঞ্চলের জন্য কী বার্তা বহন করে—তা নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন উপরাষ্ট্রপতি জেডি ভ্যান্স। এক্স-এ (সাবেক টুইটার) প্রকাশিত একটি দীর্ঘ পোস্টে তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, “কী ঘটেছে এবং কেন ঘটেছে তা নিয়ে প্রচুর অন্তর্দ্বন্দ্ব ও তর্কবিতর্ক হবে… তবে আমরা কেন হেরেছি, তার আসল কারণ প্রায় সকলের কাছেই স্পষ্ট।”
তিনি আরও যোগ করেন, “আমরা হেরেছি এই যুদ্ধের কারণেই। রাষ্ট্রপতি নিজেই গতকাল রাতে এ কথা বলেছেন।”
নিজের বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়ে ভ্যান্স বলেন, প্রশাসনের কর্মসূচি সাধারণ মানুষের চাওয়ার সঙ্গে বেমানান হয়ে পড়েছিল। জনগণের মূল দাবিগুলো ছিল—আমেরিকাকে অগ্রাধিকার দেওয়া, ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির মতো অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান করা, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের অবসান ঘটানো এবং ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের রূপান্তর। তিনি আরও বলেন, “উপরোক্ত কারণেই তাদের অনেকেই ডেমোক্র্যাটদের ভোট দিয়েছেন।” তিনি সবসময়ই কূটনীতির পক্ষে ছিলেন এবং সংঘাতের কূটনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানানোর জন্য ফক্স নিউজের উপস্থাপিকা র্যাচেল ক্যাম্পোস-ডাফির পরামর্শকে “যথাযথ” বলে অভিহিত করেছেন।
বাস্তবে, মঙ্গলবারের মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার অনেক আগেই ভ্যান্স কূটনীতির প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। তবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে মতের মিল না থাকায় এবং তাকে ‘অযোগ্য’ তকমা দিয়ে তখন তার সেই উদ্যোগ খারিজ করা হয়েছিল। ভোটারদের কাছ থেকে প্রশাসনের এই অপ্রত্যাশিত তিরস্কার হয়তো শেষ পর্যন্ত তার ভাগ্যকেই অনুকূলে নিয়ে এসেছে।
নির্বাচনের ঠিক এক সপ্তাহ আগে ভ্যান্স ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের কট্টরপন্থী সচিব মোহসেন রেজাইকে একটি চিঠি পাঠিয়েছিলেন। সেখানে তিনি নির্বাচনের পর কূটনীতি পুনরায় শুরু করা এবং নতুন করে দানা বাঁধতে থাকা সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসার একটি পথ প্রস্তাব করেছিলেন। চিঠিতে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা কিছুটা শিথিল করার বিনিময়ে ইরানকে তার পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে প্রাথমিক প্রতিশ্রুতি দিতে এবং সাত দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দিতে বলা হয়।
আমেরিকান ভোটাররা ব্যালটের মাধ্যমে তাদের রায় স্পষ্ট করার আগেই ভ্যান্সের এই চিঠিটি প্রমাণ করেছিল যে যুক্তরাষ্ট্র কূটনীতির পক্ষেই রয়েছে।
ভ্যান্সের এই কূটনৈতিক সদিচ্ছার প্রকাশ্য বিরোধিতা করে ইরানের প্রধান আলোচক ও সংসদ স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ গত সপ্তাহে এক্স-এ লিখেছেন: “মধ্যস্থতাকারীদের কাছে ইরানের শর্তগুলো বারবার এবং স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে। প্রলোভন বা শাস্তির কোনো নীতিরই ইরানের ওপর কোনো প্রভাব নেই। ইরানের সাতটি শর্তে সম্মত হলেই কেবল অগ্রগতি সম্ভব।” এই শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে—নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, জব্দকৃত সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়া এবং “সকল ফ্রন্টে” যুদ্ধের অবসান। ইরান আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (IAEA) পরিদর্শকদের ফিরে আসার পথও রুদ্ধ করেছে; দৃশ্যত তাদের আশঙ্কা, এতে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের সঠিক পরিমাণ ও অবস্থান সম্পর্কিত গোপন তথ্য ফাঁস হয়ে যেতে পারে।
উভয় পক্ষের মধ্যকার তীব্র অবিশ্বাসের কারণে, ইরানের তেল রপ্তানির ওপর পারস্পরিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল হওয়ার আগে—তৃতীয় কোনো দেশে তাদের উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রপ্তানি করার মতো প্রাথমিক প্রতিশ্রুতি দিতেও তেহরান অনিচ্ছুক। এর আগে সেপ্টেম্বরে নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে অনুষ্ঠিত বৈঠকে তেহরান প্রস্তাব দিয়েছিল যে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের তেল রপ্তানির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করলে এবং হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়া হলে, তার ছয় বা সাত দিন পর থেকে তারা পারমাণবিক আলোচনা শুরু করতে পারে।
ইরানের কঠোর প্রকাশ্য অবস্থান সত্ত্বেও, পর্দার আড়ালের আলোচনা মূলত মূল বিষয়ের চেয়ে ঘটনাক্রম এবং এই সমঝোতা উভয়পক্ষ টিকিয়ে রাখবে কি না—তার নিশ্চয়তা পাওয়ার মাধ্যমেই আবর্তিত হয়েছে। এ কারণেই তারা এখন তৃতীয় পক্ষের গ্যারান্টি খুঁজছে।
এদিকে, নির্বাচনের আগেই একটি বড় ধরনের মার্কিন সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি চলছিল। গত সপ্তাহে অসুস্থ হওয়ার আগে ডেমোক্র্যাটিক সিনেটর ক্রিস মারফি এক্স-এ লিখেছিলেন: “জানা গেছে, ট্রাম্প নির্বাচনের পর ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ পুনরায় শুরু করার পরিকল্পনা করছেন। আমাদের মধ্যে কয়েকজন এই যুদ্ধ পরিকল্পনা সম্পর্কে অবগত আছি। যদিও আমি বিস্তারিত প্রকাশ করতে পারছি না, তবে এটুকু বলতে পারি: পরিকল্পনাটি সম্পূর্ণ উন্মাদনা। এটি কোনো উদ্দেশ্য সাধন করবে না, বরং উত্তেজনার পারদ কেবল বাড়িয়েই দেবে।”
মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটে দেওয়া মন্তব্যে মারফি আরও বলেন: “যুদ্ধ পরিকল্পনাটি কী হতে পারে, সে বিষয়ে আমি বেশ বিস্তারিত বিবরণ পেয়েছি… আমি শুধু এটুকু বলব: এই পরিকল্পনাটি পাগলামি। এটি একটি বিধ্বংসী সংঘাতের জন্ম দেবে এবং সম্ভবত আইনের শাসনের প্রতি আমাদের প্রতিশ্রুতিকেও ধুলিস্যাৎ করে দেবে।” তিনি আরও যোগ করেন, “আমার মতে, তারা যে নীল নকশা তৈরি করেছে, তা এই যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত ও আরও তীব্র করবে, যা আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থের জন্য এক বড় বিপর্যয় ডেকে আনবে।”
শীর্ষ কর্মকর্তাদের মন্তব্য থেকেই স্পষ্ট যে, ইরানের পক্ষ থেকেও কেবল এই অঞ্চলে মার্কিন স্বার্থের ওপর নয়, বরং উপসাগরীয় অঞ্চলের ইন্টারনেট কেবল, বিদ্যুৎ গ্রিড এবং অন্যান্য বেসামরিক স্থাপনার পাশাপাশি এই অঞ্চলের বাইরের লক্ষ্যবস্তুগুলোতেও আঘাত হানার মতো সমান বেপরোয়া পরিকল্পনা ছিল।
এতদ্সত্ত্বেও, ভ্যান্সের চিঠিটি এই ইঙ্গিতই দিচ্ছিল যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কূটনীতিকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে—এমনকি আমেরিকান ভোটাররা সেই রায় দেওয়ার আগেই। এটা সত্যি যে তিনি এই যুদ্ধ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সন্দিহান ছিলেন, তবে জানা যায় যে ইরানে পাঠানোর আগে ট্রাম্প এই চিঠিতে অনুমোদন দিয়েছিলেন।
ভ্যান্সের চিঠির প্রতি ইরানের প্রতিক্রিয়া এবং নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে তার মন্তব্যের ওপর এখন অনেক কিছুই নির্ভর করছে। নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে ভ্যান্সের মূল্যায়নের বিপরীতে কালিবাফের প্রতিক্রিয়া মোটেও উৎসাহব্যঞ্জক নয়। বুধবার তিনি লিখেছেন: “বিবেক কিংবা জীবনযাত্রার ব্যয়—আমেরিকানরা এই যুদ্ধে ‘না’ বলেছে, এবং আমরা এই জনমতকে সাধুবাদ জানাই। যদি মার্কিন সরকার আন্তর্জাতিক লবিস্ট ও ব্ল্যাকমেলারদের স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে নিজেদের এই জনরায় বা প্রকাশ্য ইচ্ছার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে, তবে তাদের বুঝতে হবে যে আমাদের ‘না’-এর পেছনে একটি দুঃস্বপ্নও লুকিয়ে আছে।”
বৃহস্পতিবার তিনি আরও যোগ করেন: “হারতে থাকা জুয়াড়ির মতো মানসিকতা নিয়ে তারা জুয়ার টেবিল ছেড়ে উঠতে চাইছে না। ‘বস’ যুদ্ধের পরবর্তী পর্বের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, যখন আমেরিকা ইসরায়েল-প্রাধান্য নীতির খাদের কিনারে টলমল করছে। টেড টক (TED Talk) দেওয়া বন্ধ করুন। আপনার বসকে এই সত্যিটা সরাসরি বলছেন না কেন?”
তেহরান যদি মনে করে যে নির্বাচনের ফলাফলের অর্থ হলো যুদ্ধের সমস্ত সম্ভাবনা চিরতরে শেষ হয়ে গেছে কিংবা যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে সংঘাতের পথ চিরতরে ত্যাগ করেছে, তবে তা হবে অত্যন্ত বিপজ্জনক ভুল হিসাব। এটা সত্যি যে কংগ্রেসের উভয় কক্ষেই ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করায় এবং রিপাবলিকানরা নিয়ন্ত্রণ হারানোয় ট্রাম্প তার যুদ্ধ পরিকল্পনার জন্য কংগ্রেসের স্বয়ংক্রিয় সমর্থন বা অনুমোদন আর পাচ্ছেন না। এর ফলে ট্রাম্প অনেকাংশেই একজন কোণঠাসা রাষ্ট্রেপতির রূপ নিয়েছেন।
কিন্তু এই রাজনৈতিক পটপরিবর্তন মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে রাতারাতি বড় কোনো মৌলিক পরিবর্তন আনবে না, অন্তত এই মুহূর্তে নয়। ঐতিহাসিকভাবে দেখা গেছে, এমন পরিস্থিতিতে কংগ্রেসের তুলনায় অনেক বেশি প্রাতিষ্ঠানিক ও রাজনৈতিক সুবিধা নিয়ে খোদ ট্রাম্পই পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করবেন। তবে অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ক্ষেত্রে চিত্রটি ভিন্ন হতে পারে, যেখানে আগামী জানুয়ারিতে নতুন আইনপ্রণেতারা শপথ নেওয়ার পর কংগ্রেস আরও অনেক বেশি দৃঢ় ও আক্রমণাত্মক ভূমিকা পালন করতে পারে।
তাত্ত্বিকভাবে ডেমোক্র্যাটরা ‘ওয়ার পাওয়ার রেজোলিউশন’ (যুদ্ধ ক্ষমতা প্রস্তাব) ব্যবহার করে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানাতে পারে, তবে ট্রাম্পের সম্ভাব্য ভেটোকে অগ্রাহ্য করার মতো প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা তাদের নেই।
এমনও হতে পারে যে কংগ্রেস এই যুদ্ধে তহবিল বরাদ্দ বন্ধ করে দিতে পারে, তবে সশস্ত্র সংঘাত চলাকালীন মার্কিন সেনাচালনা ও অভিযানের জন্য বাজেট আটকে দেওয়ার কোনো পূর্বের নজির নেই। তাছাড়া, এই পদক্ষেপ বাস্তবায়নের মতো যথেষ্ট সংখ্যক ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতার সমর্থনও নিশ্চিত নয়।
সুতরাং, ইরান নীতির ওপর মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রভাব—স্বল্প মেয়াদে—পররাষ্ট্রনীতির বাইরের দিকের পরিধিতেই সীমিত থাকবে এবং অনেক কিছুই অপরিবর্তিত থাকবে। প্রকৃতপক্ষে, অতীতে যখনই কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছেন, তখন তারা নিজেদের রাজনৈতিক ভাবমূর্তি ও ক্ষমতা অক্ষুণ্ণ রাখতে চিরাচরিতভাবেই পররাষ্ট্রনীতির মারপ্যাঁচের দিকে বেশি ঝুঁকেছেন, যে ক্ষেত্রটিতে তাদের একক প্রভাব তুলনামূলকভাবে বেশি।
তাছাড়া, বর্তমান কংগ্রেস আগামী ৩ জানুয়ারি পর্যন্ত তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ করবে। এই প্রায় দুই মাসের অন্তর্বর্তী সময়ে প্রশাসন বহু গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি এবং অস্ত্র বিক্রয়সহ উপসাগরীয় অঞ্চলের নানা অগ্রাধিকারমূলক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে ফেলতে পারে। ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য পদক্ষেপের বিষয়ে বর্তমান আইনপ্রণেতারা ট্রাম্পের নীতির সরাসরি বিরোধিতা করবেন বলে মনে হয় না।
তাহলে উপসাগরীয় অঞ্চলের জন্য এর অর্থ কী? মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল যা-ই হোক না কেন, সম্ভাব্য এক ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ এড়াতে কাতার, মক্কা জোট, চীন এবং অন্যান্য মধ্যস্থতাকারীদের চলমান কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অবিরাম চালিয়ে যাওয়া উচিত। একই সঙ্গে, যুদ্ধ যদি শুরুই হয়ে যায়, তবে যেকোনো সম্ভাব্য আগ্রাসন প্রতিহত করতে জিসিসি (GCC) বা উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের দেশগুলোকে নিজেদের প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি সর্বোচ্চ পর্যায়ে বজায় রাখতে হবে।
লেখক: ড. আবদেল আজিজ আলুওয়াইশেগ, সহকারী মহাসচিব (রাজনৈতিক বিষয় ও আলোচনা), উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ (জিসিসি)।
সূত্র: ইন্টারনেট