সোমবার, ১ ডিসেম্বর ২০২৫
Ad for sale 100 x 870 Position (1)
Position (1)

❒ নামি-দামি স্কুলে লটারিতে ভর্তি

চাপ বাড়াচ্ছে বার্ষিক পরীক্ষায়, উদ্বেগে অভিভাবক

সাহরিয়ার রাগিব সাহরিয়ার রাগিব
প্রকাশ : রবিবার, ৩০ নভেম্বর,২০২৫, ০৩:১৮ পিএম
আপডেট : রবিবার, ৩০ নভেম্বর,২০২৫, ০৭:০৩ পিএম
চাপ বাড়াচ্ছে বার্ষিক পরীক্ষায়, উদ্বেগে অভিভাবক

❒ জিলা স্কুল যশোর ছবি: ধ্রুব নিউজ

হাতে পেন্সিল কামড়ানো টেনশন আর বার্ষিক পরীক্ষার শেষ প্রস্তুতির ক্লান্তি নিয়ে বাড়ি ফেরার কথা ছিল দ্বিতীয় শ্রেণি পড়ুয়া শিশু অরুণিমার। কিন্তু স্কুল গেটের বাইরে পা রাখতেই মা তাকে নিয়ে গেলেন কম্পিউটারের দোকানে। কারণ, বার্ষিক পরীক্ষার প্রস্তুতির বিপরীতে চলছে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির আবেদন। একদিকে পরীক্ষার ঘণ্টা, অন্য দিকে লটারির অনিশ্চয়তা। যশোর শহরের শিক্ষাঙ্গনে এখন ঠিক এই দ্বী'মুখী চাপে পিষ্ট শিশুরা। উদ্বেগে অভিভাবক ।
অধিকাংশ স্কুলে মিডল নভেম্বর থেকে বার্ষিকপরীক্ষা শুরু। একই সাথে স্বপ্নের স্কুলগুলোতে ভর্তি ফর্ম বিতরণ। এতে বার্ষিক পরীক্ষা নিয়ে শিশুদের চাপ যেমনি বাড়ছে তেমনি এই সময়সূচি এখানকার হাজারো পরিবারকে ঠেলে দিয়েছে এক তীব্র মানসিক উদ্বেগের মধ্যে।

ভর্তির প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে সম্পূর্ণ ডিজিটাল লটারির মাধ্যমে, কোনো পরীক্ষা নেওয়া হবে না। এটি কোনো স্কুলের নিজস্ব সিদ্ধান্ত নয়, বরং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (DSHE)-এর জারি করা সর্বজনীন ভর্তি নীতিমালার অংশ। সরকারি নির্দেশিকা অনুযায়ী, এই অনলাইন আবেদন ও লটারি প্রক্রিয়াটি বার্ষিক পরীক্ষার শেষ ভাগের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সাধারণত প্রতি বছর নভেম্বরের মাঝামাঝি থেকে ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত চলে। এই সময়সূচিই মূল সমস্যার সৃষ্টি করেছে।

যশোর জিলা স্কুল এবং সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের মতো সীমিত সংখ্যক নামী প্রতিষ্ঠানে মানসম্মত শিক্ষার খোঁজে অভিভাবকরা ভিড় করেন। এর পরের কাতারের স্থান পুলিশ লাইন স্কুল ও কালেক্টরেট স্কুলের। সেখানেও ভর্তি প্রতিযোগিতা হাড্ডাহাড্ডি। জাতীয় পর্যায়ে সরকারি স্কুলের ভর্তি সংক্রান্ত পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশের শীর্ষস্থানীয় সরকারি বিদ্যালয়গুলোতে প্রতি বছর আসন সংখ্যার তুলনায় ১০ থেকে ২০ গুণেরও বেশি আবেদন জমা পড়ে। যশোর শহরেও এই প্রতিযোগিতার চিত্র একইরকম তীব্র, যা লটারির অনিশ্চয়তাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানাগেছে, "সরকারি নীতিমালার ভিত্তিতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সমস্ত প্রশাসনিক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। কোনো ধরনের তদবির বা সুপারিশ যাতে প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে না পারে, সেদিকে কঠোর নজর রাখা হচ্ছে।"

পরীক্ষা না থাকলেও এই লটারি পদ্ধতি জন্ম দিয়েছে এক নতুন সামাজিক সংকটের। অভিভাবকদের কাছে এখন লটারি কেবল ভাগ্য পরীক্ষা নয়, বরং জীবনের এক বড় চ্যালেঞ্জ। যশোর শহরের সিটি কলেজ পাড়া এলাকার বাসিন্দা আফসানা বেগম বলেন, "পরীক্ষা হলে অন্তত জানতাম যোগ্যতার লড়াই, কিন্তু এখন এটা পুরোপুরি ভাগ্য! শুধু আবেদন করেই বসে আছি, আর কী করব, বলুন তো! হাজার হাজার টাকার কোচিং করানোর পরও এখন সবই যেন লটারিতেই ভাগ্যে নির্ভর করছে।"

আফসানা বেগমের মতো হাজারো অভিভাবক স্বীকার করছেন, স্বপ্নের স্কুলে ভর্তির জন্য এখন 'ভর্তির তদবির' এক অলিখিত নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। বার্ষিক পরীক্ষার ফলের চেয়ে সন্তানের লটারিতে নাম উঠবে কিনা, সেই দুশ্চিন্তা এখন তাদের কাছে মুখ্য। নানা মহলে যোগাযোগ রাখতে গিয়ে হচ্ছেন শারীরিক ও অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত।

শিক্ষাবিদ এবং শিশু মনোবিজ্ঞানীরা এই পরিস্থিতির কঠোর সমালোচনা করেছেন। তাঁদের মতে, বার্ষিক পরীক্ষার চূড়ান্ত চাপ এবং লটারির মাধ্যমে ভর্তির চরম অনিশ্চয়তা— শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। মনোবিজ্ঞানীদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, উচ্চ প্রতিযোগিতা ও অনিশ্চয়তা শিশুদের মধ্যে উদ্বেগজনিত চাপ  এবং বিষণ্নতা সৃষ্টি করতে পারে, যা পরবর্তীতে তাদের স্বাভাবিক বিকাশে বাধা দেয়।
যশোরের শিক্ষাঙ্গনে বর্তমানে যে প্রতিযোগিতা চলছে, তা প্রমাণ করে মানসম্মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের তীব্র অভাব। লটারি প্রক্রিয়ার সরলতা থাকা সত্ত্বেও, আসন সংখ্যা কম হওয়ায় সেই ভাগ্য পরীক্ষার আগে এখন তদবিরের চেষ্টা ও সামাজিক চাপের এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে।

বার্ষিক পরীক্ষার ফল হয়তো দ্রুতই জানা যাবে, কিন্তু সন্তানের স্বপ্নের স্কুলে ভর্তি লটারির ফল না জানা পর্যন্ত হাজারো অভিভাবকের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ থেকেই যাবে। প্রশ্ন হলো, শিক্ষাবর্ষের শুরুতেই এই অসুস্থ প্রতিযোগিতা কি আগামী প্রজন্মের জন্য কোনো শুভ বার্তা বহন করছে? নাকি এটি আরও একবার প্রমাণ করলো যে মানসম্মত শিক্ষা এখনও 'সাধারণের অধিকার' নয়, বরং 'ব্যাক্তি বিশেষের ভাগ্য' নির্ভর বিষয়।

ধ্রুব নিউজের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

💬 Comments

Login | Register
Ad for sale 225 x 270 Position (2)
Position (2)