Ad for sale 990 x 90 Position (1)
Position (1)
শুক্রবার, ২৯ মে ২০২৬
Ad for sale 870 x 100 Position (2)
Position (2)

আত্মশুদ্ধি ও ত্যাগের ঈদ আজ

তহীদ মনি তহীদ মনি
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ২৮ মে,২০২৬, ০৫:৩৫ এ এম
আপডেট : বৃহস্পতিবার, ২৮ মে,২০২৬, ১০:০৫ এ এম
আত্মশুদ্ধি ও ত্যাগের ঈদ আজ

ছবি: সংগৃহীত

কটি বছর ঘুরে আবারও ত্যাগ, আত্মশুদ্ধি ও মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের বার্তা নিয়ে মুসলমানদের দুয়ারে হাজির হয়েছে পবিত্র ঈদুল আজহা। আজ সারা দেশে উদযাপিত হচ্ছে মুসলিম উম্মাহর অন্যতম প্রধান এই ধর্মীয় উৎসব। দেশের শহর, গ্রাম ও পাড়া-মহল্লায় বিশেষ ঈদগাহ ও মসজিদে ঈদের জামাত আয়োজনের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা। ঈদ মোবারক!

ঈদুল আজহার মূল প্রতিপাদ্য কেবল পশু কোরবানি নয়; বরং নিজের ভেতরের অহংকার, লোভ, হিংসা ও স্বার্থপরতাকে কোরবানি করা। আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে পশু কোরবানির পাশাপাশি মনের ভেতর জমে থাকা সব ঘৃণা, অসৎ বাসনা ও ক্ষোভকেও বিসর্জন দিতে হবে। আত্মশুদ্ধির তাজ মাথায় দিয়ে শুরু করতে হবে নতুন পথচলা।

ইসলামের ইতিহাসে হজরত ইব্রাহিম (আ.) ও তাঁর পুত্র হজরত ইসমাইল (আ.)-এর আত্মত্যাগের ঘটনা মানব সভ্যতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। আল্লাহর নির্দেশ পালনে একজন পিতা তাঁর সবচেয়ে প্রিয় সন্তানকে কোরবানি করতে প্রস্তুত হয়েছিলেন, আর পুত্রও অকাতরে নিজেকে সঁপে দিয়েছিলেন স্রষ্টার সন্তুষ্টির জন্য। এই অবিস্মরণীয় আনুগত্যের মধ্য দিয়েই কোরবানির চেতনা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

মুসলিম উম্মাহর জীবনে দুটি প্রধান ধর্মীয় উৎসব—ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা। একটি আত্মসংযমের বিজয়ের আনন্দ, অন্যটি আত্মত্যাগ ও আনুগত্যের মহিমান্বিত প্রতীক। এক মাস সিয়াম সাধনার পর ঈদুল ফিতর যেমন মানুষকে আত্মশুদ্ধির বার্তা দেয়, তেমনি ঈদুল আজহা শেখায় ত্যাগ, সহমর্মিতা ও আল্লাহর প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায়:

‘শহীদের ঈদ এসেছে আজ শিরোপরি খুন-লোহিত তাজ,

আল্লার রাহে চাহে সে ভিখ :

জিয়ারার চেয়ে পিয়ারা যে আল্লার রাহে তাহারে দে,

চাহি না ফাঁকির মণিমানিক।’

প্রতি বছর জিলহজ মাসের ১০ তারিখে উদযাপিত হয় এই পবিত্র উৎসব। ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী, জিলহজ মাসের ১০, ১১ ও ১২ তারিখ—এই তিন দিনের যেকোনো দিন পশু কোরবানি করা যায়। ফলে ঈদের আমেজ থাকে পুরো তিন দিনজুড়ে।

আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে স্পষ্ট করে বলেছেন, কোরবানির পশুর রক্ত বা গোশত তাঁর কাছে পৌঁছায় না; পৌঁছায় কেবল বান্দার তাকওয়া ও আন্তরিকতা। অর্থাৎ কোরবানির প্রকৃত উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের প্রমাণ দেওয়া। কিন্তু বর্তমানের বাস্তবতা বড়ই নির্মম। আজ অনেক ক্ষেত্রেই কোরবানি তার আধ্যাত্মিক তাৎপর্য হারিয়ে লোকদেখানো প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে। কে কত বড় গরু কিনলেন, কার পশুর দাম কত—এসব নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে আড্ডার টেবিল পর্যন্ত একধরনের প্রদর্শনীর সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। অথচ ইসলাম কোরবানিকে কখনোই অহংকার বা আড়ম্বরের বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করেনি।

ইসলামে কোরবানির একটি গভীর সামাজিক তাৎপর্য রয়েছে। সামর্থ্যবান মানুষের সম্পদে দরিদ্র মানুষের হক রয়েছে। কোরবানির মাংস বণ্টনের বিধান সেই সামাজিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠারই এক অনন্য ব্যবস্থা। মাংসের তিন ভাগের এক অংশ গরিব মানুষের জন্য, এক অংশ আত্মীয়-স্বজনের জন্য এবং এক অংশ নিজের পরিবারের জন্য রাখার যে নিয়ম, তার মধ্যে নিহিত রয়েছে পারস্পরিক সহমর্মিতা ও সামাজিক সম্প্রীতির শিক্ষা। দরিদ্র মানুষের হাতে কোরবানির মাংস তুলে দেওয়া কোনো দয়া বা অনুগ্রহ নয়; বরং এটি তাদের ন্যায্য অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া।

আমাদের সমাজে আরও একটি প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে—তা হলো হারাম উপার্জনের অর্থ দিয়ে কোরবানি করা। কেউ কেউ দুর্নীতি, প্রতারণা বা অবৈধ উপার্জনের অর্থ দিয়ে বড় পশু কিনে কোরবানি দেন এবং মনে করেন এতে সমাজে তাঁদের মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু ইসলাম সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, হারাম উপার্জনে কোনো ইবাদত কবুল হয় না। অন্যদিকে, ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির ওপর কোরবানি ওয়াজিব নয়। অথচ অনেকেই সামাজিক চাপে পড়ে ধারদেনা করে কোরবানি দেন। ধর্মীয় বিধান না বুঝে কেবল সামাজিক লোকলজ্জা বা মর্যাদা রক্ষার এই মানসিকতা কোরবানির প্রকৃত চেতনাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

একসময় ঈদ ছিল আত্মীয়তার বন্ধন দৃঢ় করার অনন্য উপলক্ষ; এখন তা অনেক ক্ষেত্রে নিছক সামাজিক আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে। গ্রামে এখনো ঈদের আসল প্রাণ খুঁজে পাওয়া যায়—খেলাধুলা, মেলা, আর পাড়া-প্রতিবেশীর সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগির মধ্য দিয়ে। কিন্তু শহুরে জীবনে ঈদ অনেকটাই আবদ্ধ হয়ে গেছে ফ্ল্যাটের চার দেয়ালের কৃত্রিমতায়।

এই যান্ত্রিকতার ভিড়ে ঈদ এলেই শৈশবের স্মৃতিগুলো নতুন করে হৃদয়ে দোলা দেয়। ছোটবেলার ঈদ ছিল এক অন্য রকম নির্মল আনন্দের নাম। ঈদের কয়েক দিন আগে থেকেই বাড়িতে শুরু হতো উৎসবের আমেজ। নতুন জামা-কাপড় কেনার আনন্দ, সেটি বন্ধুদের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখার শিশুসুলভ উচ্ছ্বাস, কোরবানির পশুকে ঘাস-পানি খাওয়ানো—সবকিছু মিলিয়ে ঈদ যেন ছিল এক রঙিন স্বপ্নের জগৎ।

ছোটবেলায় বাবার হাত ধরে ঈদের নামাজ পড়তে যাওয়ার স্মৃতি আজও চোখে ভাসে। খুব ভোরে ঘুম থেকে ডেকে তোলা, গোসল করে নতুন পোশাক পরে মুরব্বিদের সঙ্গে ঈদগাহে যাওয়া—সবই আজ নস্টালজিয়া। ঈদুল ফিতরের তুলনায় ঈদুল আজহার জামাত একটু আগে শুরু হতো, কারণ নামাজ শেষেই কোরবানি দেওয়ার ব্যস্ততা থাকত। বাড়িতে সাধারণত ঈদের দুই-তিন দিন আগে গরু বা ছাগল কেনা হতো। আমরা ছোটরা দল বেঁধে সেই পশুর যত্ন নিতাম। কিন্তু কোরবানির সময় যখন পশুটিকে শুইয়ে দেওয়া হতো, তখন মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে যেত। মনে হতো, এত আদরের পশুটিকে যদি কোরবানি না করা হতো!

ঈদ শুধু দেশের মানুষের জন্যই নয়, প্রবাসীদের জন্যও এক গভীর আবেগের নাম। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কর্মসূত্রে অবস্থানরত লাখো বাংলাদেশি ঈদের এই বিশেষ দিনটিতে পরিবার-পরিজনের জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠেন। প্রবাসে থাকলে দেশের প্রতি, মাটির প্রতি টান আরও গভীরভাবে অনুভব করা যায়। প্রবাসীদের কাছে ঈদ মানেই স্মৃতি, নস্টালজিয়া আর আপনজনদের তীব্র অভাববোধ।

পরিবারের বড়দের, বিশেষ করে বাবাদের অবদান ঈদের সময় সবচেয়ে বেশি উপলব্ধি করা যায়। ছোটবেলায় যা বুঝিনি, আজ তা অনুভব করতে পারি—একটি পরিবারের কর্তা সন্তানদের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য পর্দার আড়ালে কতখানি ত্যাগ স্বীকার করেন। বাবা সত্যিই একটি পরিবারের বটবৃক্ষের মতো। নিজের সব কষ্ট আড়াল করে তিনি পরিবারের সবার জন্য আনন্দের আয়োজন করেন। সন্তান যখন নিজে পরিবার-প্রধান হয়, তখনই বাবার সেই নিঃশব্দ ত্যাগের গভীরতা সম্পূর্ণ বুঝতে পারে।

ঈদ আমাদের শেখায় পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সম্প্রীতি ও সহমর্মিতা। কিন্তু আমরা কি সত্যিই সেই শিক্ষা আমাদের জীবনে গ্রহণ করছি? যদি ঈদের এই মূল বাণী আমরা বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতে পারতাম, তবে সমাজে এত বৈষম্য, হিংসা ও বিভেদ থাকত না। ধর্মীয় উৎসবের বাহ্যিক আয়োজন আমরা জাঁকজমকভাবে পালন করছি ঠিকই, কিন্তু তার অন্তর্নিহিত শিক্ষা হৃদয়ে ধারণ করতে ব্যর্থ হচ্ছি।

আমাদের ঈদের তাৎপর্য নতুনভাবে উপলব্ধি করার সময় এসেছে। সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য, সামাজিক অস্থিরতা ও নৈতিক অবক্ষয়ের এই সন্ধিক্ষণে ঈদ হতে পারে মানবিক পুনর্জাগরণের এক মহা উপলক্ষ। ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত এই ঈদ আমাদের শেখাক মানবিকতা, সহানুভূতি ও ভ্রাতৃত্ববোধের পাঠ। ঈদ হোক আত্মশুদ্ধির, সামাজিক সম্প্রীতির এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক মানবিক বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকারের উৎসব।

ধ্রুব/টিএম

 

ধ্রুব নিউজের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

💬 Comments

Login | Register
Ad for sale 270 x 225 Position (3)
Position (3)
Ad for sale 990 x 90 Position (4)
Position (4)