ছবি: সংগৃহীত
পবিত্র ঈদুল ফিতরের দীর্ঘ ছুটিতে দেশজুড়ে জ্বালানি তেলের সংকট দেখা দিয়েছে। ব্যাংক ও ডিপো বন্ধ থাকার অজুহাতে সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় সারা দেশের পেট্রল পাম্পগুলোতে চলছে হাহাকার। একদিকে তেলের তীব্র অভাব, অন্যদিকে পাম্পগুলোতে গ্রাহকদের বিশৃঙ্খলা ও হামলার ঘটনায় চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন মালিকরা। বাংলাদেশ পেট্রল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, দ্রুত তেলের সরবরাহ এবং পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না হলে যেকোনো মুহূর্তে সারা দেশের সব পাম্প বন্ধ করে দেওয়া হবে।
যেকোনো সময় বন্ধ হয়ে যেতে পারে দেশের সমস্ত পেট্রল পাম্প। জ্বালানি ঘাটতি ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে যেকোনো সময় দেশের সমস্ত পেট্রল পাম্পগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন। রবিবার (২২ মার্চ) রাতে গণমাধ্যমে দেওয়া এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ সংগঠনটি থেকে এ দাবি করা হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সারা দেশের পেট্রল পাম্পগুলোর অবস্থা খুবই করুণ। কারণ, কোম্পানি থেকে পাওয়া দৈনিক তেল দিয়ে ক্রেতাদের চাহিদা পূরণ সম্ভব হচ্ছে না। ফলে তেল নিতে এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকছেন মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীরা। একইসঙ্গে দীর্ঘ সময় বিরামহীন দায়িত্ব পালনের অভ্যাস না থাকায় শারীরিক ও মানসিকভাবে চাপে পড়ছেন পাম্পে কর্মরতরা। সব মিলিয়ে পর্যাপ্ত তেল সরবরাহ না পাওয়ার কারণে যেকোনো সময় সারা দেশের পেট্রল পাম্পগুলো বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এর আগে, পেট্রল পাম্পে নিরাপত্তার প্রয়োজন বলে জানিয়েছিল সংগঠনটি। তবে জ্বালানি বিপণন ব্যবস্থায় নিরাপত্তার বিষয়টি সরকার ও জেলা প্রশাসন কার্যত উপেক্ষা করছে। পাম্পগুলোতে তেল বিক্রির সময় কোনো কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় বিশৃঙ্খলা বাড়ছে বলে তাদের দাবি। সংগঠনটির দাবি, ঈদের আগের দিন একটি পাম্পে সাড়ে ১০ হাজার ৫০০ লিটার পেট্রল ও একই পরিমাণ অকটেন মজুদ ছিল। তাদের আরেকটি পাম্পে ছিল প্রায় আট হাজার লিটার জ্বালানি। স্বাভাবিক হিসাবে এ মজুদ কয়েকদিন বিক্রি করার কথা থাকলেও হঠাৎ অতিরিক্ত চাপ ও বিশৃঙ্খলার কারণে অল্প সময়েই তা শেষ হয়ে যায়। এ পরিস্থিতিকে এক ধরনের লুটতরাজ বলে উল্লেখ করেছে পেট্রল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন। একেকজন দৈনিক একাধিকবার তেল নিতে আসছেন বলে অভিযোগ করে সংগঠনটি থেকে বলা হয়, প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে তেল বিক্রি করছে পাম্পগুলো। কিন্তু, অনেক মোটরসাইকেল চালক দিনে ১০ বারের মতো তেল নিয়ে বাইরে বেশি দামে বিক্রি করছেন। আবার অনেকেই আংশিক ভর্তি ট্যাংক নিয়েই বারবার তেল নিতে আসছেন। এতে প্রকৃত প্রয়োজনীয় গ্রাহকরা বঞ্চিত হচ্ছেন এবং পাম্পে বিশৃঙ্খলা তৈরি হচ্ছে। এ ছাড়া গভীর রাতে সংঘবদ্ধভাবে পাম্পে এসে মব সৃষ্টি করে পেট্রল পাম্প খুলিয়ে জোরপূর্বক তেল নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। ঠাকুরগাঁওয়ের একটি ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে বলা হয়, সেখানে জ্বালানি সরবরাহ চলাকালীন লাঠিসোঁটা নিয়ে সব শেষ করে দেওয়া হয়েছে। এমন ঘটনা সব পেট্রল পাম্প মালিকদের ভাগ্যেই ঘটতে চলেছে। এখানে ন্যূনতম নিরাপত্তা নেই। পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের দাবি, বর্তমানে জ্বালানি তেলের ঘাটতির সঙ্গে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে পেট্রল পাম্পের নিরাপত্তাবিষয়ক ইস্যুগুলো আরো বেশি সংকটাপন্ন হয়ে উঠছে। এ পরিস্থিতিতে ডিপো থেকে তেল পরিবহনের সময়ও নিরাপত্তা ঝুঁকি রয়েছে। ট্যাংকারগুলো পথে লুট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এমন অবস্থায় দ্রুত নিরাপত্তা নিশ্চিত না করলে ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়া ছাড়া কোনো পথ খোলা নেই বলে শঙ্কা প্রকাশ করেন তারা। সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ঈদের আগের দিন রাতে অনেক পেট্রল পাম্পে অ্যাম্বুলেন্সের জন্য মাত্র ২০০ লিটার অকটেনও সংরক্ষিত রাখা সম্ভব হয়নি। জোর করে পাম্প খুলে সেই জ্বালানি নিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। তাই পাম্পে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শক্তিশালী উপস্থিতি নিশ্চিত না করলে ডিপো থেকে তেল লিফটিং (সংগ্রহ) বন্ধ করা ছাড়া আর কোনো পথ খোলা থাকবে না।
এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলারস, ডিস্ট্রিবিউটরস, এজেন্টস অ্যান্ড পেট্রল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ নাজমুল হক বলেন, বেশিরভাগ পাম্পে তেল নেই। যে দু-একটি পাম্পে আছে, সেখানে স্বাভাবিকভাবেই চাপ বেড়েছে। তিনি জানান, মূল সমস্যা হচ্ছে পে-অর্ডার সংকট। ব্যাংক বন্ধ থাকায় আমরা পে-অর্ডার করতে পারছি না। পে-অর্ডার ছাড়া ডিপো থেকে তেল তোলা সম্ভব না। তাই চাইলেও পাম্পে সরবরাহ বাড়ানো যাচ্ছে না। ঈদের ছুটির পর সোমবার ডিপো খোলার কথা রয়েছে। নাজমুল হক আরও বলেন, ব্যাংক না খুললে ডিপো খুলে লাভ নেই। পে ওর্ডার ছাড়া ডিপো থেকে তেল আনা যায় না। আগে সরকারি ছুটির বন্ধে চেকের বিনিময়েও তেল নিতে পারত পাম্প মালিকরা। কিন্তু চেক নিয়ে ঝামেলার কারণে এই সুবিধা তুলে নেওয়া হয়।
সরকার গত ৬ মার্চ জ্বালানি বিক্রিতে রেশনিং চালু করলেও ১৫ মার্চ তা তুলে নেওয়া হয়। তবে বাস্তবে সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়ায় ভোগান্তি কমেনি। বরং টানা ছুটির কারণে সংকট আরও প্রকট হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সব মিলিয়ে, ঈদের ছুটিতে জ্বালানি তেলের এই সংকট সাধারণ মানুষের চলাচল ও দৈনন্দিন জীবনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। দীর্ঘ লাইন, সীমিত বিক্রি আর অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে অনেকের ঈদের আনন্দও ম্লান হয়েছে।