মাত্র একমাস! ফেব্রুয়িারির মতো ছোট মাস। ক্যালেন্ডারের পাতায় ফেব্রুয়ারি মাস এখনো শেষ হয়নি, অথচ এরই মধ্যে ১০ বার কেঁপে উঠল বাংলাদেশের মাটি। তবে কি প্রকৃতি বড় কোনো মহাদুর্যোগের আগাম সতর্কবার্তা দিচ্ছে? এ প্রশ্ন এক প্রকার যশোরের সর্বত্র, সব শ্রেণি পেশার মানুষের । বিশেষ করে শুক্রবার দুপুরের ভূমিকম্পের পর এই আতঙ্ক সবার মাঝে। যে যশোর এক সময় সবচেয়ে নিরাপদ মনে করতো যশোরবাসী। ঝড় নেই, বন্যা নেই-নেই বড় কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ অথচ এখন একটুতেতই তলিয়ে যায় শহর। ঝড় বৃষ্টিও দুর্যোগ আকারের আতঙ্ক নিয়ে আসে। আবারেএই দেশে এখন থেকে ২০-২৫ বছর আগে ভূমিকম্প তেমন কোথাও শোনা যেতো না।এখন তা নিত্য দিনের সঙ্গী হতে চলেছে। এক মাসে ১০বার!
সর্বশেষ শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে সাতক্ষীরা অঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অনুভূত হওয়া ৫.৪ মাত্রার শক্তিশালী কম্পনটি যেন সেই শঙ্কাকেই আরও ঘনীভূত করল।
এক মাসে দফায় দফায় এই ছোট-মাঝারি কম্পনগুলো কি বড় কোনো ভূমিকম্পের ফোর-শক বা সাবধানী সংকেত? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাটির নিচের এই অস্থিরতা জনপদের জন্য এক ভয়াবহ অশনিসংকেত হতে পারে। ঘনঘন এই ভূ-কম্পন কি বড় কোনো মহাদুর্যোগের আগাম সতর্কবার্তা? সাধারণ মানুষের মধ্যে এখন এই প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে।
চলতি ফেব্রুয়ারির ১ তারিখেই প্রথম ভূকম্পন অনুভূত হয় । সেদিন ঢাকাসহ আশপাশের এলাকায় মৃদু ভূমিকম্প অনুভূত হয়। রিখটার স্কেলে যার মাত্রা ছিল ৩। এর উৎপত্তিস্থল ছিল সিলেট শহর থেকে পূর্ব-দক্ষিণ-পূর্বে। এরপর ৩ ফেব্রুয়ারি রাতে পরপর দুটি ভূমিকম্প অনুভূত হয়, যেগুলোর উৎপত্তিস্থল ছিল মিয়ানমারে। ওই দুটি ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল যথাক্রমে ৫ দশমিক ৯ এবং ৫ দশমিক ২। একই দিন ভোর ৪টা ৩৬ মিনিট ভূকম্পন অনুভূত হয়। ওই ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলা, যা ঢাকা থেকে প্রায় ১৭৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত। রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৪ দশমিক ১।
পরে ৯ ফেব্রুয়ারি ভোরে এবং ১০ ফেব্রুয়ারি বিকেলে সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলায় দুটি কম্পন অনুভূত হয়। এ দুটি ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল যথাক্রমে ৩ দশমিক ৩ এবং ৪।
১৯ ফেব্রুয়ারি দুপুর ১২টা ৪৬ মিনিটে আবার সিলেট অঞ্চলে ভূকম্পন অনুভূত হয়। ওই ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলা। এর মাত্রা ছিল ৪ দশমিক ১।
২৫ ফেব্রুয়ারি রাতে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ভূকম্পন অনুভূত হয়। রিখটার স্কেলের যার মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ১। পরদিন ২৬ ফেব্রুয়ারি দুপুর ১২টা ৪ মিনিট ৫ সেকেন্ডে ভূকম্পন অনুভূত হয়। রিখটার স্কেলে ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৪ দশমিক ৬।
সর্বশেষ আজ ২৭ ফেব্রুয়ারি দুপুরে ভূকম্পন অনুভূত হয়। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রিখটার স্কেলে ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ৪। ইউরোপীয়-ভূমধ্যসাগরীয় সিসমোলজিক্যাল সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, ভূমিকম্পটির কেন্দ্র ছিল সাতক্ষীরা জেলা থেকে মাত্র ২৯ কিলোমিটার দক্ষিণ-দক্ষিণ-পূর্বে। রিখটার স্কেলে এর তীব্রতা ছিল ৫.৩। ভূমিকম্পটির গভীরতা ছিল মাটির নিচে মাত্র ৯.৮ কিলোমিটার, যা অগভীর হওয়ার কারণে কম্পন বেশ জোরালোভাবে অনুভূত হয়েছে।
শুধু তাইই নয়, আগে ভূমিকম্প হলে উৎপত্তিতস্থল পাওয়া যেতো মিয়ানমার, ভারত বা অন্য কোথাও। এখনকার ভূমিকম্পগুলোর উৎপত্তিস্থল আমাদের দেশেই! কখনো সাতক্ষীরা, কখনো কলারোয়া, গাজীপুর, সিলেট বা নিকটতম স্থানগুলোতে!
সব মিলিয়ে ফেব্রুয়ারির শুরু থেকে সর্বশেষ ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশে মোট ১০ বার ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। ঘন ঘন এই ভূমিকম্পের ঘটনায় বিশেষজ্ঞরা বড় ধরনের দুর্যোগের আশঙ্কা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
ইতোমধ্যে অনেকের কাছে নিরাপত্তার প্রশ্ন হয়ে উঠেছে ভূমিকম্পগুলো। ঘরবাড়ি নড়ছে, হেলে পড়ছে ভবন, আতঙ্ক ছড়াচ্ছে জনমনে। প্রশ্ন এর পরিণতি কী? রাষ্ট্র কি প্রস্তুত?