Ad for sale 990 x 90 Position (1)
Position (1)
সোমবার, ২ মার্চ ২০২৬
Ad for sale 870 x 100 Position (2)
Position (2)

ভোটের আগেই ‘জোট যুদ্ধ’

❒ বিএনপির বলয় ভেঙে জামায়াতের ‘মহাসমীকরণ’

সাইফুল ইসলাম সাইফুল ইসলাম
প্রকাশ : রবিবার, ২৮ ডিসেম্বর,২০২৫, ১২:২৭ পিএম
আপডেট : সোমবার, ২৯ ডিসেম্বর,২০২৫, ১০:২০ পিএম
ভোটের আগেই ‘জোট যুদ্ধ’

বিএনপি ও জামায়াত বলয়ে ভাগ হয়ে যাচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলো ছবি: সংগৃহীত

নির্বাচনী তফশিলের চূড়ান্ত মাহেন্দ্রক্ষণ ঘনিয়ে আসতেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে জোট ভাঙা-গড়ার এক জটিল মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ শুরু হয়েছে। যেখানে কয়েক মাস আগেও বিএনপি-জামায়াতকে একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ ভাবা হতো, সেখানে আজ পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। দীর্ঘদিনের রাজপথের সখ্যতা চুকিয়ে বিএনপি ও জামায়াত এখন একে অপরের প্রকাশ্য রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক প্রথা ভেঙে দলগুলো এখন পৃথক পৃথক শক্তিশালী বলয় তৈরি করছে। একদিকে বড় দলগুলোর একক আধিপত্যের প্রচেষ্টা, অন্যদিকে ছোট ও মাঝারি দলগুলোর টিকে থাকার লড়াই—সব মিলিয়ে ভোটের আগেই শুরু হয়েছে এক তীব্র ‘জোট যুদ্ধ’।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি তাদের জোটকে বড় না করার কৌশলী অবস্থান নেওয়ায় অনেক মাঝারি ও ছোট দল এখন প্রান্তিক হয়ে পড়েছে। এই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে জামায়াতে ইসলামী একটি বৃহৎ নির্বাচনী মোর্চা গড়ে তুলছে। বিএনপির দীর্ঘদিনের যুগপৎ আন্দোলনের সঙ্গী কর্নেল (অব.) অলি আহমদের এলডিপি এবং মোস্তাফিজুর রহমান ইরানের লেবার পার্টি এখন জামায়াত নেতৃত্বাধীন সমঝোতায়। এছাড়া চরমোনাই পীরের ইসলামী আন্দোলন, মামুনুল হকের বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস এবং খেলাফত মজলিস এখন জামায়াতের সাথে আসন ভাগাভাগি চূড়ান্ত করছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ভাঙাগড়ার খেলায় জামায়াত মূলত একটি ‘উইনেবল’ মহাজোট গড়ে তুলছে। বিএনপির সামনে বর্তমানে তারেক রহমান ছাড়া বড় কোনো ‘ট্রাম্প কার্ড’ নেই। কিন্তু নতুন মেরুকরণে একদিকে যেমন এলডিপি ও ইসলামী আন্দোলনের মতো শক্তিশালী ভোটব্যাংক সম্পন্ন দলগুলো এক হয়েছে, অন্যদিকে এনসিপির মতো তরুণ প্রজন্মের দলকে জোটে ভেড়াতে পেরে জামায়াত অনেকটা ‘চেঞ্চ মেকার’-এর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে।

গণঅভ্যুত্থান থেকে উঠে আসা তরুণদের দল এনসিপিতে জামায়াতের সাথে জোট করা নিয়ে এখন গৃহযুদ্ধ চলছে। কেন্দ্রীয় কমিটির ২১৪ জন সদস্যের মধ্যে ১৮৪ জন জোটের পক্ষে থাকলেও, প্রভাবশালী ৩০ জন নেতা সরাসরি এর বিরোধিতা করে আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে চিঠি দিয়েছেন। চিঠিতে তারা বলেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর জামায়াত-শিবির যে বিভাজনমূলক রাজনীতি করেছে, তাদের সাথে জোট করা হবে একটি আদর্শিক আত্মহত্যা।’

এই বিরোধের জেরে ঢাকা-৯ আসনের হেভিওয়েট প্রার্থী এবং দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিব ডা. তাসনিম জারা দল থেকে পদত্যাগ করেছেন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘যে আদর্শ নিয়ে রাজনীতিতে এসেছিলাম, জামায়াতের সাথে জোট করা সেই চেতনার সাথে সাংঘর্ষিক। আমি স্বতন্ত্র থেকেই লড়াই করব।’ এমনকি তাঁর স্বামী এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক খালেদ সাইফুল্লাহও পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। তবে এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন জোটের যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘সংস্কারের প্রশ্নে বিএনপির সাথে আমাদের মতভিন্নতা ছিল, কিন্তু জামায়াত ও অন্য দলগুলো মৌলিক সংস্কারে একমত হয়েছে। নতুন রাষ্ট্র কাঠামো গড়ার কমিটমেন্টই আমাদের জোটের ভিত্তি।’

জোটের আসন ভাগাভাগি নিয়ে বাইরের নানা তথ্যকে ‘মনগড়া’ হিসেবে অভিহিত করেছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে জানানো হয়েছে, তাদের লক্ষ্য কেবল কয়েকটি আসন পাওয়া নয়, বরং দেশের ইসলামপন্থী ও সংস্কারকামী জনগণের ভোটকে একটি ‘অভিন্ন বাক্সে’ নিয়ে আসা। দলটির শীর্ষ নেতারা এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, ‘আমাদের প্রধান লক্ষ্য হলো দেশপ্রেমিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধে বিশ্বাসী মানুষের ভোট যেন কোনোভাবেই বিভক্ত না হয়। যারা সমঝোতা নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন, তারা আমাদের বৃহত্তর লক্ষ্য বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন। আমাদের রাজনীতি এখন কেবল টিকে থাকার নয়, বরং বিজয়ের।’

জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটে আসন বণ্টন নিয়ে বিরোধ এড়াতে এক অভিনব সূত্র প্রয়োগ করা হচ্ছে। আগামীকাল পর্যন্ত বিতর্কিত আসনগুলোতে জোটের সব শরিক দলই মনোনয়ন জমা দেবে। এরপর একটি স্বাধীন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় জরিপ চালানো হবে। ২০ জানুয়ারি প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিনে জরিপে যার অবস্থান শক্তিশালী পাওয়া যাবে, জোটের অন্য প্রার্থীরা তাকে সমর্থন দিয়ে মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নেবেন। জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য একটাই—বিজয়। কে কতগুলো আসন পেল তার চেয়ে বড় কথা, কার জয়ের সম্ভাবনা বেশি। আমরা সর্বোচ্চ ছাড় দিতে প্রস্তুত।’

বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী, ইসলামী আন্দোলন (চরমোনাই) ৭৫টি আসন দাবি করলেও ৩৫-৪০টি আসনে সমঝোতা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এনসিপি পেতে পারে ৩০টি আসন, খেলাফত মজলিস (মামুনুল হক) ১৫টি এবং খেলাফত মজলিসের অন্য অংশকে ১০টি আসন দেওয়া হতে পারে। জামায়াত এককভাবে ১৭০-১৮০টি আসনে নির্বাচন করতে পারে। এছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ ঢাকা-১০ আসনে জোটের সমর্থন পেতে পারেন, তবে মাহফুজ আলমের বিষয়ে জামায়াত এখনও কঠোর অবস্থানে রয়েছে।

অপরদিকে বিএনপির জোট কৌশলটি মূলত ‘যুগপৎ আন্দোলনের শরিকদের মূল্যায়ন’ এবং ‘হেভিওয়েট নেতাদের নিজের প্রতীকে (ধানের শীষ) যুক্ত করা’। এই কৌশলের অংশ হিসেবে বিএনপি নাগরিক ঐক্য (বগুড়া-২), গণসংহতি আন্দোলন (ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬), বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি (ঢাকা-১২) এবং গণঅধিকার পরিষদসহ (পটুয়াখালী-৩) বেশ কিছু আসন শরিকদের ছেড়ে দিয়েছে।

বিএনপির একটি বড় কৌশল হলো জনপ্রিয় নেতাদের সরাসরি বিএনপিতে যোগ দেওয়ানো। এর ফলে ববি হাজ্জাজ (ঢাকা-১৩), ড. রেদওয়ান আহমেদ (কুমিল্লা-৭) এবং রাশেদ খান (ঝিনাইদহ-৪) সরাসরি ধানের শীষ নিয়ে লড়ছেন। তবে বিএনপি জোটে আসন বণ্টন নিয়ে কিছুটা টানাপোড়েন চলছে। অনেক জায়গায় স্থানীয় বিএনপি নেতারা স্বতন্ত্র হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছেন, যাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি দিয়েছে কেন্দ্র। বিএনপির মূল লক্ষ্য ৩০০ আসনের মধ্যে ২৭০টির বেশি আসনে নিজস্ব প্রার্থী রাখা।

আগামীকাল সোমবার মনোনয়ন দাখিলের শেষ দিন। মাঠের চিত্র বলছে, লড়াইটা এখন আর কেবল আওয়ামী লীগ বিহীন নির্বাচন নয়, বরং এটি হয়ে দাঁড়িয়েছে বিএনপি বলয় বনাম জামায়াত বলয়ের শক্তির পরীক্ষা। এই ‘জোট যুদ্ধ’ই বলে দিচ্ছে, ভোটের আগেই দেশে একটি অলিখিত কিন্তু উত্তপ্ত ‘রাজনৈতিক যুদ্ধ’ শুরু হয়ে গেছে।

ধ্রুব নিউজের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

💬 Comments

Login | Register
Ad for sale 270 x 225 Position (3)
Position (3)
Ad for sale 990 x 90 Position (4)
Position (4)