❒ মার্কিন ঘাঁটিতে সর্বাত্মক আক্রমণের হুঁশিয়ারি
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ছবি: রয়টার্স
কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে এক দিনে রেকর্ড সাতটি জ্বালানি তেলবাহী জাহাজে হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরান। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর থেকে এই নৌপথে এক দিনে এটিই সর্বোচ্চ সংখ্যক জাহাজে আক্রমণের ঘটনা। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র যদি বিকল্প রুট দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচলে সহযোগিতা অব্যাহত রাখে, তবে পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে সর্বাত্মক হামলা চালানো হবে বলে তীব্র হুঁশিয়ারি দিয়েছে দেশটির ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)। খবর আল জাজিরার।
আইআরজিসি-র পক্ষ থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে স্পষ্ট জানানো হয়, ওয়াশিংটন যদি হরমুজ প্রণালির অন্য অংশ দিয়ে জাহাজ পারাপারে সহায়তা চালিয়ে যায়, তবে সংঘাত আর এই নৌপথে সীমাবদ্ধ থাকবে না। তা এই অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতেও ছড়িয়ে পড়বে। সংস্থাটি একে একটি ‘গুরুতর সতর্কবার্তা’ বলে উল্লেখ করেছে।
বিবৃতিতে বিশদ বিবরণ দিয়ে বলা হয়, হামলার শিকার হওয়া জাহাজগুলোর মধ্যে চারটি ছিল তেল স্থানান্তরের কাজে নিয়োজিত। রাতের আঁধারে চালানো ওই হামলায় জাহাজগুলোতে আগুন ধরে যায়। অন্যদিকে, বাকি তিনটি জাহাজ সামুদ্রিক মাইনের আঘাতে সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। তবে এসব ঘটনায় কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি এবং ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজগুলো কোন দেশের পতাকাবাহী—তাও আনুষ্ঠানিকভাবে স্পষ্ট করা হয়নি।
তবে ইরানের এই দাবিগুলোর নিরপেক্ষ সত্যতা স্বাধীনভাবে এখনো যাচাই করা সম্ভব হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র ও দেশটির সামরিক বাহিনী ইরানের এসব দাবিকে পুরোপুরি ভিত্তিহীন ও সাজানো ঘটনা বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার নিজস্ব সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক পোস্টে দাবি করেন, ইরান মিথ্যা হামলার খবর এবং মাইনের মনগড়া কাহিনী ছড়াচ্ছে। বর্তমানে হরমুজ প্রণালি দিয়ে যুদ্ধ শুরুর পূর্ববর্তী সময়ের চেয়েও বেশি পরিমাণ জ্বালানি তেল পরিবাহিত হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন।
একই সুর মেলানো হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) পক্ষ থেকেও। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সেন্টকমের এক মুখপাত্র বলেন, ইরানের মাইন হামলার দাবিটি অসত্য। হরমুজ প্রণালি এখনো সম্পূর্ণ খোলা রয়েছে এবং প্রায় ৯৫ শতাংশ জাহাজ কোনো প্রকার বিঘ্ন ছাড়াই এটি অতিক্রম করছে। তার মতে, কঠোর মার্কিন অবরোধের মুখে পড়ে সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠনে ব্যর্থ হয়ে ইরান চূড়ান্ত হতাশা থেকেই এসব কাল্পনিক দাবি তুলছে।
উল্লেখ্য, সংঘাত শুরু হওয়ার আগে বিশ্বের মোট ব্যবহৃত জ্বালানি তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই হরমুজ প্রণালি দিয়েই পরিবাহিত হতো। দীর্ঘ দিন ধরেই কৌশলগত এই নৌপথের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রয়েছে বলে দাবি করে আসছে তেহরান। তাদের অনুমতি ছাড়া প্রণালিটি দিয়ে চলাচলের চেষ্টা করা জাহাজগুলোতে তারা নিয়মিত পদক্ষেপ নিচ্ছে। অন্যদিকে, মার্কিন বাহিনী নিরাপত্তার বহর বাড়িয়ে একের পর এক জাহাজ পারাপার করায় ক্ষুব্ধ তেহরানও তাদের আক্রমণের তীব্রতা বাড়িয়েছে।
তেহরান থেকে আল জাজিরার প্রতিনিধি মোহাম্মদ ভ্যাল জানিয়েছেন, প্রতিদিন সেখানে সংঘাতের মাত্রা ও ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজের সংখ্যা বাড়ছে। ইরানের ভাষ্য— বর্তমান পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত তারা এই কৌশল অব্যাহত রাখবে এবং নৌপথটির ওপর তাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। তেহরানে এখন মার্কিন সামরিক বাহিনীর আরও বড় ধরনের হামলার আশঙ্কা করা হচ্ছে। নভেম্বরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগেই মার্কিন বাহিনী বড় ধরনের অভিযান চালাতে পারে বলে তেহরান মনে করছে। তবে আইআরজিসি প্রধান দাবি করেছেন, যেকোনো পরিস্থিতিতে সমপর্যায়ের দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধ লড়ার মতো পর্যাপ্ত আধুনিক অস্ত্র ও সামরিক প্রস্তুতি ইরানের রয়েছে।
অন্যদিকে ওয়াশিংটনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও এই সংঘাতের রেশ চরম আকার ধারণ করেছে। হোয়াইট হাউজ থেকে আল জাজিরার সাংবাদিক কিম্বারলি হ্যালকেট জানান, আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরানে সংঘাত জিইয়ে রাখা রিপাবলিকান পার্টির জন্য নেতিবাচক হয়ে দাঁড়াচ্ছে। জনমত জরিপগুলোতেও মার্কিন নাগরিকদের তীব্র অসন্তোষের চিত্র উঠে এসেছে। সংঘাতের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম হু-হু করে বাড়ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ মার্কিনদের জীবনযাত্রার ব্যয়ে। যুদ্ধের অর্থনৈতিক চাপ থেকে দ্রুত স্বস্তি চান সাধারণ আমেরিকানরা। ফলে কেবল বিরোধী দল ডেমোক্র্যাটদের থেকেই নয়, খোদ নিজ দল রিপাবলিকান পার্টির ভেতর থেকেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ওপর এই সংঘাত বন্ধ করার তীব্র চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।