ক্রীড়া ডেস্ক
ছড়িয়ে পড়া দাবানল ছবি: রয়টার্স
কানাডায় ছড়িয়ে পড়া ভয়াবহ দাবানলের বিষাক্ত ধোঁয়া এবার সীমান্ত পেরিয়ে ঢেকে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ আকাশ। প্রতিবেশী দেশের এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের জেরে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। পরিস্থিতি মোকাবিলায় কানাডার বিরুদ্ধে নতুন করে শুল্ক আরোপের কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। তবে কানাডার দাবি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কোনো সীমানা মানে না; তাই একে অপরের দিকে আঙুল না তুলে এই সংকট মোকাবিলায় যৌথভাবে কাজ করা প্রয়োজন।
ট্রাম্প ও মার্কিন আইনপ্রণেতাদের ক্ষোভ
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক বার্তায় ডোনাল্ড ট্রাম্প কানাডার বিরুদ্ধে 'ইচ্ছাকৃত অবহেলার' অভিযোগ তুলেছেন। তার দাবি, কানাডার অব্যবস্থাপনার কারণেই যুক্তরাষ্ট্র আজ অপ্রয়োজনীয়ভাবে দূষিত ও অস্বাস্থ্যকর বাতাসের মারাত্মক হুমকির মুখে। বিষয়টি নিয়ে তিনি কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির সঙ্গে সরাসরি কথা বলে তাদের বন ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে জবাবদিহি চাইবেন বলেও জানিয়েছেন।
ট্রাম্পের সুরেই সুর মিলিয়েছেন বেশ কয়েকজন মার্কিন রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা। কানাডার শুধু 'দুঃখ প্রকাশ' করাকে অপর্যাপ্ত আখ্যা দিয়ে তারা বনভূমি পরিষ্কার রাখা, দাহ্য পদার্থ হ্রাস এবং অগ্নিসংযোগের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের মতে, কানাডার নিষ্ক্রিয়তার সরাসরি মাশুল গুনছে যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ জনগণ।
কানাডার কড়া জবাব ও বর্তমান পরিস্থিতি
যুক্তরাষ্ট্রের এমন সমালোচনার কড়া জবাব দিয়েছেন কানাডার অন্টারিও প্রদেশের প্রিমিয়ার ডাগ ফোর্ড। মার্কিন আইনপ্রণেতাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, "অভিযোগের আঙুল না তুলে বরং সহায়তা পাঠান, ঠিক যেমনটা আমরা ক্যালিফোর্নিয়ার দাবানল বা নর্থ ক্যারোলিনার ঘূর্ণিঝড়ের সময় আপনাদের জন্য করেছিলাম।" তিনি জানান, মিশিগান ও ম্যাসাচুসেটসের মতো কয়েকটি মার্কিন অঙ্গরাজ্য ইতোমধ্যে দমকলকর্মী ও পানিবাহী বিমান দিয়ে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে।
কানাডিয়ান ওয়াইল্ডল্যান্ড ফায়ার ইনফরমেশন সিস্টেমের সর্বশেষ তথ্যমতে:
• শুক্রবার পর্যন্ত পুরো কানাডাজুড়ে ৮৮৮টি দাবানল সক্রিয় ছিল, যার বেশিরভাগই নিয়ন্ত্রণের বাইরে।
• শুধুমাত্র অন্টারিও প্রদেশেই জ্বলছে ১৯০টির বেশি আগুন।
• পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অন্টারিওতে কাজ করছে ১৫০টির বেশি অগ্নিনির্বাপণ দল এবং ৮০টির বেশি পানিবাহী বিমান ও হেলিকপ্টার। ২০১৮ সাল থেকে এ খাতে প্রদেশটি ১০০ কোটি কানাডীয় ডলারেরও বেশি ব্যয় করেছে।
দাবানলের ধোঁয়া নিউইয়র্ক, পেনসিলভানিয়া, ওহাইও, মিশিগান এবং মিনেসোটার মতো অঙ্গরাজ্যগুলোর জনজীবনকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বায়ুমান পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান আইকিউএয়ারের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার ডেট্রয়েট ছিল বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহর। এর ঠিক পরেই অবস্থানে ছিল শিকাগো, ওয়াশিংটন ডিসি এবং নিউইয়র্ক। ঘন ধোঁয়ার কারণে নিউইয়র্কের স্ট্যাচু অব লিবার্টি ও এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিং এবং ওয়াশিংটন ডিসির বিভিন্ন স্মৃতিস্তম্ভের মতো আইকনিক স্থাপনাগুলোও ঢাকা পড়েছে। কর্তৃপক্ষ নাগরিকদের ঘরের ভেতর থাকার পরামর্শ দিচ্ছে এবং বিভিন্ন স্থানে বিনামূল্যে মাস্ক বিতরণ করা হচ্ছে। খারাপ বায়ুমানের কারণে অনেক স্থানে গ্রীষ্মকালীন উৎসব ও কনসার্ট বাতিল করা হয়েছে, সৈকতগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং বিমান চলাচলেও বিঘ্ন ঘটছে।
কানাডায় ক্ষয়ক্ষতি ও চরম বিপর্যয়
চলমান এই দাবানলে কানাডায় ইতোমধ্যে প্রায় ৩০ লাখ হেক্টর জমি ভস্মীভূত হয়েছে। উত্তর অন্টারিওর অন্তত ১০টি জনপদ সম্পূর্ণ খালি করে বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। নামাইগুসিসাগাগুন ফার্স্ট নেশনস সম্প্রদায়ের প্রধান ম্যাথিউ হপের মতে, আগুন এতো দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে যে বাসিন্দাদের ছোট নৌকায় করে জীবন বাঁচাতে হয়। প্রাণহানি না ঘটলেও পুরো এলাকাটি প্রায় ছাই হয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন আরেক প্রধান হেলেন পাওভোলা।
জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সমস্যার সমাধান মোটেও সহজ নয় এবং এর জন্য এককভাবে কানাডাকে দায়ী করা অযৌক্তিক। টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ড. প্যাট্রিক জেমস এবং ওয়াটারলু বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. আনাবেলা বোনাদা একমত যে, বাতাস বা আবহাওয়া কোনো আন্তর্জাতিক সীমানা মেনে চলে না।
দীর্ঘদিনের শুষ্ক ও তীব্র গরম আবহাওয়া এবং বজ্রপাতের ফলেই কানাডার বিশাল ও দুর্গম বনাঞ্চলে এই আগুনের সূত্রপাত হয়েছে, যা দ্রুত শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণ করা বেশ কঠিন। বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন একটি বৈশ্বিক সংকট, আর তাই কাউকে এককভাবে দায়ী না করে সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই এর মোকাবিলা করা উচিত।
সূত্র: রয়টার্স