সংস্কৃতি ডেস্ক
অস্কারজয়ী বর্ষীয়ান অভিনেতা অ্যান্থনি হপকিন্স ছবি: সংগৃহীত
স্বপ্নপূরণের যে কোনো বয়স নেই, তারই এক জীবন্ত প্রমাণ হয়ে উঠলেন অস্কারজয়ী বর্ষীয়ান অভিনেতা অ্যান্থনি হপকিন্স। ৮৮ বছর বয়সে এসে এই প্রথম নিজের সুর করা সুরের প্রথম রেকর্ড প্রকাশ করে সঙ্গীতপ্রেমীদের চমকে দিয়েছেন তিনি।
'দ্য সাইলেন্স অব দ্য ল্যাম্বস' চলচ্চিত্রে ক্লাসিক্যাল মিউজিকপ্রেমী নরখাদক চরিত্র 'হ্যানিবাল লেকটার' হিসেবে বিশ্বজুড়ে দারুণ খ্যাতি পাওয়া হপকিন্স গত শুক্রবার (১০ জুলাই) তার সুর করা অর্কেস্ট্রাল একক ট্র্যাক 'ব্র্যাকেন রোড' প্রকাশের মাধ্যমে সঙ্গীত জগতে আত্মপ্রকাশ করেছেন।
১৯৪০-এর দশকে দক্ষিণ ওয়েলসের মারগামে নিজের শৈশব কাটানোর স্মৃতি এবং চারপাশের খামারবাড়ি, তৃণভূমি ও পাহাড়ের দৃশ্য দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে এই চমৎকার ও নস্টালজিক সুরটি তৈরি করেছেন তিনি। সুরের গভীরে মৃদু ব্লুজ সঙ্গীতের প্রভাব স্পষ্ট।
পিয়ানোর এই সুরটি মূলত তৈরি হয়েছিল ১৯৬৩ সালে। সে সময় হপকিন্স 'লিভারপুল প্লেহাউস'-এ অভিনয়ের ফাঁকে রিহার্সাল রুমের একটি পিয়ানোতে কাজের ব্যাকস্টেজে এই সুরটি গুনগুন করে তুলতেন। প্রখ্যাত গ্র্যামি পুরস্কারজয়ী কন্ডাক্টর গুস্তাভো দুদামেলের পরিচালনায় 'ফিলহারমোনিয়া অর্কেস্ট্রা'র চমৎকার বাদনে এই সুরটি আরও জীবন্ত রূপ পেয়েছে। রোমান্টিক ও মৃদু ক্ল্যারিনেটের সমন্বয়ে তৈরি এই অর্কেস্ট্রেশনটি মূলত বিখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ এলগারের 'ফার্স্ট সিম্ফনি'র প্রতি এক ধরনের বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।
হপকিন্সের সুর করা ১২টি ক্লাসিক্যাল ট্র্যাক নিয়ে আগামী মাসে মুক্তি পেতে যাচ্ছে তাঁর পূর্ণাঙ্গ অ্যালবাম 'লাইফ ইজ আ ড্রিম'। এটি বিশ্বজুড়ে বিতরণ করছে বিখ্যাত রেকর্ড লেবেল 'ডেক্কা ক্লাসিকস'। এর মাধ্যমেই হপকিন্স তাঁর দীর্ঘ জীবনে প্রথমবার কোনো রেকর্ড লেবেলের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হলেন।
পর্দায় অভিনয় শুরু করার প্রায় ৭০ বছর পর এবং দুটি অস্কার, চারটি বাফটা ও অসংখ্য সম্মানজনক পুরস্কার পাওয়ার পর হপকিন্স স্বীকার করেছেন যে, আসলে সঙ্গীতই ছিল তাঁর জীবনের 'প্রথম প্রেম'।
এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, 'আমি আমার পুরো জীবন জুড়েই সঙ্গীত রচনা করে আসছি। এর মধ্যে বেশ কিছু সুর কয়েক দশক ধরে আমার মনে রয়ে গেছে এবং আমি বারবার সেগুলোর কাছেই ফিরে আসি।'
হপকিন্স জানান, 'ব্র্যাকেন রোড' ট্র্যাকটির ব্লুজ ও অলস সুরটি মূলত হ্যারি জেমস অর্কেস্ট্রা এবং জ্যাকি গ্লিসনের ধীর গতির ব্যালাড সুর থেকে অনুপ্রাণিত। অ্যালবামটিতে গত ছয় দশক ধরে হপকিন্সের সুর করা মৌলিক সুরগুলো স্থান পাবে—যার মধ্যে রয়েছে 'মাই ফাদারল্যান্ড' নামের একটি ট্র্যাক, যা ওয়েলসে তার অতি সাধারণ ও দরিদ্র পরিবারে বড় হওয়ার দিনগুলোর প্রতি এক বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।
হপকিন্স আবেগপূর্ণভাবে বলেন, 'আমি আমার রুটি বিক্রেতা বাবার সন্তান।' ডেক্কার মতো বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডের সঙ্গে যুক্ত হতে পেরে নিজের জীবন ধন্য হয়েছে বলেও মনে করেন তিনি।
ডেক্কার প্রেসিডেন্ট লরা মঙ্কস বলেন, হপকিন্সের সঙ্গে এই অ্যালবামে কাজ করতে পারা এক বিশাল সম্মানের বিষয়। লন্ডনের রেকর্ডিং সেশনে গুস্তাভো দুদামেল এবং ফিলহারমোনিয়া অর্কেস্ট্রার মাধ্যমে তার চমৎকার সুরগুলোকে প্রাণবন্ত হয়ে উঠতে শোনা এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা ছিল বলেও জানান তিনি।
হপকিন্স ১৯৫৭ সালে রয়েল ওয়েলশ কলেজ অব মিউজিক অ্যান্ড ড্রামা থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন। এরপর রয়েল একাডেমি অব ড্রামাটিক আর্ট-এ ভর্তি হন। পরবর্তীতে কিংবদন্তি অভিনেতা স্যার লরেন্স অলিভিয়ারের নজরে আসেন তিনি, যিনি হপকিন্সকে রয়্যাল ন্যাশনাল থিয়েটারে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন।
বিগত সাত দশকে হপকিন্স থিয়েটার ও চলচ্চিত্রে অসাধারণ অভিনয় করেছেন। তার উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে—'দ্য লায়ন ইন উইন্টার', 'দ্য গ্রেট ইনিমিটেবল মিস্টার ডিকেন্স', 'ওয়ার অ্যান্ড পিস' এবং ১৯৮১ সালের ছবি 'দ্য বাঙ্কার'—যেটিতে অ্যাডলফ হিটলারের চরিত্রে দুর্দান্ত অভিনয়ের জন্য তিনি মর্যাদাপূর্ণ এমি পুরস্কার পেয়েছিলেন।
অবশেষে ১৯৯২ সালে 'দ্য সাইলেন্স অব দ্য ল্যাম্বস' চলচ্চিত্রে হ্যানিবাল লেকটারের চরিত্রে অভিনয় করে তিনি তাঁর ক্যারিয়ারের প্রথম অস্কার (একাডেমি অ্যাওয়ার্ড) লাভ করেন। এর ৯ বছর পর সিক্যুয়েল 'হ্যানিবাল' ছবিতেও তিনি একই চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। পরবর্তীতে আরও চারবার অস্কারের মনোনয়ন পাওয়ার পর ২০২১ সালে 'দ্য ফাদার' চলচ্চিত্রে ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত এক বৃদ্ধের চরিত্রে অনবদ্য অভিনয়ের জন্য ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় অস্কার জিতেন তিনি।
গত বছর হপকিন্স তার জীবনের প্রথম স্মৃতিকথা প্রকাশ করেন। বইটিতে তার পোর্ট ট্যালবটের শৈশব, মদ্যপানের বিরুদ্ধে দীর্ঘ লড়াই এবং ১৯৯৬ সালের 'নিক্সন' সিনেমার শুটিংয়ে সহ-অভিনেতা পল সরভিনোর সঙ্গে ঘটে যাওয়া পর্দার পেছনের নানা গল্প ফুটিয়ে তুলেছেন তিনি।