এম জামান
বীর নারায়ণপুর ও শুর্শনাদাহ গ্রামের মাঝ দিয়ে যাওয়া সরকারি রাস্তার প্রায় এক কিলোমিটার অংশ দখল করে চলছে চাষাবাদ ছবি: এম জামান
যশোর সদর উপজেলার লেবুতলা ইউনিয়নের বীর নারায়ণপুর ও শুর্শনাদাহ গ্রামের মাঝ দিয়ে যাওয়া সরকারি রাস্তার প্রায় এক কিলোমিটার অংশ দখল করে চলছে চাষাবাদ। কোথাও কলাবাগান, কোথাও আবার বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ করে রাস্তার অস্তিত্বই প্রায় বিলীন করে দেওয়া হয়েছে।
ফলে কাগজে-কলমে সরকারি রাস্তা থাকলেও বাস্তবে সেটি ব্যবহার করতে পারছেন না স্থানীয়রা।
এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন বীর নারায়ণপুর, শুর্শনাদাহ, লেবুতলা ও ফুলবাড়ী গ্রামের হাজারো মানুষ। বিশেষ করে শত শত কৃষক ও কোমলমতি শিক্ষার্থীদের প্রতিদিনই পোহাতে হচ্ছে ভোগান্তি। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী একটি মহল দীর্ঘদিন ধরে সরকারি রাস্তার জায়গা দখল করে চাষাবাদ করছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বীর নারায়ণপুর ঈদগাহ থেকে শুরু হয়ে রাস্তাটি লেবুতলা, বীর নারায়ণপুর ও শুর্শনাদাহ গ্রামের মাঠের মধ্য দিয়ে যশোর উপশহর-তৈলকূপ সড়কের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। প্রায় দুই কিলোমিটার দীর্ঘ এ সড়কের প্রস্থ ৩০ থেকে ৪০ ফুট। সড়কের দুই প্রান্তে চলাচলের ব্যবস্থা থাকলেও মাঝের প্রায় এক কিলোমিটার অংশ দখল হয়ে যাওয়ায় সেখানে এখন আর চলাচলের কোনো সুযোগ নেই।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বীর নারায়ণপুর ঈদগাহ থেকে সড়কের একটি অংশে ২০১৮ সালে কাবিখা উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ১৪০ মিটার ইটের সলিং করা হয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ইউডিএফ উন্নয়ন সহায়তার আওতায় আরও ৮০ মিটার এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কাবিখা উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ১৭০ মিটার সলিং নির্মাণ করা হয়েছে। একই অর্থবছরে উন্নয়ন সহায়তা প্রকল্পের আওতায় আরও ৮০ মিটার সলিং করা হয়।
সব মিলিয়ে প্রায় ৫০০ মিটার রাস্তা সলিং করা হলেও দখল থাকা অংশে উন্নয়নকাজ করা সম্ভব হচ্ছে না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। রাস্তার জায়গা দখল করে কোথাও কলাগাছ, কোথাও সবজির ক্ষেত গড়ে তোলা হয়েছে।
আধা কিলোমিটারের পথ যেতে হয় ৫-৭ কিলোমিটার
স্থানীয়রা জানান, রাস্তা দখল হয়ে যাওয়ায় মাত্র আধা কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করতে তাদের ৫ থেকে ৭ কিলোমিটার ঘুরে বিকল্প রাস্তা ব্যবহার করতে হয়। এতে সময় ও অর্থের পাশাপাশি বাড়ছে মানুষের শ্রমও।
রাস্তা না থাকায় সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছে শিক্ষার্থীরা। বীর নারায়ণপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কাছেই হলেও রাস্তা দখল হয়ে যাওয়ায় কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ঘুরপথে বিদ্যালয়ে যেতে হচ্ছে। এছাড়া বীর নারায়ণপুর, শুর্শনাদাহ ও ফুলবাড়ী গ্রামের ভোটকেন্দ্রও ওই বিদ্যালয়ে হওয়ায় নির্বাচনের সময় ভোটারদের কয়েক কিলোমিটার অতিরিক্ত পথ পাড়ি দিতে হয়।
সড়কের দুই পাশে রয়েছে বিশাল কৃষিজমি। স্থানীয়দের হিসাবে, প্রায় ৫০০ বিঘা জমিতে বছরজুড়ে বিভিন্ন ধরনের সবজি এবং আরও ৫০০ থেকে ৭০০ বিঘা জমিতে ধান চাষ হয়। কিন্তু রাস্তা না থাকায় উৎপাদিত ফসল মাথায় করে প্রায় দেড় কিলোমিটার পর্যন্ত বহন করতে হয় কৃষকদের।
এতে কৃষিপণ্য পরিবহনে বাড়তি খরচ হচ্ছে। সময়মতো ফসল বাজারজাত করতে না পারায় অনেক সময় কৃষকদের আর্থিক ক্ষতির মুখেও পড়তে হচ্ছে।
ভূমি অফিসের নথিপত্রে দেখা যায়, সিএস, এসএ ও আরএস রেকর্ডের ১ নম্বর খতিয়ান এবং সংশ্লিষ্ট ম্যাপে জায়গাটি সরকারি চলাচলের রাস্তা হিসেবে উল্লেখ রয়েছে। এরপরও দীর্ঘদিন ধরে রাস্তার একটি বড় অংশ দখল করে চাষাবাদ করছে।
শুর্শনাদাহ গ্রামের রেজাউল করিম বলেন, “আমার জমির মাথা দিয়েই এ রাস্তা চলে গেছে। আমিও জায়গাটি দখল করে চাষ করি। তবে আমি চাই রাস্তা হয়ে যাক। রাস্তা হলে আমাদের সবারই সুবিধা হবে।”
বীর নারায়ণপুর গ্রামের আব্দুল মান্নান বলেন, “রাস্তাটি আমাদের জন্য খুবই প্রয়োজন। রাস্তা না থাকায় আমরা সহজে মাঠে যেতে পারি না।”
স্থানীয় শেখসাদী বলেন, “কাগজে-কলমে ও ম্যাপে রাস্তা থাকলেও বাস্তবে এর অস্তিত্ব নেই। এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা। রাস্তার দুই পাশে কয়েকশ বিঘা জমিতে সবজি ও ধান চাষ হয়। রাস্তা হলে কৃষকরা সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবেন।”
শুর্শনাদাহ গ্রামের আশরাফুল ইসলাম বলেন, “আমাদের মাঠের মধ্য দিয়ে বহুদিনের একটি রাস্তা রয়েছে। রাস্তা দখল হয়ে যাওয়ায় আমরা খুব বিপাকে আছি।”
একই গ্রামের ছবুর হোসেন বলেন, “বীর নারায়ণপুর ও শুর্শনাদাহ পাশাপাশি গ্রাম। দুই গ্রামের মাঝ দিয়ে রাস্তাটি চলে গেছে। রাস্তা দখল হয়ে যাওয়ায় আমাদের ৫ থেকে ৭ কিলোমিটার ঘুরে চলাচল করতে হয়। ছেলেমেয়েদেরও অনেক কষ্ট করে দূরের পথ দিয়ে স্কুলে যেতে হয়। রাস্তা দখলমুক্ত হলে কাছের স্কুলে সহজেই যেতে পারবে তারা।”
যশোর সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার শাহরিয়ার হক বলেন, “ভূমি অফিসের মাধ্যমে জানতে পেরেছি, জমিটি খাস খতিয়ানভুক্ত। ওই জমিতে যারা অবস্থান করছেন, তাদের সরিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। রাস্তার কিছু অংশে ইতিমধ্যে কাজ হয়েছে। এর সঙ্গে সমন্বয় করে বাকি জমি জনস্বার্থে সরকারি নিয়মনীতি মেনে কীভাবে ব্যবহার করা যায়, সে বিষয়ে চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। বিধি মোতাবেক দ্রুত দখলমুক্ত করে জায়গাটি জনস্বার্থে ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হবে।”
যশোরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান বলেন, “সরকারি কোনো রাস্তা অবৈধভাবে দখল করে রাখার সুযোগ নেই। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে। সরকারি জায়গা দখল করে রাখা হয়ে থাকলে অবশ্যই উচ্ছেদ করা হবে। রাস্তা রাস্তার মতোই থাকবে। এ বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”