Ad for sale 990 x 90 Position (1)
Position (1)
বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬
Ad for sale 870 x 100 Position (2)
Position (2)

১৫ বছরের প্রবাসজীবন শেষে বাক্সবন্দী হয়ে ফিরলেন মালয়েশিয়া প্রবাসি সাগর

নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর,২০২৬, ১১:৫০ এ এম
১৫ বছরের প্রবাসজীবন শেষে বাক্সবন্দী হয়ে ফিরলেন মালয়েশিয়া প্রবাসি সাগর

সাগরের মরদেহ বাড়িতে আনার পর কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন তাঁর স্বজনেরা ছবি: ধ্রুব নিউজ

সংসারের অভাব ঘোচাতে নিজের পড়াশোনা ও স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমিয়েছিলেন সাগর হোসাইন (৩৮)। পরিবারের বড় ছেলে হিসেবে কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন বাবা-মা ও ছোট দুই ভাইয়ের দায়িত্ব। স্ত্রী-সন্তানদের মুখে হাসি ফোটাতে দীর্ঘদিন প্রবাসে কাটিয়েছেন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়। পরিবারের কাছে তিনি ছিলেন উপার্জনের ভরসা। সেই মানুষটিই দীর্ঘ প্রবাসজীবন শেষে দেশে ফিরলেন কফিনবন্দী হয়ে।

সাগরের নিথর দেহ বাড়িতে পৌঁছানোর পর কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজনেরা। বাবার মুখের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকে তিন বছরের ছেলে তাসকিন হাসান ও আট বছরের মেয়ে রাইসা। তাদের বোঝার বয়স হয়নি—যে বাবা তাদের ভবিষ্যৎ গড়তে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন, সেই বাবা আর কখনো ফিরে আসবেন না।

সাগর যশোর সদর উপজেলার দেয়াড়া ইউনিয়নের সিলিমপুর গ্রামের বাসিন্দা। গত শুক্রবার মালয়েশিয়ায় কর্মরত অবস্থায় হঠাৎ বুকে ব্যথা অনুভব করেন তিনি। পরে অ্যাম্বুলেন্স ডাকা হলেও সেটি পৌঁছানোর আগেই ঘটনাস্থলে তাঁর মৃত্যু হয় বলে জানিয়েছেন স্বজনেরা।

পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০০৭ সালে উচ্চমাধ্যমিক পাসের পর জীবিকার তাগিদে মালয়েশিয়ায় যান সাগর। সেখানে নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি বিভিন্ন নির্মাণকাজের ঠিকাদারিও করতেন। দীর্ঘদিন প্রবাসে থাকার পর অসুস্থতা ও পরিবারের কথা ভেবে দেশে ফিরে আসেন। প্রায় পাঁচ বছর দেশে থাকার পর পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতার আশায় ২০২৩ সালে আবারও মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমান। কিন্তু এবার ফিরলো তাঁর নিথর দেহে।

গত বুধবার রাত ১০টার দিকে সাগরের মরদেহ দেশে পৌঁছায়। স্বজনেরা জানান, মরদেহ দেশে আনতে তাঁদের প্রায় এক লাখ ৮০ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। প্রিয়জনের মরদেহ দেশে ফেরানোর পুরো খরচই বহন করতে হয়েছে পরিবারকে।

সাগরের ভাই শাহরিয়ার বলেন, মালয়েশিয়ায় একটি নির্মাণকাজে ব্যস্ত থাকার সময় তাঁর বুকে ব্যথা শুরু হয়। কাজের জায়গার মালিক অ্যাম্বুলেন্স ডাকেন। কিন্তু অ্যাম্বুলেন্স পৌঁছানোর আগেই সাগর মারা যান। গত শুক্রবার তিনি মারা যান, আর বুধবার তাঁর মরদেহ দেশে পৌঁছায়।

সাগরের বাবা আব্দুল মালেক মারা গেছেন তিন বছর আগে। বাবার মৃত্যুর পর পরিবারের বড় ছেলে হিসেবে সংসারের দায়িত্ব আরও বেশি করে সামলাতে হয়েছে তাঁকে। ছোট দুই ভাই, স্ত্রী ও সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে বারবার প্রবাসে ফিরেছেন তিনি।

সাগরের বাল্যবন্ধু অ্যাডভোকেট বিল্লাল হোসেন বলেন, উচ্চমাধ্যমিক পাসের পরই সাগর মালয়েশিয়ায় চলে যান। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন হাসিখুশি, ভদ্র ও পরোপকারী। কারও সঙ্গে ঝগড়া-বিবাদে জড়াতেন না। সবার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করতেন এবং মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করতেন।

বন্ধুত্বের স্মৃতিচারণ করে বিল্লাল হোসেন বলেন, তাঁরাও একসঙ্গে মালয়েশিয়ায় গিয়েছিলেন। সাগর কুয়ালালামপুরে থাকতেন, আর তিনি থাকতেন পেনাংয়ে। সাগর পেনাংয়ে এলে তাঁরা একসঙ্গে সময় কাটাতেন। কাজের পাশাপাশি পরিবারের প্রতি সাগরের দায়িত্ববোধ ছিল প্রবল। পরিবারের সচ্ছলতা নিশ্চিত করতেই তিনি এত বছর প্রবাসে কাটিয়েছেন।

একই স্কুলে পড়াশোনা ও একই এলাকায় বেড়ে ওঠা সাগরকে হারিয়ে শোকাহত প্রতিবেশী ও এলাকাবাসী। প্রতিবেশী সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ছোটবেলা থেকেই সাগরকে তাঁরা হাসিখুশি ও সদালাপী মানুষ হিসেবে চিনতেন। এলাকার মানুষের সঙ্গে তাঁর কোনো বিরোধ ছিল বলে তাঁর জানা নেই। সাগরের মৃত্যুতে শুধু পরিবার নয়, পুরো ইউনিয়নের মানুষ শোকাহত।

প্রবাসীদের অবদানের কথা তুলে ধরে সাজ্জাদ হোসেন বলেন, সাগরের মতো প্রবাসীরা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। অথচ মৃত্যুর পর তাঁর মরদেহ দেশে আনতে পরিবারকে নিজস্ব অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে প্রবাসীদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকারকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

সাগরের কলেজশিক্ষক আমিনুর রহমান মধু জানান, সাগর ২০০৫ সালে আম্বালাদ কলেজের বাণিজ্য বিভাগে ভর্তি হয়েছিলেন। শিক্ষার্থী হিসেবে তিনি ছিলেন হাসিখুশি ও প্রাণবন্ত। পড়াশোনা শেষ করে জীবিকার প্রয়োজনে মালয়েশিয়ায় চলে যান। পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতির জন্যই তাঁর এই প্রবাসজীবন বেছে নেওয়া।

শিক্ষক বলেন, মালয়েশিয়ায় যাওয়ার আগে সাগরের সঙ্গে তাঁর দেখা ও কথা হয়েছিল। তখন তিনি সাগরকে আর বিদেশে যেতে নিষেধ করেছিলেন। কিন্তু পরিবারের আর্থিক অবস্থার আরও উন্নতি করার আশায় সাগর বলেছিলেন, আরও কিছুদিন কাজ করতে চান। তাঁর আশা ছিল, কিছুদিন পর পরিবারকে আরও সুন্দর ও সচ্ছল অবস্থানে নিয়ে যেতে পারবেন।

কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে সাগরকে দাফন করা হয়।

সংসারের অভাব ঘোচাতে নিজের স্বপ্নকে পেছনে ফেলে যিনি বছরের পর বছর প্রবাসে পরিশ্রম করেছেন, তাঁর এমন বিদায় মেনে নিতে পারছেন না স্বজনেরা। সাগর রেখে গেছেন স্ত্রী, দুই অবুঝ সন্তান, স্বজনদের বুকভরা হাহাকার আর পূরণ না হওয়া একগুচ্ছ স্বপ্ন।

ধ্রুব নিউজের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

সম্পর্কিত

💬 Comments

Login | Register
Ad for sale 270 x 225 Position (3)
Position (3)
Ad for sale 990 x 90 Position (4)
Position (4)