ইসলামের অন্যতম প্রধান আর্থিক ও আত্মিক ইবাদত হলো পবিত্র ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ। জিলহজ মাসের ১০ তারিখ থেকে পরবর্তী তিন দিন পর্যন্ত সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে মুসলমানরা পশু কোরবানি দিয়ে থাকেন। ইসলামি শরিয়তের বিধান অনুযায়ী, ঈদুল আজহার দিনগুলোতে মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর পর যার কাছে নির্দিষ্ট পরিমাণ বা নিসাব পরিমাণ সম্পদ উদ্বৃত্ত থাকবে, তার ওপর কোরবানি করা ওয়াজিব। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ আব্দুর রশীদ এ প্রসঙ্গে জানান, যে পরিমাণ সম্পদ থাকলে কোনো ব্যক্তির ওপর জাকাত দেওয়া ফরজ হয়, ঠিক একই ধরনের সম্পদ জিলহজ মাসের ওই দিনগুলোতে থাকলে তার ওপর কোরবানি দেওয়া ওয়াজিব হবে। শরিয়তের নিয়ম অনুযায়ী, সাড়ে সাত ভরি সোনা অথবা সাড়ে ৫২ ভরি রুপা কিংবা এর সমমূল্যের নগদ টাকা বা ব্যবসার সামগ্রী থাকলে তাকে নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক বলা হয়। এই সামর্থ্য থাকার পরও যদি কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে কোরবানি না করেন, তবে তিনি ওয়াজিব তরক করার কারণে গুনাহগার হবেন। অন্যদিকে, যাদের এই পরিমাণ আর্থিক সক্ষমতা নেই, তাদের জন্য পশু কোরবানি বাধ্যতামূলক নয়।
ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি বা ঋণ করে কোরবানি দেওয়ার বিষয়ে ইসলামের সুনির্দিষ্ট এবং অত্যন্ত যৌক্তিক বিধান রয়েছে। অধ্যাপক মুহাম্মদ আব্দুর রশীদ জানান, যদি কোনো ব্যক্তি ঋণের বোঝায় এমনভাবে জর্জরিত হন যে তার জীবনযাত্রা চালানোই কঠিন, থাকার জায়গা ও খাওয়ার জন্য পর্যাপ্ত অর্থ নেই—এমন তীব্র সংকটাপন্ন মানুষের জন্য কোরবানি ওয়াজিব নয়। তবে কোরবানি ওয়াজিব হওয়ার শর্ত পূরণ হওয়ার পর, যদি কোনো ব্যক্তির হাতে তৎক্ষণাৎ পর্যাপ্ত নগদ টাকা না থাকার কারণে তিনি ঋণ করে কোরবানি করেন, তবে তার এই ইবাদতটি সম্পূর্ণ সহিহ হবে এবং ওয়াজিব আদায় হয়ে যাবে। এক্ষেত্রে শর্ত হলো, ওই ব্যক্তির পরবর্তীতে সেই ঋণ পরিশোধ করার মতো সুনির্দিষ্ট আয়ের উৎস বা সামর্থ্য থাকতে হবে, যাতে করে এই ঋণ তার জীবনের জন্য নতুন কোনো বোঝা বা সংকট তৈরি না করে। পরিশোধের সক্ষমতা বা উৎস না থাকলে ঋণ করে কোরবানি না দেওয়ার বিষয়টিতেই ইসলামি গবেষকেরা বেশি গুরুত্ব দেন।
ব্যক্তিগত বা ব্যবসায়িক প্রয়োজনে ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও কোরবানির নিয়মটি অত্যন্ত স্পষ্ট। অধ্যাপক মুহাম্মদ আব্দুর রশীদ এর ব্যাখ্যায় বলেন, কোনো ব্যক্তির যদি পর্যাপ্ত জমি বা দৃশ্যমান সম্পদ থাকে, কিন্তু তিনি ব্যবসার কোনো বিশেষ কাজের জন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নেন, তবে তার ওপর কোরবানি দেওয়া ওয়াজিব। কারণ ঋণের বিপরীতে তার দায় পরিশোধের মতো যথেষ্ট সম্পদ রয়েছে। অর্থাৎ, ঋণ পরিশোধে সক্ষম কোনো ব্যক্তি যদি ব্যাংকের কাছে ঋণগ্রস্তও থাকেন, তাহলেও কোরবানির দিনগুলোতে নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকলে তার জন্য কোরবানি দেওয়া ইসলামের বিধান অনুযায়ী বাধ্যতামূলক। তবে ইসলামি গবেষকদের মতে, কোরবানি যেহেতু একটি সম্পূর্ণ পবিত্র ও বিশুদ্ধ ইবাদত, তাই সুদের মতো কোনো অপবিত্র বা নিষিদ্ধ অর্থের মাধ্যমে এই ইবাদত সম্পন্ন করা যাবে না।
পশুর বয়স এবং ভাগে কোরবানির ক্ষেত্রেও শরিয়তের নির্ধারিত নিয়মাবলি মেনে চলা জরুরি। নিয়ম অনুযায়ী, একটি গরু, মহিষ বা উটের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সাতজন ব্যক্তি শরিক হতে বা ভাগে কোরবানি দিতে পারবেন। তবে ছাগল, ভেড়া বা দুম্বার ক্ষেত্রে একাধিক শরিক হওয়া কোনোভাবেই জায়েজ নয়; এগুলো কেবল একজনের পক্ষ থেকেই উৎসর্গ করতে হবে। বয়সের ক্ষেত্রে গরু ও মহিষের ন্যূনতম দুই বছর, উটের পাঁচ বছর এবং ছাগল, ভেড়া ও দুম্বার ক্ষেত্রে অন্তত এক বছর পূর্ণ হওয়া শর্ত। তবে কোনো ভেড়া বা দুম্বা যদি ছয় মাসেরও হয়, কিন্তু দেখতে এক বছরের পশুর মতো হৃষ্টপুষ্ট লাগে, তবে তা দিয়ে কোরবানি করা জায়েজ।
কোরবানির ক্ষেত্রে নিয়তের বিশুদ্ধতা সবচেয়ে বড় বিষয়। অধ্যাপক মুহাম্মদ আব্দুর রশীদ উল্লেখ করেন, কোরবানি যেন কোনোভাবেই লোকদেখানো বিষয়ে পরিণত না হয়। কোনো ব্যক্তি যদি দরিদ্র মানুষকে বিলিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী প্রয়োজনের অতিরিক্ত পশু কোরবানি করেন, তবে তা অত্যন্ত ইতিবাচক; কিন্তু সেটি যেন কোনো সামাজিক লৌকিকতার উদ্দেশ্যে না হয়। কোরবানি মূলত একটি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ইবাদত। পরিবারের একাধিক সদস্য—যেমন বাবা, মা বা সন্তান যদি প্রত্যেকেই পৃথকভাবে নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হন, তবে তাদের প্রত্যেকের ওপর আলাদাভাবে কোরবানি দেওয়া ওয়াজিব হবে। এছাড়া কোরবানির মূল উদ্দেশ্য যেহেতু আল্লাহর নামে নির্দিষ্ট পশুর রক্ত প্রবাহিত করা, তাই কোরবানির পশুর সমপরিমাণ টাকা কোনো গরিব মানুষকে দান করে দিলে ওয়াজিব কোরবানি আদায় হবে না; তবে তা নফল দান হিসেবে গণ্য হতে পারে।