ধ্রুব ডেস্ক
শায়খ আলী বিন আবদুর রহমান আল-হুজাইফি ছবি: ধ্রুব নিউজ
“আল্লাহ বলেন, ‘আমি কত জনপদকে অবকাশ দিয়েছি যখন তারা ছিল জালিম। অতঃপর তাদের শাস্তি দিয়েছি এবং প্রত্যাবর্তন আমারই কাছে।’”
কোরআনে বর্ণিত জালিম শাসকদের পরিণতি, তাদের ধ্বংসের ইতিহাস তুলে ধরে তা থেকে শিক্ষা নেওয়ার বার্তা উঠে এসেছে এবারের হজের খুতবায়।
মসজিদে নববীর ইমাম ও খতিব শায়খ আলী বিন আবদুর রহমান আল-হুজাইফি মঙ্গলবার আরাফাতের ময়দানে হজের খুতবায় বলেন, “সৃষ্টিজগতে আল্লাহর নির্ধারিত কিছু চিরন্তন বিধান রয়েছে, যেগুলোর প্রতি বান্দার ঈমান রাখা এবং তা থেকে শিক্ষা ও উপকার গ্রহণ করা কর্তব্য।”
সুরা আল-হজ থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে হুজাইফি বলেন, “নিশ্চয় আল্লাহ মুমিনদেরকে রক্ষা করেন এবং কোনো বিশ্বাসঘাতক অকৃতজ্ঞকে পছন্দ করেন না। আল্লাহ বলেন, ‘আমি কত জনপদকে অবকাশ দিয়েছি যখন তারা ছিল জালিম। অতঃপর তাদের শাস্তি দিয়েছি এবং প্রত্যাবর্তন আমারই কাছে।’
“আর আল্লাহ অবশ্যই তাকে সাহায্য করবেন, যে তার দ্বীনকে সাহায্য করে। নিশ্চয় আল্লাহ শক্তিমান, পরাক্রমশালী।”
সত্যের পথে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার মাধ্যমে মুসলমানদের ‘অবস্থা সংশোধনে’র জন্য সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করা হয় হজের খুতবায়।
আবদুর রহমান আল-হুজাইফি বলেন, “হে আল্লাহ, মুসলমানদের অবস্থা সংশোধন করুন। তাদের সত্যের ওপর ঐক্যবদ্ধ করুন। তাদের সব বিষয়ের দায়িত্ব গ্রহণ করুন এবং তাদের দ্বীনি ও দুনিয়াবি অবস্থা সুন্দর করে দিন।”
খুতবায় সৌদি বাদশাহ সালমান বিন আব্দুল আজিজ এবং যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমানের জন্যও প্রার্থনা করা হয়।
ইমাম বলেন, “পবিত্র মসজিদের খাদেম বাদশাহ সালমান বিন আব্দুল আজিজ এবং তার যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমানকে তৌফিক দান করুন। তাদের দুনিয়া ও আখিরাতে উত্তম প্রতিদান দিন। তারা আপনার বান্দাদের সঙ্গে উত্তম আচরণ করেছে, হাজিদের জন্য ইবাদত পালন সহজ করেছে এবং দুই পবিত্র মসজিদ ও আগমনকারীদের সেবায় উদারভাবে ব্যয় করেছে।”
হাজিদের হজ আর ইবাদত কবুলের প্রার্থনা করা হয় খুতবায়।
বলা হয়, “আল্লাহ হাজিদের কাজ সহজ করে দিন। তাদের গুনাহসমূহ ক্ষমা করুন। তাদের নিরাপদ, সফল ও কল্যাণপ্রাপ্ত অবস্থায় নিজ নিজ দেশে ফিরিয়ে দিন।”
মঙ্গলবার সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করেন হাজিরা। সেখানে খুতবা শোনেন এবং জোহর ও আসরের নামাজ পড়েন। মূলত আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করাই হজের মূল আনুষ্ঠানিকতা।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ১৫ লাখের বেশি মুসলমান সৃষ্টিকর্তার কাছে হাজিরা দিতে সমবেত হন আরাফাতের ময়দানে। তাদের কণ্ঠে ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়ান নিমাতা লাকা ওয়াল মুল্ক, লা শারিকা লাক’ ধ্বনিতে প্রকম্পিত হয় বিদায় হজের স্মৃতি বিজড়িত এই ময়দান।
যার অর্থ- “আমি হাজির, হে আল্লাহ আমি হাজির, তোমার কোনো শরিক নেই, সব প্রশংসা ও কর্তৃত্ব শুধু তোমারই, আর তোমার কোনো শরিক নেই।”
হজের খুতবায় আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাস, আখিরাতে মুক্তির উপায় হিসেবে তাকওয়া অর্জন, তাকদিরে বিশ্বাস আর সবর করা, আল্লাহর চিরন্তন বিধানের ওপর ঈমান রাখা এবং তা থেকে শিক্ষা নেওয়ার উপদেশ দেওয়া হয়।
সেইসঙ্গে কেয়ামতের বর্ণনা, হজের ইতিহাস এবং এর হজের মাধ্যমে মুসলমানদের পারস্পরিক পরিচয়, সম্প্রীতি, সহযোগিতা ও সহমর্মিতা প্রতিষ্ঠার কথা তুলে ধরেন খতিব।
খুতবায় বলা হয়, “হে মানবমণ্ডলী! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো। কেননা তাকওয়াই বান্দার আখিরাতে মুক্তির উপায়।…আল্লাহর তাকওয়ার মধ্যে সবচেয়ে বড় কাজ হল কেয়ামতের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া, নেক আমল করা এবং পাপ ও অসৎকর্ম পরিত্যাগ করা।
“আল্লাহ তাআলা বলেন- ‘এটা এই জন্যই যে, আল্লাহই একমাত্র সত্য, আর তিনিই মৃতদের জীবিত করেন এবং তিনি সবকিছুর ওপর শক্তিমান। আর নিশ্চয় কেয়ামত আসবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই এবং আল্লাহ কবরবাসীদের পুনরুত্থিত করবেন’।”
হাজিদের ব্যাপারে বলা হয়, “তারা আসে নিজেদের কল্যাণ প্রত্যক্ষ করতে এবং আল্লাহর নাম স্মরণ করতে। হাজিগণ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও তার সওয়াবের আশায় হজের বিধান পালন করতে আসেন।
“তারা সম্মান করেন বাইতুল আতিক ও পবিত্র স্থানসমূহকে। আল্লাহ তাআলা বলেন- ‘আর এই মসজিদুল হারাম যা আমি মানুষের জন্য সমান করে দিয়েছি, সেখানে অবস্থানকারী ও বহিরাগত সকলেই সমান। আর যে সেখানে অন্যায়ভাবে গোমরাহী ও জুলুম করার ইচ্ছা পোষণ করবে, আমি তাকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি আস্বাদন করাব’।”
ইমাম আবদুর রহমান আল-হুজাইফি বলেন, “হাজিরা এসব পবিত্র স্থানে আসে তাওহিদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করার জন্য এবং শিরক বর্জনের উদ্দেশ্যে।
“হজে মুসলমানদের মধ্যে পারস্পরিক পরিচয়, সম্প্রীতি, সহযোগিতা ও সহমর্মিতার অপূর্ব দৃশ্য প্রকাশ পায়। ভাষা, বর্ণ ও দেশের ভিন্নতা সত্ত্বেও তারা ভ্রাতৃত্ব ও ভালোবাসায় একত্র হয়ে ইবাদত পালন করে। তারা নিজেদের কল্যাণ লাভ করে এবং নিজেদের কোরবানির পশু থেকে দুস্থ, অভাবগ্রস্তকে আহার করায়। তাদের বৈশিষ্ট্য হয় কাজে উত্তম আচরণ এবং কথায় সত্যবাদিতা।”
হজের সময়ে আল্লাহর কাছে বেশি বেশি দোয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে খুতবার। বলা হয়, “আল্লাহকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল মানুষ যেন বেশি বেশি তার প্রতিপালকের কাছে দোয়া করে, বিশেষত হজের স্থানসমূহে। কারণ এগুলো দোয়া কবুলের বিশেষ স্থান।
“আল্লাহ তাআলা বলেন- ‘আর তোমাদের প্রতিপালক বলেন, তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব’।”
ইসলামের পাঁচটি মূল স্তম্ভের (আরকান) মধ্যে হজ পঞ্চম স্তম্ভ। শারীরিক ও আর্থিকভাবে সামর্থ্যবান প্রতিটি মুসলিম নর-নারীর ওপর জীবনে একবার হজ পালন করা ফরজ বা আবশ্যিক।
জিলহজ মাসের নির্দিষ্ট দিনে (মূলত ৯ জিলহজ) হজের নিয়তসহ ইহরাম পরিধান করে আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা এবং মিনা, মুজদালিফায় অবস্থান করা ও পবিত্র কাবা শরিফ তাওয়াফ ও সাঈ করা হজ।
মক্কায় কাবাঘর প্রদক্ষিণ, আরাফাতের ময়দানে অবস্থান, সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মধ্যে দৌড়ানো, মিনার জামারায় পাথর নিক্ষেপ, আল্লাহর উদ্দেশ্যে পশু কোরবানি ইত্যাদি হজের ইবাদত।
এর প্রতিটি ইবাদতের মধ্যেই রয়েছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ও ঐতিহ্য। এগুলোর সঙ্গে হজরত ইবরাহিমের (আ.) হাতে তার ছেলে হজরত ইসমাইলের (আ.) কোরবানি, আল্লাহর প্রতি অবিচল আস্থা–বিশ্বাস, আনুগত্যের শিক্ষা রয়েছে।