ধ্রুব ডেস্ক
ইসলামের ইতিহাসে পশু কোরবানির ঐতিহ্য হযরত আদম (আঃ) কিংবা হযরত ইব্রাহিম (আঃ)-এর আমল থেকে শুরু হলেও, ইসলাম প্রচারের প্রাথমিক যুগে এটি আজকের নিয়মে প্রচলিত ছিল না। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) মক্কায় অবস্থানকালীন সময়ে মক্কাবাসীরা বিভিন্ন দেব-দেবীর নামে পশু উৎসর্গ করত। ফলে একত্ববাদে বিশ্বাসী নবী (সাঃ) মক্কায় থাকাকালীন সেই পৌত্তলিক রীতি অনুসরণ করেননি। মূলত নবুয়ত প্রাপ্তির প্রায় ১৩ বছর পর, মদিনায় হিজরতের পরেই ইসলামে কোরবানির বিধান আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হয়।
উৎসবে নতুন মাত্রা ও দুই ঈদের প্রবর্তন
হিজরি দ্বিতীয় সনে ইসলামে রোজা এবং ঈদুল ফিতরের প্রচলন শুরু হয়। এর আগে মদিনার বাসিন্দারা প্রাচীন প্রথা অনুযায়ী ‘নওরোজ’ ও ‘মিহিরজান’ নামে দুটি সামাজিক উৎসব পালন করতেন—যার একটি উদযাপিত হতো শরতে এবং অন্যটি বসন্তে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক মোঃ আতাউর রহমান মিয়াজী জানান, মদিনার ওই দুটি উৎসবের আদলেই মুসলমানদের জন্য বছরে দুটি ধর্মীয়, সামাজিক ও জাতীয় উৎসবের নীতি প্রবর্তন করা হয়। এর মধ্যে হজের সময়ে পালিত উৎসবটিই 'ঈদুল আজহা' বা কোরবানির ঈদ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।
মক্কায় কোরবানির নির্দেশনা ও মদিনার বাস্তবতা
ইসলামিক ফাউন্ডেশনের হালাল সনদ বিভাগের উপ-পরিচালক মাওলানা মোঃ আবু ছালেহ পাটোয়ারী জানান, রাসুল (সাঃ) মক্কায় থাকার সময়ই কোরবানির দিকনির্দেশনা সম্বলিত ‘সূরা কাওসার’ নাজিল হয়েছিল। এছাড়া মক্কা ও মদিনা—উভয় আমলের যোগসূত্র থাকা ‘সূরা হজ’-এও কোরবানির নির্দেশ পাওয়া যায়। এতে স্পষ্ট হয় যে, কোরবানির ধারণাটি মক্কা জীবনের শেষভাগেই তৈরি হয়েছিল।
তবে ইসলাম প্রচারের পর ঠিক কোন তারিখে প্রথম কোরবানি দেওয়া হয়েছিল, তার সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক তারিখ পাওয়া যায় না। সুনানে তিরমিজির একটি হাদিসে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমরের সূত্রে উল্লেখ আছে, হিজরতের পর মহানবী (সাঃ) মদিনায় যে ১০ বছর অবস্থান করেছিলেন, তার প্রতি বছরই তিনি কোরবানি দিয়েছেন। সাহাবী হযরত আনাস ইবনে মালিকের বর্ণনা অনুযায়ী, রাসুল (সাঃ) দুটি শিং ওয়ালা নাদুস-নুদুস দুম্বা নিজ হাতে জবাই করতেন এবং বলতেন—একটি তাঁর নিজের পক্ষ থেকে এবং অন্যটি তাঁর উম্মতের পক্ষ থেকে।
'হাদি' প্রথা ও হুদাইবিয়ার সন্ধি
ইসলামের প্রথম যুগে কোরবানির বিষয়টি ছিল মূলত হজ বা ওমরাহ কেন্দ্রিক। সে সময় মক্কার উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার সময় কোরবানির জন্য উট বা দুম্বা সাথে নিয়ে যাওয়া হতো, যেগুলোকে ‘হাদি’ বলা হতো। কোরবানির পশু চেনার সুবিধার্থে সেগুলোর পিঠে বা সিনায় বিশেষ চিহ্ন বা দাগ কেটে মক্কার দিকে ছেড়ে দেওয়ার একটি নিয়মও তখন প্রচলিত ছিল।
অধ্যাপক মোঃ আতাউর রহমান মিয়াজী উল্লেখ করেন, ষষ্ঠ হিজরিতে (৬২৮ খ্রিস্টাব্দে) মহানবী (সাঃ) যখন ওমরাহ করার উদ্দেশ্যে মক্কার দিকে রওনা হন, তখন কাফেরদের বাধায় তিনি হুদাইবিয়ায় তাঁবু গাড়তে বাধ্য হন। সেখানে ঐতিহাসিক হুদাইবিয়ার সন্ধি চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর তিনি নিজের ও পরিবারের পক্ষ থেকে পশু কোরবানি করেন। জানা যায়, সে সময় তিনি ৬৩টি উট কোরবানি দিয়েছিলেন।
মক্কা বিজয় ও আনুষ্ঠানিক কোরবানি
হিজরি নবম সনে ইসলামের প্রথম খলিফা হযরত আবু বকরের (রাঃ) নেতৃত্বে একটি দল হজের উদ্দেশ্যে রওনা হয় এবং তাদের সাথেও কোরবানির জন্য ‘হাদি’ বা পশু ছিল। এর পরের বছর অর্থাৎ দশম হিজরিতে মহানবী (সাঃ) মক্কা বিজয়ের পর নিজে সশরীরে ঐতিহাসিক বিদায় হজ সম্পাদন করেন এবং সেখানে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে আনুষ্ঠানিকভাবে কোরবানি আদায় করেন। সেই সময় থেকেই মূলত উট, গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা কোরবানির এই বিধানটি মুসলিম উম্মাহর মাঝে স্থায়ী ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে।