সাইফুল ইসলাম
পবিত্র মক্কা নগরীর মসজিদুল হারামের ভেতরে, মুসলিম উম্মাহর হৃদস্পন্দন কাবা শরিফ থেকে মাত্র বিশ মিটার দূরত্বে অবস্থিত ঐতিহাসিক জমজম কূপ। পৃথিবীর কোটি কোটি মুসলমানের কাছে এই কূপের পানি কেবল তৃষ্ণা নিবারণের মাধ্যম নয়, বরং এক পরম পবিত্র ও অলৌকিক বরকতময় নিয়ামত। প্রতি বছর হজে কিংবা ওমরাহ পালনে যাওয়া লাখো ধর্মপ্রাণ মানুষের মক্কা ছাড়ার মুহূর্তে সবচেয়ে বড় আকুলতা থাকে এই পুণ্যময় পানি সঙ্গে নিয়ে ফেরার। হজ পালন শেষে জমজমের পানি আনেননি—এমন ঘটনা মেলা ভার। শুধু নিজেরা পান করাই নয়, দেশে ফিরে আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের মাঝে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে এই পানি বিতরণ করার একটি দীর্ঘকালীন ঐতিহ্য মুসলিম সমাজে প্রচলিত। রোগব্যাধি থেকে মুক্তি, অমঙ্গল দূরীকরণ এবং আত্মিক প্রশান্তির এক গভীর বিশ্বাস জড়িয়ে রয়েছে এই বারিধারার সঙ্গে। কিন্তু কেন এই পানির প্রতি মুসলিম হৃদয়ে এতোটা আবেগ ও গুরুত্ব, তার পেছনে রয়েছে হাজার বছরের এক অলৌকিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট।
ইসলামি বিশ্বাস ও ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, জমজম কূপের সৃষ্টি হয়েছিল আজ থেকে প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে, এক মরুময় ও জনমানবহীন প্রান্তরে। মহান আল্লাহর নির্দেশ পালনার্থে ইসলামের অন্যতম নবী হজরত ইব্রাহিম (আ.) তাঁর স্ত্রী বিবি হাজেরা এবং দুগ্ধপোষ্য শিশুপুত্র হজরত ইসমাইল (আ.)-কে মক্কার এক জনহীন, ধূসর মরুভূমিতে সামান্য কিছু খেজুর ও পানি দিয়ে রেখে আসেন। বিদায়লগ্নে বিবি হাজেরা যখন জানতে পারেন যে এটি স্বয়ং আল্লাহর আদেশ, তখন তিনি পরম শান্তিতে আল্লাহর ওপর ভরসা করে সেই নির্জন প্রান্তরে রয়ে যান। কয়েকদিন পর রসদ শেষ হয়ে গেলে শিশু ইসমাইল তীব্র তৃষ্ণায় ছটফট করতে থাকেন। এক ফোঁটা পানির আসায় ব্যাকুল মা হাজেরা সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মাঝে সাতবার হন্যে হয়ে ছুটে চলেন, যা পরবর্তীতে হজের অন্যতম আবশ্যকীয় বিধান 'সাঈ' হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়। ইতিহাসের অন্যতম প্রধান হাদিস গ্রন্থ 'সহিহ আল বুখারি' এবং প্রখ্যাত মুসলিম ইতিহাসবিদ ইমাম ইবনে জারির আল তাবারির 'তারিখু তাবারি' গ্রন্থের বর্ণনা অনুযায়ী, চরম সংকটের সেই মুহূর্তে আল্লাহর নির্দেশে ফেরেশতা হজরত জিবরাইল (আ.) তাঁর ডানার ঝাপটা বা পায়ের গোড়ালি দিয়ে মাটিতে আঘাত করেন। অলৌকিকভাবে ঠিক সেই স্থান থেকেই স্ফটিকস্বচ্ছ পানির ধারা প্রবাহিত হতে শুরু করে। পানির তীব্র বেগ দেখে বিবি হাজেরা পাথর ও বালি দিয়ে বাঁধ দিতে দিতে হিব্রু ও আরামায়িক শব্দে উচ্চারণ করেছিলেন 'জম জম', যার অর্থ 'থামো' বা 'প্রবাহ বন্ধ হও'। সেই থেকেই এই অলৌকিক ঝর্ণাধারাটি 'জমজম কূপ' নামে পরিচিতি লাভ করে। এই জীবনদায়ী পানির অস্তিত্ব দেখেই পরবর্তীতে জুরহুম গোত্রসহ আরবের যাযাবর কাফেলাগুলো এই জনহীন মরুভূমিতে বসতি স্থাপন করতে শুরু করে এবং কালক্রমে অনুর্বর মক্কা একটি সমৃদ্ধ বাণিজ্য নগরীতে রূপ নেয়।
মুসলিম স্কলার ও ইতিহাসবিদদের মতে, মহান আল্লাহর এক সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ ছিল এই জমজম। এই কূপকে কেন্দ্র করেই মক্কা আবাদ হয়, পরবর্তীতে আদি পিতা আদম (আ.)-এর রেখে যাওয়া ভিত্তির ওপর হজরত ইব্রাহিম (আ.) ও তাঁর পুত্র পুনরায় পবিত্র কাবা ঘর নির্মাণ করেন এবং বিশ্ববাসীকে হজের আহ্বান জানান। তবে এটি স্পষ্ট যে, হজ বা ওমরাহর মূল রোকন, ফরজ কিংবা ওয়াজিবের সঙ্গে জমজমের পানি পানের সরাসরি কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নেই। তবে তাওয়াফ শেষে এবং সাঈ করার আগে আল্লাহর রাসুল হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সুন্নাহ অনুসরণ করে হাজিরা এই পানি পান করে থাকেন। মুসলিম ইতিহাসের বিখ্যাত সংকলন 'আল মুজামুল কাবির'-এ বর্ণিত হাদিস অনুযায়ী, মহানবী (সা.) নিজেই জমজমের পানিকে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ পানি হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন এবং বলেছেন যে এটি একই সঙ্গে ক্ষুধার্তের খাদ্য ও রোগব্যাধি থেকে মুক্তির মহৌষধ। এই বিশ্বাস ও রাসুলের বাণীর কারণেই শতাব্দী ধরে মুসলিমদের কাছে এর ধর্মীয় ও আত্মিক গুরুত্ব অপরিসীম।
সৌদি গেজেটের তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে একনাগাড়ে পানি সরবরাহ করে যাওয়া এই কূপটিকে পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন ও সক্রিয় পানির উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মাত্র ৩০ মিটার গভীর এই সাধারণ আকৃতির কূপটি আধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় সাড়ে আঠারো লিটার পানি পাম্প করতে সক্ষম। ২০১৩ সালে তৎকালীন সৌদি সরকার প্রায় ৭০০ মিলিয়ন সৌদি রিয়াল ব্যয়ে এই কূপের পানি উত্তোলন, তদারকি ও বিতরণের জন্য আধুনিক 'কিং আবদুল্লাহ জমজম ওয়াটার প্রজেক্ট' (কেপিজেড ডব্লিউ) চালু করে। মসজিদুল হারাম থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই প্ল্যান্টে স্বয়ংক্রিয় পাইপলাইনের মাধ্যমে পানি এনে অত্যাধুনিক পদ্ধতিতে ফিল্টারিং ও জীবাণুমুক্ত করা হয়। এরপর বিশাল জলাধারে জমা করে মক্কার বিভিন্ন প্রান্তে এবং বিশেষ ট্যাঙ্কার বহরের মাধ্যমে প্রতিদিন মদিনার মসজিদে নববীতে লাখো লিটার পানি অত্যন্ত সুরক্ষিত উপায়ে পরিবহন করা হয়।
ঐতিহাসিক বিবর্তনের ধারায় জুরহুম গোত্র মক্কা থেকে বিতাড়িত হওয়ার সময় এই কূপটি মাটি চাপা দিয়ে ধ্বংস করে দেয়, ফলে দীর্ঘকাল এটি লোকচক্ষুর আড়ালে ছিল। পরবর্তীতে মহানবী (সা.)-এর দাদা আব্দুল মুত্তালিব স্বপ্নের মাধ্যমে দিকনির্দেশনা পেয়ে নিজের মানত পূরণ ও ত্যাগের বিনিময়ে এই পবিত্র কূপটি পুনরায় আবিষ্কার ও খনন করেন। এরপর থেকে সৌদি রাজপরিবারের অধীনে ২০১৭ সালের আধুনিক সংস্কারসহ বিভিন্ন সময়ে এর আধুনিকায়ন সম্পন্ন হয়েছে। ২০১১ সালে আন্তর্জাতিক কিছু সংবাদমাধ্যমে এই পানির গুণগত মান নিয়ে বিতর্ক তোলার চেষ্টা করা হলেও, সৌদি জিওলজিক্যাল সার্ভের অধীনে থাকা 'জমজম স্টাডিজ অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার' অত্যন্ত জোরালোভাবে তা প্রত্যাখ্যান করে। কারণ হিসেবে তারা জানায়, প্রতিদিন স্বয়ংক্রিয়ভাবে তিনটি ভিন্ন নমুনা সংগ্রহ করে এই পানির গুণগত মান ও বিশুদ্ধতা পরীক্ষা করা হয়। এমনকি ২০২০ ও ২০২১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত চিকিৎসাবিজ্ঞান গবেষণা পোর্টাল 'ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিন'-এ প্রকাশিত একাধিক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, জমজমের পানি সম্পূর্ণ রোগজীবাণুমুক্ত, মানবদেহের লিভারের জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ এবং এর খনিজ উপাদান ও রাসায়নিক প্রোফাইল আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের চেয়েও উন্নত ও মানবস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী। যুগ যুগ ধরে বিজ্ঞান ও বিশ্বাসের এই মেলবন্ধনে জমজম কূপ মুসলিম উম্মাহর কাছে এক জীবন্ত অলৌকিক নিদর্শন হয়ে টিকে আছে।
সূত্র: বিভিন্ন অন্তর্জাল ঘেটে লেখাটি তৈরি করা।