আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রাতিষ্ঠানিক অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে বিক্ষোভরত শিক্ষার্থীরা ছবি: সংগৃহীত
পরীক্ষাহলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে উত্তর খুঁজতে গিয়ে ধরা পড়ার পর ভারতের মর্যাদাপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি (আইআইটি) মুম্বাইয়ের এক শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। হৃদয়বিদারক এই ঘটনার পর থেকে তীব্র বিক্ষোভে ফেটে পড়েছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। অভিযুক্তদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং প্রশাসনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে ১০ দফা দাবিতে বর্তমানে পুরো ক্যাম্পাস উত্তাল হয়ে উঠেছে।
ঘটনার সূত্রপাত গত শুক্রবার, যখন এনার্জি সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী সাহিল ওয়াকোড়ে পরীক্ষার উত্তর খোঁজার উদ্দেশ্যে প্রশ্নপত্রটি চ্যাটজিপিটিতে আপলোড করার সময় হাতেনাতে ধরা পড়েন। পরবর্তীতে ওই দিন সন্ধ্যায় হোস্টেলের নিজ কক্ষ থেকে তার ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এই মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই বিক্ষোভে নামেন অন্যান্য শিক্ষার্থীরা। শনিবার সারাদিন বিক্ষোভ প্রদর্শনের পর রাতে ক্যাম্পাসজুড়ে বের করা হয় একটি বিশাল মোমবাতি মিছিল। আজও ক্যাম্পাসের প্রধান প্রশাসনিক ভবনের সামনে অবস্থান নিয়ে টানা আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দাবি, ধরা পড়ার পর সাহিলের বিরুদ্ধে কোনো কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি; বরং তাকে কাউন্সেলিং করা হয়েছিল এবং তার ভবিষ্যতের যেন কোনো ক্ষতি না হয় সে বিষয়ে আশ্বাসও দেওয়া হয়েছিল। তবে শিক্ষার্থীরা কর্তৃপক্ষের এই বক্তব্য সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁদের অভিযোগ, ইনস্টিটিউট প্রশাসন সাহিলকে এক বছরের জন্য সাময়িক বহিষ্কার বা সাসপেন্ড করার হুমকি দিয়েছিল। ফলে তাকে হোস্টেল ছেড়ে ক্যাম্পাসের বাইরে চলে যেতে হতো এবং স্বাভাবিক চার বছরের বদলে তার ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি শেষ হতে আরও অতিরিক্ত সময় লেগে যেত। অ্যাকাডেমিক জীবনের এই বড় ধরণের অনিশ্চয়তা ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হওয়ার কারণেই সে এমন চরম সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে বলে শিক্ষার্থীরা মনে করছেন। পাশাপাশি, প্রশাসন এই মৃত্যুর পারিপার্শ্বিক সত্য ও প্রকৃত তথ্য গোপন করার চেষ্টা করছে বলেও দাবি তোলা হয়েছে।
আন্দোলনকারীদের মতে, সাহিলের ঘটনাটি কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়, বরং এটি স্পষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলার ফল। কারণ গত এক বছরে পোওয়াই ক্যাম্পাসে অন্তত চারজন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন, যা এখানকার অ্যাকাডেমিক পরিবেশ ও প্রশাসনিক কাঠামোর মারাত্মক গলদকে নির্দেশ করে। শিক্ষার্থীরা অবিলম্বে আইআইটি মুম্বাইয়ের ডিরেক্টর শিরীশ কেদাড়ে এবং সংশ্লিষ্ট ডিনের পদত্যাগ দাবি করছেন। একইসঙ্গে তাঁরা এ ঘটনার নিরপেক্ষ ও স্বাধীন তদন্ত পরিচালনা, পরীক্ষা সংক্রান্ত কমিটিতে শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিতকরণ, মানসিক স্বাস্থ্য সেবা উইংয়ের আমূল সংস্কার এবং মৃত সাহিলের পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদানের মতো ১০ দফা দাবি বাস্তবায়নের জোর আহ্বান জানিয়েছেন।
এদিকে সাহিল দলিত সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় ক্যাম্পাসে বিদ্যমান জাতিগত বৈষম্যের অভিযোগ তুলে সাধারণ শিক্ষার্থীরা চরম ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। শিক্ষার্থীদের টানা আন্দোলন ও সার্বিক চাপের মুখে পরবর্তীতে এই মামলার তদন্তভার পুলিশের হাত থেকে ক্রাইম ব্রাঞ্চের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। শিক্ষার্থীরা একে তাঁদের প্রাথমিক বিজয় হিসেবে দেখলেও মূল অভিযুক্ত অধ্যাপক সূর্যনারায়ণ দুল্লাসহ সংশ্লিষ্টদের গ্রেপ্তার না করা পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কথা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে লিখিত কোনো নিশ্চয়তা এবং স্বচ্ছ তদন্তের সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ না পাওয়া পর্যন্ত তাঁরা মাঠ ছাড়বেন না। আপাতত যেকোনো ধরণের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে ও আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে ক্যাম্পাসের ভেতর ও আশপাশের এলাকায় বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রাখা হয়েছে।