আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ছবি: এ পি
ইন্দোনেশিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় ফ্লোরেস দ্বীপে ভয়াবহ ভূমিকম্পে অন্তত ২০ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। শনিবার ভোরে আঘাত হানা ৭ দশমিক ৭ মাত্রার এই শক্তিশালী কম্পনে আহত হয়েছেন আরও অন্তত ছয়জন। ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও কয়েকজন আটকে থাকায় হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
স্থানীয় উদ্ধারকারী সংস্থা এএফপিকে জানিয়েছে, দেশটির মাউমেরে এলাকায় উদ্ধার কাজ জোরদার করা হয়েছে এবং অন্তত দুজন এখনো ভেঙে পড়া ভবনের নিচে আটকা পড়ে আছেন।
মার্কিন ও ইন্দোনেশীয় ভূ-পদার্থবিদদের তথ্যমতে, ভূমিকম্পটির কেন্দ্রস্থল ছিল ফ্লোরেস দ্বীপের উত্তর উপকূলবর্তী এন্দে শহর থেকে প্রায় ৬৮ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে। ভূ-পৃষ্ঠের কম গভীরতায় এর উৎপত্তিস্থল হওয়ায় উপকূলীয় ও আশপাশের ছোট শহর এবং গ্রামগুলোতে প্রচণ্ড কম্পন অনুভূত হয়। মূল ভূমিকম্পের পরপরই এলাকাটি বেশ কয়েকটি শক্তিশালী 'আফটার শক'-এ কেঁপে ওঠে, যার মধ্যে একটির মাত্রা ছিল ৬ দশমিক ১।
কম্পন শুরু হতেই আতঙ্কিত হাজার হাজার মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে রাস্তায় নেমে আসেন। বিশেষ করে ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থলের কাছে অবস্থিত নাগেকেও রিজেন্সির বাসিন্দাদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। উপকূলের কাছে হঠাৎ সমুদ্রের পানি পেছনের দিকে সরে যেতে দেখে তড়িঘড়ি করে সবাই পাহাড় ও উঁচু স্থানের দিকে ছোটেন—কারণ সমুদ্রের পানি এভাবে হঠাৎ সরে যাওয়াকে সাধারণত সুনামির আগাম লক্ষণ ধরা হয়।
সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে দেশটির আবহাওয়া, জলবায়ু ও ভূ-পদার্থবিজ্ঞান সংস্থা শুরুতে ৫০ সেন্টিমিটার থেকে ৩ মিটার উচ্চতার সুনামির পূর্বাভাস দিলেও পরবর্তীতে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে সেই সতর্কতা তুলে নেয়। তবে প্রশাসন সমুদ্রের পানির উচ্চতা সতর্কতার সঙ্গে নজরদারিতে রাখছে এবং স্থানীয়দের দুর্ঘটনাকবলিত দুর্বল ভবনগুলোতে এখনই না ফেরার নির্দেশ দিয়েছে।
স্থানীয় অধিবাসী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় উঠে এসেছে সেই মুহূর্তের ভয়াবহতা। নাগেকেওর বাসিন্দা ৫৬ বছর বয়সী ইয়োহানেস বাবো জানান, তিনি বাজারে থাকাকালীন হঠাৎ পুরো এলাকা প্রবলভাবে দুলতে শুরু করে। মানুষ দিগ্বিদিক জ্ঞান হারিয়ে ছুটতে থাকে। তবে তিনি ও তাঁর পরিবার সময়মতো পাহাড়ি এলাকায় আশ্রয় নেওয়ায় অক্ষত আছেন। অন্যদিকে মাউমেরে শহরের এক হাসপাতাল কর্মকর্তা লুকাস লোটার জানান, কম্পন এতই তীব্র ছিল যে ভাঙন আতঙ্কে চিকিৎসাধীন রোগীদের দ্রুত বাইরে বের করে আনা হয়। একাধিক ভবনের দেওয়ালে বড় ধরনের ফাটল দেখা গেছে।
প্রশান্ত মহাসাগরের অতি-সংবেদনশীল ‘রিং অব ফায়ার’ বা অগ্নিবলয়ে অবস্থানের কারণে ইন্দোনেশিয়ায় প্রায়ই মারাত্মক ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত ঘটে থাকে।
ফ্লোরেস দ্বীপে ১৯৯২ সালেও ৭.৭ মাত্রার ভূমিকম্পে প্রলয়ঙ্করী সুনামিতে প্রায় ২ হাজার ৫০০ মানুষের প্রাণহানি হয়েছিল। এছাড়া ২০০৪ সালের ২৬ ডিসেম্বরের ঐতিহাসিক ‘বক্সিং ডে’ সুনামিতে ৯.১ মাত্রার কম্পনের পর সুমাত্রা দ্বীপসহ পুরো অঞ্চলে প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার মানুষ প্রাণ হারান, যার মধ্যে এককভাবে ইন্দোনেশিয়াতেই মৃত্যু হয় ১ লাখ ৭০ হাজার মানুষের। সম্প্রতি ২০১৮ সালেও লম্বক ও সুলাওয়েসি দ্বীপে পৃথক দুটি বড় ভূমিকম্প ও সুনামিতে প্রায় ৫ হাজার মানুষ নিহত বা নিখোঁজ হন।
বর্তমানে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে উদ্ধারকারী দল ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ পরিমাণ নিরূপণে কাজ করছে স্থানীয় প্রশাসন।