আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রতীকী ছবি ছবি: এ আই প্রণীত
মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করে সৌদি আরবের সাথে একটি যুগান্তকারী বেসামরিক পারমাণবিক চুক্তি স্বাক্ষর করেছে যুক্তরাষ্ট্র। বৃহস্পতিবার ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, এই চুক্তির ফলে রিয়াদ নিজেদের পারমাণবিক কর্মসূচি গড়ে তোলার পাশাপাশি নিজ ভূখণ্ডেই ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অভাবনীয় সুযোগ পেতে যাচ্ছে। মার্কিন জ্বালানি বিভাগ এটিকে একটি ‘শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। এর ফলে একদিকে যেমন সৌদি আরবের নিজস্ব পারমাণবিক শক্তি কর্মসূচির দ্বার উন্মুক্ত হবে, তেমনি মার্কিন কোম্পানিগুলোর জন্যও বিলিয়ন ডলারের বিশাল অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি হবে।
চুক্তির পূর্ণাঙ্গ ও বিস্তারিত বিবরণ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। তবে মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোর বরাতে জানা গেছে, এই চুক্তির আওতায় সৌদি আরব ভবিষ্যতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার সক্ষমতা অর্জন করবে। উৎপাদিত এই জ্বালানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ব্যবহারের পাশাপাশি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতেও ব্যবহারযোগ্য। বিভিন্ন প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, একটি যৌথ সমীক্ষা পরিচালনার পর সৌদি আরবে মার্কিন প্রযুক্তিতে একটি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র নির্মাণ করা হতে পারে। এতে করে জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে রিয়াদ নিজস্বভাবেই পারমাণবিক জ্বালানি উৎপাদনে সক্ষম হবে। অন্যদিকে, এই কেন্দ্র নির্মাণ ও পরিচালনার সাথে যুক্ত হয়ে মার্কিন কোম্পানিগুলো বিপুল পরিমাণ অর্থ আয় করবে। তবে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ও বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে এটি একটি নজিরবিহীন ছাড়। এমন পদক্ষেপের ফলে এমনিতেই অস্থিতিশীল থাকা মধ্যপ্রাচ্যে ভবিষ্যতে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তারের মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
মার্কিন জ্বালানি বিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মূল চুক্তির পাশাপাশি একটি ‘দ্বিপক্ষীয় সুরক্ষা চুক্তি’ও স্বাক্ষরিত হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, এই দুটি চুক্তি মূলত কয়েক দশকব্যাপী একটি বহু-বিলিয়ন ডলারের অংশীদারিত্বের আইনি ভিত্তি স্থাপন করল। এটি পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধের পাশাপাশি উভয় দেশের অগ্রাধিকারমূলক কৌশলগত ও অর্থনৈতিক উদ্দেশ্যকে এগিয়ে নেবে। মার্কিন জ্বালানি সচিব ক্রিস রাইট আশ্বস্ত করে এক বিবৃতিতে বলেছেন, এই চুক্তিগুলোতে পারমাণবিক নিরাপত্তা এবং অপ্রসারণের সর্বোচ্চ মান বজায় রাখা হয়েছে। এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব নকশা এবং বিশ্বের সেরা পারমাণবিক প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানীদের ওপর নির্ভর করা হয়েছে। অন্যদিকে, সৌদি সরকার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, এটি মূলত জ্বালানি খাতে উভয় দেশের দীর্ঘদিনের চলমান সহযোগিতারই একটি সম্প্রসারিত রূপ। গত নভেম্বরে সৌদি নেতার ওয়াশিংটন সফরের ধারাবাহিকতায় এই চুক্তি সম্পন্ন হলো বলে তারা উল্লেখ করেছে।
এই চুক্তির সময়কালটি ভূরাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার চলমান তীব্র উত্তেজনার মাঝেই এই ঘোষণা সামনে এলো। তাছাড়া, ইয়েমেনে ইরানের মিত্র হুথি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে ‘সামুদ্রিক অবরোধ’ ঘোষণার মাত্র দু’দিনের মাথায় এমন একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হলো। উল্লেখ্য, সৌদি আরবে অবস্থিত বেশ কয়েকটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ইতোমধ্যেই ইরানি হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। এমন সংকটময় পরিস্থিতিতে রিয়াদ ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার এই পারমাণবিক চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ সমীকরণে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।