টিবিএস
প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সপ্তাহজুড়ে বিক্ষোভ ছবি: সংগৃহীত
রাজস্থান পুলিশের স্পেশাল অপারেশনস গ্রুপের (এসওজি) এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘৪০০টির বেশি প্রশ্ন থাকা একটি গেস পেপারের ভেতরে এসব প্রশ্ন লুকিয়ে রাখা হয়েছিল।’
ভারতে মে মাসে শুরু হয়েছিল মেডিকেল কলেজে ভর্তির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পরীক্ষা। তবে এ পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ ওঠায় তা বাতিল করা হয়। প্রশ্নফাঁস ও পরীক্ষা বাতিল হওয়ায় ভারতের রাজধানী দিল্লিতে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে।
'ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি কাম এন্ট্রান্স টেস্ট (আন্ডারগ্র্যাজুয়েট)', সংক্ষেপে 'নিট-ইউজি' পরীক্ষা ভারতে চিকিৎসাবিজ্ঞান পড়ার প্রবেশদ্বার হিসেবে বিবেচিত হয় এবং সারা দেশের মেডিকেল কলেজে ভর্তির জন্য এই পরীক্ষা বাধ্যতামূলক।
৩ মে ভারতের পাঁচ হাজারের বেশি কেন্দ্রে প্রায় ২২ লাখ ৮০ হাজার পরীক্ষার্থী এই পরীক্ষায় অংশ নেয়।
কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে ক্ষোভের জন্ম দেয় এবং সপ্তাহজুড়ে বিক্ষোভ ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া বাড়তে থাকে।
মঙ্গলবার কেন্দ্রীয় সরকারের জাতীয় পরীক্ষা সংস্থা জানায়, তাদের অনুসন্ধান এবং চলমান তদন্তের ভিত্তিতে 'বর্তমান পরীক্ষাপদ্ধতি বহাল রাখা সম্ভব নয়।'
একইদিনে 'নিট-ইউজি ২০২৬' প্রশ্নফাঁসের তদন্তভার গ্রহণ করেছে সিবিআই। এর আগে রাজস্থান পুলিশের স্পেশাল অপারেশনস গ্রুপ (এসওজি) জানিয়েছিল, একটি 'প্রশ্নফাঁস চক্র' ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্রকে 'গেস পেপার' হিসেবে ছদ্মবেশে বিক্রি করছিল।
৩ মে অনুষ্ঠিত এ পরীক্ষার জীববিজ্ঞানের ৯০টি এবং রসায়নের ৪৫টি প্রশ্ন ওই গেস পেপারে ছিল। রাজস্থান ও হরিয়ানা থেকে শুরু করে মহারাষ্ট্র, উত্তরাখণ্ড ও কেরালা পর্যন্ত বিস্তৃত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে প্রতি কপি ১০ লাখ থেকে ২৫ লাখ রুপিতে এসব পেপার বিক্রি করা হচ্ছিল।
মঙ্গলবার রাতেই জয়পুরে এসওজির সদর দপ্তরে পৌঁছায় সিবিআইয়ের একটি দল, যাতে পুলিশের হাতে আটক সন্দেহভাজনদের জিজ্ঞাসাবাদ করা যায়।
কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থাটি জানিয়েছে, কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উচ্চশিক্ষা বিভাগের অভিযোগের ভিত্তিতে তারা একটি এফআইআর দায়ের করেছে। এতে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার অধীনে ফৌজদারি ষড়যন্ত্র, প্রতারণা, অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ, চুরি এবং প্রমাণ নষ্ট করার অভিযোগ আনা হয়েছে। পাশাপাশি দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন এবং 'পাবলিক এক্সামিনেশনস (প্রিভেনশন অব আনফেয়ার মিনস) আইন, ২০২৪'-এর আওতায়ও অভিযোগ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এসওজির এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, '৪০০টির বেশি প্রশ্ন থাকা একটি গেস পেপারের ভেতরে এসব প্রশ্ন লুকিয়ে রাখা হয়েছিল।'
নাসিকের পুলিশ নান্দগাঁওয়ের ২৭ বছর বয়সী এক ব্যক্তিকে আটক করেছে। ওই ব্যক্তি শনাক্ত হওয়া এড়াতে নিজের চেহারার পরিবর্তন করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
উপ-পুলিশ কমিশনার কিরণকুমার চাভান বলেন, রাজস্থান পুলিশের অনুরোধে নাসিক পুলিশ এই অভিযান চালায়। তিনি বলেন, 'রাজস্থান পুলিশের দল নাসিকে পৌঁছালে তাকে তাদের কাছে হস্তান্তর করা হবে।'
সূত্রগুলো জানিয়েছে, ওই সন্দেহভাজন ব্যক্তি মধ্যপ্রদেশের সেহোরে ব্যাচেলর অব আয়ুর্বেদ মেডিসিন অ্যান্ড সার্জারি কোর্সের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী এবং নাসিকে খণ্ডকালীন পেশাগত পরামর্শক হিসেবে কাজ করতেন।
তিনি ছুটিতে যাওয়ার অজুহাতে শহর ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই পুলিশ তাকে আটক করে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি অজ্ঞাতপরিচয় এক ব্যক্তির কাছ থেকে একটি চালান গ্রহণ করেছিলেন এবং পরে সেটি গুরগাঁওয়ের আরেকজনের কাছে পাঠিয়ে দেন।
এসওজি জানিয়েছে, প্রশ্নপত্রটি জয়পুর, সিকার ও গুরগাঁও থেকে শুরু করে নাসিক ও পুনে পর্যন্ত ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। তদন্তকারীরা এমন বার্তাও উদ্ধার করেছেন, যেখানে শিক্ষার্থীদের বলা হয়েছিল, যথেষ্ট প্রস্তুতি না থাকলেও শুধু গেস পেপারের প্রশ্নগুলো মুখস্থ করলেই তারা পরীক্ষায় ভালো করতে পারবে।
এসওজি সূত্র জানিয়েছে, সিকারের এক বাসিন্দা ৭ মে ওই গেস পেপার হাতে পান এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানান। কিন্তু অভিযোগটি নাকি উপেক্ষা করা হয়। পরে তিনি জাতীয় পরীক্ষা সংস্থাকে ই-মেইল করেন। সংস্থাটি তথ্যটি আরেকটি কেন্দ্রীয় সংস্থার সঙ্গে শেয়ার করে, যারা পরে এসওজির সঙ্গে যোগাযোগ করে।
গেস পেপারের সঙ্গে সরকারি প্রশ্নপত্র মিলিয়ে দেখা হলে একাধিক প্রশ্নের মিল পাওয়া যায়। এসওজির এক সূত্র বলেন, 'আমরা সিকারে একটি দল পাঠাই। তখন আমরা বুঝতে পারি যে প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে জড়িত চক্রটির নেটওয়ার্ক সারা দেশে বিস্তৃত।'
রাজস্থানের তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, প্রাথমিক তদন্তে ধারণা পাওয়া গেছে যে প্রশ্নফাঁসের সূত্রপাত রাজ্যে হয়নি। এসওজির মহাপরিদর্শক অজয় পাল লাম্বা বলেন, হরিয়ানাভিত্তিক এক সন্দেহভাজন ব্যক্তি নাসিকের কারও কাছ থেকে প্রশ্নপত্রটি সংগ্রহ করেছিলেন।
সিবিআই যাদের প্রথমদিকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তাদের মধ্যে ছিলেন সিকারভিত্তিক 'প্রশ্ন সমাধানকারী' ও 'পরামর্শক' রাকেশ মান্দাওয়ারিয়া।
মান্দাওয়ারিয়া যখন বড়াই করে বলছিল যে তার মক্কেলদের সাথে শেয়ার করা সম্ভাব্য প্রশ্নপত্র থেকে ১২০টির মতো প্রশ্ন নিট-ইউজি পরীক্ষায় এসেছে, তখন ৮ মে বিশেষ অভিযান দল তাকে আটক করে। পরবর্তীতে একটি কোচিং সেন্টারের শিক্ষক সিকারের শিল্পনগর থানায় অভিযোগ দায়ের করেন।
এসওজির এক কর্মকর্তা বলেন, 'এ পর্যন্ত আমরা ১৫০ জন শিক্ষার্থী এবং আরও ৭০ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছি।' তিনি আরও বলেন, 'আমাদের সন্দেহ, প্রশ্নগুলো মূলত অল্প কয়েকজন নির্দিষ্ট ক্রেতার কাছে পাঠানোর কথা ছিল। কিন্তু লোভের কারণে কেউ তা নির্ধারিত চক্রের বাইরে ছড়িয়ে দেয়।'
এসওজি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কাউকে গ্রেপ্তার করেনি। মঙ্গলবার গভীর রাত পর্যন্ত সিবিআইয়ের একটি দল এসওজির সদর দপ্তরে অবস্থান করছিল এবং নাসিকের সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে নিজেদের হেফাজতে নেওয়ার বিষয়ে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে সমন্বয় করছিল।