আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ছবি: সংগৃহীত
ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে সার উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। এর ফলে প্রতি সপ্তাহে প্রায় ১০ বিলিয়ন বা ১০০০ কোটি মিল (একজনের একবেলার খাবার) উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে বলে সতর্কবার্তা দিয়েছেন বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম সার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ইয়ারা (Yara)-র প্রধান নির্বাহী (সিইও) সভেইন তোরে হোলসেথার। বিশেষ করে অনুন্নত ও দরিদ্র দেশগুলো এই সংকটের জেরে চরম খাদ্য বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে যাচ্ছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে হোলসেথার জানান, পারস্য উপসাগরে চলমান সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হওয়ায় বিশ্বব্যাপী সার ও এর প্রধান উপকরণগুলোর সরবরাহ ব্যবস্থা মুখ থুবড়ে পড়েছে। সারের ব্যবহার কমে গেলে ফসলের ফলন আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পাবে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যের দাম নিয়ে এক ভয়াবহ প্রতিযোগিতার সৃষ্টি করবে।
সভেইন তোরে হোলসেথার বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতির কারণে বিশ্বে প্রায় ৫ লাখ টন নাইট্রোজেন সার উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। এর প্রভাব সরাসরি গিয়ে পড়বে খাদ্য উৎপাদনের ওপর। আমাদের হিসেবে, সারের অভাবে প্রতি সপ্তাহে ১০ বিলিয়ন মিল (এক বেলার খাবার) উৎপাদন সম্ভব হবে না।’
তিনি আরও সতর্ক করে জানান, জমিতে নাইট্রোজেন সার প্রয়োগ না করলে প্রথম মৌসুমেই কিছু ফসলের ফলন প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। একদিকে জ্বালানি তেল ও ডিজেলের দাম বাড়ায় কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়ছে, অন্যদিকে সেই অনুপাতে ফসলের দাম না বাড়ায় কৃষকেরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরুর পর থেকে সারের দাম প্রায় ৮০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে বিশ্বের ধনী ও দরিদ্র দেশগুলোর মধ্যে খাবার নিয়ে কাড়াকাড়ি শুরু হবে। ইয়ারা প্রধানের মতে, ইউরোপের দেশগুলো চড়া দাম দিয়ে খাদ্য কিনে নেওয়ার সক্ষমতা রাখলেও, এর ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলো বাজার থেকে ছিটকে পড়বে।
তিনি ইউরোপীয় দেশগুলোর উদ্দেশে বলেন, ‘ইউরোপ হয়তো দাম দিয়ে খাবার কিনে পরিস্থিতি সামাল দেবে, কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে আমরা কাদের মুখ থেকে খাবার কেড়ে নিচ্ছি। উন্নয়নশীল দেশগুলোর সেই সক্ষমতা নেই এবং এর ফলে সেখানে ভয়াবহ খাদ্যাভাব ও দুর্ভিক্ষ দেখা দিতে পারে।’
যদিও যুক্তরাজ্য বা উন্নত দেশগুলোতে খাদ্যের সরাসরি ঘাটতি দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা কম, তবে উৎপাদন খরচ বাড়ার কারণে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে সাধারণ মানুষের সাপ্তাহিক বাজার খরচে এর বড় প্রভাব পড়বে। ফুড অ্যান্ড ড্রিংক ফেডারেশন-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছরের শেষের দিকে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশ পর্যন্ত স্পর্শ করতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যুদ্ধের দামামা যত দীর্ঘস্থায়ী হবে, বিশ্বজুড়ে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা তত পাল্লা দিয়ে বাড়বে। সার সংকট আজ কেবল কৃষির সমস্যা নয়, বরং এটি একটি বৈশ্বিক মানবিক সংকটে রূপ নিতে চলেছে।