আন্তর্জাতিক ডেস্ক
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনর ছবি: সংগৃহীত
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুতে গভীর শোক জানিয়েছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। খামেনির হত্যাকাণ্ডকে মানবিক নৈতিকতা ও আন্তর্জাতিক আইনের সব নীতির নিষ্ঠুর লঙ্ঘন আখ্যায়িত করেছেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল গতকাল শনিবার সকালে ইরানজুড়ে হামলা চালায়। ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় তেহরানে নিজের কার্যালয়ে নিহত হন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। তিনি তিন দশকের বেশি সময় ধরে ইরানকে নেতৃত্ব দিয়ে আসছিলেন।
তাঁর মৃত্যুতে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ও খামেনির পরিবারের সদস্যদের প্রতি রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন শোক জানিয়েছেন। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ আজ রোববার এ তথ্য জানান।
রুশ প্রেসিডেন্ট বলেছেন, রাশিয়ায় আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে একজন অসাধারণ রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে স্মরণ করা হবে, যিনি রাশিয়া ও ইরানের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক জোরদারে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছিলেন।
ইরানে সরকার পরিবর্তন হলে ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ে নামতে পারে কারা
ইসরায়েল–যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলায় গতকাল শনিবার ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হয়েছেন। আজ রোববার দেশটির সংবাদমাধ্যমে এ খবর জানানো হয়।
আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর ইরানে নেতৃত্বের শূন্যতা তৈরি হয়েছে। গতকাল হামলায় দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান আবদুল রহিম মুসাভি ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী আজিজ নাসিরজাদেহ নিহত হয়েছেন। ইরানের সরকারি বার্তা সংস্থা ইরনা আজ রোববার এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
এর আগে আলী খামেনির নিরাপত্তা উপদেষ্টা আলী শামখানি এবং ইসলামি বিপ্লবী গার্ডের (আইআরজিসি) প্রধান মোহাম্মদ পাকপুর নিহত হওয়ার খবরও নিশ্চিত করেছে ইরান।
ইরনার প্রতিবেদনে বলা হয়, হামলায় ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর আরও বেশ কয়েকজন কমান্ডার নিহত হয়েছেন। তাঁদের নাম পরে প্রকাশ করা হবে।
সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যু হলে কী হবে, সে ব্যাপারে ইরানের সংবিধানে একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া নির্ধারিত আছে। সে প্রক্রিয়া অনুযায়ী, তিন সদস্যের একটি পর্ষদ দেশটির দায়িত্ব নেবে। এই পর্ষদে থাকবেন ইরানের প্রেসিডেন্ট, বিচার বিভাগের প্রধান ও গার্ডিয়ান কাউন্সিলের একজন ধর্মীয় নেতা।
এ তো গেল সাংবিধানিক প্রক্রিয়া। কিন্তু সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যু, একই সঙ্গে দেশ ও সরকার পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের মৃত্যু ইরানকে আরও একটি বড় সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, দেশটির বর্তমান ইসলামি বিপ্লবী সরকার ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারবে, নাকি অন্য কেউ ইরানের ক্ষমতায় আসতে চলেছে? যদি বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর পরিবর্তন হয়ে যায়, তাহলে কারা আসতে পারে সরকার পরিচালনায়? জেনে নেওয়া যাক তাদের সম্পর্কে—
পিপলস মুজাহিদিন অর্গানাইজেশন
ইরানে একসময় শক্তিশালী বামপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠী ছিল পিপলস মুজাহিদিন অর্গানাইজেশন। ১৯৭০–এর দশকে সশস্ত্র গোষ্ঠীটি শাহ সরকারের নানা স্থাপনা ও মার্কিন লক্ষ্যবস্তুতে বোমা হামলা চালিয়েছিল। পরবর্তীকালে দুর্বল হয়ে পড়লেও গোষ্ঠীর অবশিষ্ট অংশ এখনো ইরানে কয়েকটি এলাকায় প্রভাব বজায় রেখেছে। গোষ্ঠীটি বিপ্লবী সরকারকে উৎখাতের পক্ষে সমর্থন দিয়েছিল।
ফারসি নাম মুজাহিদিন-এ খালক অর্গানাইজেশন; এই গোষ্ঠী ১৯৭৯ সালে ইরানের শাহকে উৎখাত করে ইম্পেরিয়াল স্টেট অব ইরানের পরিবর্তে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান প্রতিষ্ঠার সময় অন্যান্য গোষ্ঠীর সঙ্গে একযোগে কাজ করেছিল, পরে তাদের সঙ্গে মতবিরোধে জড়িয়ে পড়ে।
গোষ্ঠীটি ১৯৮০ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত চলা ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় ইরাকের পক্ষ নেওয়ায় দ্রুতই ইরানের ভেতর তাদের বহু শত্রু তৈরি হয়।
মুজাহিদিনের সাবেক নেতা মাসুদ রাজাভি বর্তমানে নির্বাসনে রয়েছেন। ২০ বছরের বেশি সময় ধরে তাঁকে জনসম্মুখে দেখা যায়নি। তাঁর স্ত্রী মরিয়ম রাজাভি এখন গোষ্ঠীটির নেতৃত্বে আছেন। অনেক বছর ধরেই ইরানের সীমার ভেতরে তাদের কার্যক্রমের কোনো স্পষ্ট চিহ্ন দেখায়নি।
তবে মরিয়ম রাজাভির নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠীটি ইরানের জাতীয় প্রতিরোধ পরিষদের (এনসিআরআই) পেছনের প্রধান শক্তি, অনেক পশ্চিমা দেশে যাদের সক্রিয় উপস্থিতি রয়েছে।
রাজতন্ত্র
১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের মাধ্যমে ইরানে শাহ পাহলভি রাজবংশের শাসনের অবসান হয় এবং ইরান ইসলামি প্রজাতন্ত্রে রূপান্তরিত হয়। বিপ্লবের মধ্যে ইরানের শেষ শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভি দেশ ছেড়ে পালিয়ে মিসরে আশ্রয় নেন। সেখানে ১৯৮০ সালে তিনি মারা যান।
মোহাম্মদ পাহলভির ছেলে রেজা পাহলভি বিপ্লবের সময় ইরানি সিংহাসনের উত্তরাধিকারী ছিলেন। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন। সেখান থেকে তিনি ইরানে শান্তিপূর্ণ উপায়ে সরকার পরিবর্তন এবং নতুন সরকারের জন্য গণভোট আয়োজনের আহ্বান জানাচ্ছেন।
ইসরায়েল–যুক্তরাষ্ট্র যৌথ হামলায় আলী খামেনি নিহত হওয়ার খবর প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে রেজা পাহলভি লেখেন, ‘তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে, ইসলামি প্রজাতন্ত্র কার্যত সমাপ্তি সীমায় পৌঁছে গেছে এবং খুব শিগগির এটি ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হবে’।
প্রবাসী ইরানিদের ভেতর রেজা পাহলভির সমর্থকগোষ্ঠী রয়েছে। তবে ইরানের ভেতরে তাঁর জনপ্রিয়তা আছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। ইরানে রাজতন্ত্রপন্থী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যেও অনেক বিভাজন রয়েছে।
জাতিগত সংখ্যালঘু গোষ্ঠী
ইরানের সুন্নি মুসলিম কুর্দি ও বালুচ সংখ্যালঘুরা দীর্ঘদিন ধরেই তেহরানের ফারসিভাষী ও শিয়া সরকারের বিরোধিতা প্রকাশ করে আসছে।
কুর্দিরা ইরানে সংখ্যালঘু হলেও দেশটির পশ্চিমাঞ্চলে তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ। নিজেদের অঞ্চলগুলোয় কুর্দিরা সব সময়ই সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে সক্রিয় বিদ্রোহ চালিয়ে আসছে।
অন্যদিকে, পাকিস্তান সীমান্তবর্তী বেলুচিস্তানে সুন্নি আলেমদের সমর্থক বিরোধীদের থেকে শুরু করে আল-কায়েদার সঙ্গে যুক্ত সশস্ত্র জিহাদি গোষ্ঠীও রয়েছে।
ইসলামি বিপ্লবী সরকারে বিরুদ্ধে ইরানে যেসব বিক্ষোভ হয়েছে, প্রায়ই কুর্দি ও বালুচ অঞ্চলে সেগুলো সবচেয়ে তীব্র ছিল। তবে ওই দুই অঞ্চলে তেহরানের শাসনের বিরুদ্ধে কোনো শক্তিশালী বা একক প্রতিরোধ গড়ে ওঠেনি।
বিক্ষোভ নেতৃত্ব
গত কয়েক দশকে বিভিন্ন সময়ে ইরানে ইসলামি বিপ্লবী সরকারের বিরুদ্ধে ব্যাপক গণবিক্ষোভ হয়েছে, এসব বিক্ষোভে নেতৃত্ব দেওয়া ব্যক্তিরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় চলে আসতে পারেন।
মুদ্রার অস্বাভাবিক অবমূল্যায়ন এবং চরম অর্থনৈতিক সংকটের জেরে গত ২৮ ডিসেম্বর শুরু হয়ে পুরো জানুয়ারি ইরানে ব্যাপক গণবিক্ষোভ হয়েছে। বিক্ষোভে কয়েক হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন।
খামেনির মৃত্যুর পর আবারও গণবিক্ষোভ ও অস্থিরতা শুরু হবে কি না, তা এখনই বলা সম্ভব নয়। যদি হয়, তবে তেহরানের প্রতিক্রিয়া জানুয়ারির মতো শক্তিশালী হবে কি না, কে নেতৃত্ব দেবেন, তা–ও এখন বলা যাচ্ছে না। ইরানে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে গণবিক্ষোভের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে।
ক্ষমতার দ্বন্দ্ব
খামেনির শূন্যস্থান পূরণ নিয়ে ইরানের বর্তমান সরকারের ভেতরও ক্ষমতাদখলের তীব্র লড়াই শুরু হয়ে যেতে পারে।
ধর্মীয় উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিয়ে প্রভাবশালী ইসলামি বিপ্লবী গার্ড অল্প সময়ের মধ্যে সামরিক আইন জারি করতে এবং দেশের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে।
একটি সুস্পষ্ট পরিকল্পনা ছাড়া কোনো দেশে একটি সরকার উৎখাত করলে তার পরিণতি কতটা বিপজ্জনক হতে পারে, তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ আজকের আফগানিস্তান ও লিবিয়া।