নিউইয়র্ক টাইমস
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ছবি: সংগৃহীত
‘আমেরিকা ফার্স্ট’ (আমেরিকা প্রথম) স্লোগান তুলে একসময় বিদেশে যুদ্ধ থেকে দূরে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এক দশক পর সেই ট্রাম্পই এখন বিদেশে মার্কিন সামরিক শক্তি প্রয়োগে আগের চেয়ে অনেক বেশি আগ্রহী।
২০১৬ সালে প্রথম প্রেসিডেন্ট পদে লড়াইয়ের সময় ট্রাম্প তৎকালীন সময়ে মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেছিলেন। তাঁর ভাষায়, ‘শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন একটি প্রমাণিত, সম্পূর্ণ ব্যর্থ নীতি।’ তিনি বলেছিলেন, ‘বিদেশি সরকার উৎখাতে ছুটে বেড়ানো আমরা বন্ধ করব।’
২০২৪ সালের নির্বাচনে ট্রাম্প গর্ব করে বলেছিলেন, তাঁর আমলে ‘কোনো নতুন যুদ্ধ শুরু হয়নি।’ একই সঙ্গে সতর্ক করেছিলেন, কমলা হ্যারিস জয়ী হলে ‘নিশ্চিতভাবেই আমাদের তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে জড়াবেন’ এবং আমেরিকানদের ‘অজানা কোনো দেশের যুদ্ধে’ পাঠাবেন।
কিন্তু মাত্র এক বছর পর পরিস্থিতি পুরোপুরি ভিন্ন। ট্রাম্প এখন নিজেই বিদেশি সরকার উৎখাতের পথে এগোচ্ছেন। মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি যুদ্ধে মার্কিন সেনাদের পাঠাচ্ছেন। নিজেকে ‘শান্তির প্রেসিডেন্ট’ বলা ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে পূর্ণ মার্কিন সামরিক শক্তি ব্যবহার করে সেখানে সরকার পতনের চেষ্টা করছেন।
২০১৬ সালের ট্রাম্প ও ২০২৬ সালের ট্রাম্প—বিদেশে হস্তক্ষেপের প্রশ্নে দুজন যেন ভিন্ন মানুষ। ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এলেও এখন তিনি ক্রমেই বিদেশে শক্তি প্রয়োগে স্বচ্ছন্দ। গতকাল শনিবার ইরানে বোমা হামলা ছিল তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদে অষ্টম সামরিক অভিযান। এর আগে তিনি ভেনেজুয়েলার সরকারকে কার্যত অচল করে দেন এবং কিউবার শাসককে উৎখাতের হুমকিও দেন।
অভিযোগের দীর্ঘ তালিকা, কিন্তু ‘এখন কেন’ প্রশ্নের উত্তর নেই
মধ্যরাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া ভিডিও বার্তায় ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে প্রায় অর্ধশতাব্দীর জমে থাকা অভিযোগের তালিকা তুলে ধরেন। এর মধ্যে ছিল—পারমাণবিক অস্ত্র ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ওপর হামলা চালানো গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন, ১৯৭৯ সালে তেহরানে মার্কিন দূতাবাস দখল এবং সাম্প্রতিক সময়ে ইরানে বিক্ষোভকারীদের হত্যা।
তবে কেন এই মুহূর্তে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হলো, আগে নয় কেন—সে প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর ট্রাম্প দেননি। তাঁর অবস্থান কেন বদলাল, তাও ব্যাখ্যা করেননি।
ইরানের হুমকি নিয়েও ট্রাম্পের বক্তব্যে অসংগতি রয়েছে। গত গ্রীষ্মে ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথ হামলার পর তিনি দাবি করেছিলেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস’ করা হয়েছে। গত মঙ্গলবারের স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণেও একই দাবি করেন। গতকাল শনিবার ভোরের ভিডিওতেও সে কথা আবার বলেন। কিন্তু যদি কর্মসূচি ধ্বংস হয়ে থাকে, তাহলে আবার হামলার প্রয়োজন কেন—এ প্রশ্নের জবাব পাওয়া যায়নি।
সরাসরি শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের আহ্বান
এবার ট্রাম্প সরাসরি ইরানে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়েছেন। ইরানিদের উদ্দেশে উসকানি দিয়ে তিনি বলেছেন, ‘আমরা কাজ শেষ হলে আপনারাই আপনাদের সরকার দখল করুন। সেটি আপনাদেরই হবে।’
গতকাল শনিবার বিকেলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি দাবি করেন, হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হয়েছেন। তাঁকে তিনি ইতিহাসের ‘সবচেয়ে খারাপ মানুষ’ বলে উল্লেখ করেন।
তবে ইরানিরা কীভাবে সরকারের নিয়ন্ত্রণ নেবে, সে বিষয়ে তাঁর বক্তব্য স্পষ্ট নয়। তিনি লেখেন, পুলিশ ও বিপ্লবী গার্ড বাহিনী যেন ‘শান্তিপূর্ণভাবে ইরানি দেশপ্রেমিকদের সঙ্গে এক হয়ে দেশকে তার প্রাপ্য অবস্থানে ফিরিয়ে আনে।’
অথচ কয়েক সপ্তাহ আগেও এই বাহিনীই রাস্তায় বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান চালিয়েছে।
সমালোচনা ও সমর্থন—দুই দিকেই সাড়া
ক্যাটো ইনস্টিটিউটের গবেষক ব্রেন্ডান পি বাক বলেন, ২০১৬ সালে ট্রাম্প যে নীতির বিরুদ্ধে প্রচার করেছিলেন, এখন সেটিই তাঁর ঘোষিত লক্ষ্য। আগে তিনি সীমিত বিমান হামলা বা গোপন অভিযানের মাধ্যমে দ্রুত ফল পাওয়ার চেষ্টা করতেন। কিন্তু ইরানে হামলা সেই সূত্র ভেঙে দিয়েছে—এটি অজানার দিকে বড় ঝাঁপ।
সমালোচকেরা দ্রুত ট্রাম্পের পুরোনো বক্তব্য সামনে আনেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে পুরোনো মন্তব্য—
২০১২ সালে ট্রাম্প লিখেছিলেন, ‘ওবামার জনপ্রিয়তা কমছে—দেখবেন তিনি লিবিয়া বা ইরানে হামলা করবেন।’
২০১৩ সালে বলেন, ‘আমি আগেই বলেছিলাম, ঠিকমতো আলোচনা করতে না পারায় ওবামা ইরানে হামলা করবেন।’
২০১৬ সালে ঘোষণা দেন, ‘অবিবেচক ও ব্যয়বহুল শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের নীতি বন্ধ করব।’
২০২৪ সালের নির্বাচনী রাতে বলেন, ‘আমি যুদ্ধ শুরু করব না, আমি যুদ্ধ থামাব।’
ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের পুরোনো বক্তব্যও আলোচনায় আসে। ২০২৪ সালে স্টিফেন মিলার লিখেছিলেন, ‘কমলা = তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ। ট্রাম্প = শান্তি।’
২০২৫ সালে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেছিলেন, ‘যুদ্ধ দপ্তর শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের যুদ্ধে জড়াবে না।’
গতকাল শনিবার শুধু উদারপন্থীরা নয়, ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’ আন্দোলনের অনেক নেতাও ইরানে হামলার সমালোচনা করেন।
ডানপন্থী পডকাস্টার টাকার কার্লসন ও সাবেক কংগ্রেস সদস্য মার্জরি টেইলর গ্রিন অভিযোগ করেন, ট্রাম্প নব্য-রক্ষণশীলদের খপ্পরে পড়েছেন।
অন্যদিকে রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য মার্লিন স্টুটজম্যান বলেন, ইরানে হামলা ভবিষ্যতের বড় হুমকি ঠেকাবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে সহায়ক একটি নতুন মধ্যপ্রাচ্যের পথ খুলে দেবে। তাঁর ভাষায়, ‘যাঁরা বলছেন ট্রাম্প যুদ্ধ করবেন না বলেছিলেন—তিনি দীর্ঘ মেয়াদে আমাদের যুদ্ধ থেকে দূরে রাখছেন।’
ইরানবিষয়ক কঠোর নীতির সমর্থক মার্ক ডুবোভিটজ বলেন, ট্রাম্প সরাসরি শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের ঘোষণা দেননি, বরং বিষয়টি ইরানি জনগণের ওপর ছেড়ে দিয়েছেন। তাঁর মতে, ‘স্থায়ী সমাধান কেবল সামরিক হামলা নয়, শাসনব্যবস্থার অবসান।’ তবে তিনি স্বীকার করেন, ‘আজ রাতে ট্রাম্প সেটিকে অগ্রাধিকার দেননি।’
প্রথম ও দ্বিতীয় মেয়াদ—পার্থক্য স্পষ্ট
ট্রাম্পের প্রথম ও দ্বিতীয় মেয়াদের মধ্যে বড় পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। এখন তিনি ক্ষমতার ব্যবহার নিয়ে অনেক বেশি স্বচ্ছন্দ। প্রথম মেয়াদে যেসব সিদ্ধান্তে তিনি দ্বিধায় ছিলেন, এখন তা সহজেই নিচ্ছেন—হোক তা বিদেশে সামরিক অভিযান, দেশে ফেডারেল বাহিনী মোতায়েন, বিরোধীদের বিরুদ্ধে মামলা বা বিশ্বজুড়ে শুল্ক আরোপ।
প্রথম মেয়াদে ট্রাম্পের দলে ছিলেন অভিজ্ঞ সামরিক ও প্রশাসনিক কর্মকর্তারা, যারা অনেক সময় তাঁকে সংযত করতেন। এবার সেই ধরনের ব্যক্তিত্ব অনুপস্থিত। বরং তাঁর চারপাশে আছেন এমন উপদেষ্টারা, যাঁরা প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নেই বেশি মনোযোগী।
২০১৭ সালে ট্রাম্প কোনো সামরিক বা সরকারি অভিজ্ঞতা ছাড়াই প্রেসিডেন্ট হন। তিনি ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে যুদ্ধ জোরদার করেন, তবে কখনো কখনো হামলা থেকে সরে আসেন। একবার ইরানে পাল্টা হামলা শুরু হওয়ার কয়েক মিনিট আগে, তা বাতিলও করেন।
ট্রাম্প দক্ষিণ কোরিয়া, জার্মানি ও সিরিয়া থেকে সেনা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেন। আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহারের জন্য তালেবানের সঙ্গে চুক্তি করেন, যা পরে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বাস্তবায়ন করেন। অবশ্য সেটা এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছিল।
তবে ২০২০ সালে ইরানের জেনারেল কাসেম সোলাইমানিকে হত্যার পর বড় আকারের পাল্টা প্রতিক্রিয়া না হওয়ায় ট্রাম্প আরও সাহস পান। দ্বিতীয় মেয়াদে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে ধরার অভিযানও তাঁকে আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে।
সামনে কী
এই ভূরাজনৈতিক ঝুঁকির ফল নির্ভর করবে পরবর্তী পরিস্থিতির ওপর। সফল হলে ভাঙা প্রতিশ্রুতিও ভোটাররা ভুলে যেতে পারেন। তেহরানের বর্তমান শাসনের জনপ্রিয়তা কম। খামেনির মৃত্যুর খবরে রাস্তায় উল্লাসের ভিডিও দেখা গেছে। খামেনি সরকারের বাকি শীর্ষ কর্মকর্তাদের সরাতে পারলে তবে তা ট্রাম্পের জন্য বড় সাফল্য হবে।
তবে আফগানিস্তান ও ইরাকের মতো দীর্ঘস্থায়ী স্থলযুদ্ধে ট্রাম্প জড়াননি। আপাতত আকাশপথের শক্তি ব্যবহারে সীমাবদ্ধ থাকতে চাইছেন।
তবু ট্রাম্পের নিজের সতর্কবার্তায় মার্কিন সেনাদের হতাহতের আশঙ্কা রয়েছে। তেহরানের সরকার পতন হলেও নতুন সরকার যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী হতে পারে, কিংবা লিবিয়ার মতো বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে।