আধৃুনিক নির্মাণ শৈলিতে তৈরি ‘হযরত আবু বকর সিদ্দিকী (রা.) জামে মসজিদ’ ছবি: ধ্রুব নিউজ
যশোর শহর থেকে মাত্র ১৭ কিলোমিটার দূরে ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার ইতিহাসপ্রসিদ্ধ জনপদ বারোবাজার। এই বারোবাজারের নাম শুনলেই চোখে ভেসে ওঠে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ইসলাম প্রচারের সুপ্রাচীন ইতিহাস। ঐতিহ্যবাহী এই জনপদের মিঠাপুকুর এলাকায়, গাজী কালু চম্পাবতীর মাজারে যাওয়ার পথে চোখ জুড়িয়ে যায় এক অপূর্ব আধুনিক স্থাপত্যশৈলীতে। দৃষ্টিনন্দন ও হৃদয়জুড়ানো অধ্যাত্মিক প্রশান্তির এই নিদর্শনের নাম—‘হযরত আবু বকর সিদ্দিকী (রা.) জামে মসজিদ’।
মসজিদটির বাহ্যিক অবয়বে আধুনিক জ্যামিতিক নকশা ও ইসলামী স্থাপত্যের সুনিপুণ সংমিশ্রণ ফুটে উঠেছে। সম্পূর্ণ শুভ্র রঙের দ্বিতল এই ভবনের সামনের ফ্রন্টাল প্রবেশদ্বারটিতে রয়েছে কোনাকুনি খিলানযুক্ত উঁচু গেট এবং কালো গ্লাসের সুবিশাল প্যানেল। ভবনের উপরিভাগে শোভা পাচ্ছে আধুনিক প্রযুক্তিতে নির্মিত শ্বেতশুভ্র গম্বুজ এবং ওপরের অংশে ক্যালিগ্রাফিতে খোদাই করা সোনালী বর্ণের ‘আল্লাহ’ ও ‘মুহাম্মদ’ (সা.) লেখা ক্যালিগ্রাফি প্যানেল। পাশেই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে দৃষ্টিনন্দন সাদা একটি মিনার। বহুতল জানালার কালো কাঁচ ও সাদা দেয়ালের বৈপরীত্য এবং এর প্রবেশপথের সিঁড়িগুলো পুরো স্থাপনায় এনে দিয়েছে রাজকীয় আমেজ।

মসজিদটির ভেতরের প্রাঙ্গণও সমপরিমাণ নান্দনিক ও প্রশান্তিময়। সুবিশাল নামাজঘরের ছাদ ধরে রেখেছে বিশেষ ধরনের ফানেল বা ক্যালিগ্রাফিযুক্ত ছাতার আকৃতির স্তম্ভ । সাদা মার্বেল টাইলস ও মেঝের সুবিন্যস্ত সজ্জা নামাজ আদায়ের পরিবেশকে করেছে স্নিগ্ধ ও আরামদায়ক। মেহরাবের অংশে সোনালী ও জ্যামিতিক অলংকরণের সূক্ষ্ম কাজ দেখা যায়। ছাদে ঝুলন্ত আধুনিক সিলিং ফ্যান ও চমৎকার আলোকসজ্জার ব্যবস্থা থাকার পাশাপাশি চারপাশের সুবিশাল জানালা দিয়ে প্রচুর প্রাকৃতিক আলো-বাতাস প্রবেশের ব্যবস্থা রয়েছে।

বারোবাজার এমনিতেই ইতিহাস ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের জন্য বিখ্যাত। ইতিহাসপ্রেমীদের কাছে সুপরিচিত ‘গাড়ার মসজিদ’, যেখানে ইসলাম প্রচারে আসা ১২ জন আউলিয়া একত্রিত হয়েছিলেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে। সেখান থেকেই বাগেরহাটের হযরত খানজাহান আলী (রহ.) ও যশোরের হযরত গরীব শাহ্ (রহ.)-সহ সাধক আউলিয়াগণ ছড়িয়ে পড়েছিলেন বিভিন্ন অঞ্চলে। ঐতিহ্যবাহী এই বারোবাজারে আজও প্রায় ১০টি প্রত্নতাত্ত্বিক মসজিদের অস্তিত্ব পাওয়া যায়—যার কোনটি এখনও ব্যবহৃত হচ্ছে, আবার কোনটি কালের গর্ভে হারিয়ে স্মৃতিচিহ্ন হয়ে রয়েছে। পাশাপাশি আউলিয়াদের খনন করা অসংখ্য বড় বড় দিঘি ও জলাশয় এবং গাজী কালু চম্পাবতীর মাজার কিংবা চম্পাবতীর পিতার রাজবাড়ির পরিক্রমণ ইতিহাস পিয়াসীদের কাছে সবসময়ই আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু।

সেই সুপ্রাচীন ঐতিহ্যের ধারক বারোবাজারের বুকে যোগ হয়েছে এই আধুনিক স্থাপত্যের নতুন স্মারক। প্রায় সাড় সাত কোটি টাকা ব্যয়ে সম্পূর্ণ ব্যক্তি উদ্যোগে নির্মিত হয়েছে এই স্নিগ্ধ ও মনোমুগ্ধকর মসজিদটি। দীর্ঘ নির্মাণকাজ শেষে ২০২৬ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি মসজিদটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সূত্রে জানা গেছে, বারোবাজার এলাকার এক আমেরিকা প্রবাসী পরিবার তাদের পৈতৃক জমিতে এই নান্দনিক মসজিদটি নির্মাণ করেছেন। প্রবাসীর বিস্তারিত পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক মসজিদের ইমাম হাফেজ আল মামুন শুধু জানান, ‘আমেরিকা প্রবাসী আব্দুল খালেক সাহেব তার স্ত্রীর ইচ্ছায় শ্বশুরের জমিতে ২০২৩ সালে মসজিদটির নির্মাণকাজ শুরু করেন। ২০২৬ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি এর উদ্বোধন করা হয়।
মসজিদটির একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো—এখানে কোনো দানবাক্স রাখা হয়নি। ইমাম, মুয়াজ্জিনের বেতন থেকে শুরু করে আলো-বাতাস, রক্ষণাবেক্ষণ ও যাবতীয় পরিচালন ব্যয় বহন করেন প্রতিষ্ঠাতা ।
চোখ জুড়ানো নান্দনিকতা, আধুনিক সুযোগ-সুবিধা এবং আত্মিক প্রশান্তির এক অনন্য ঠিকানা হিসেবে ‘হযরত আবু বকর সিদ্দিকী (রা.) জামে মসজিদ’ এখন বারোবাজারের অন্যতম আকর্ষণ হয়ে উঠেছে।