সোমবার, ১ ডিসেম্বর ২০২৫
Ad for sale 100 x 870 Position (1)
Position (1)

❒ বিচারহীনতায় পার হলো আবারও ২৩  নভেম্বর

হাবিবুল্লাহ-কামরুল হত্যার যাবে না ভোলা রক্তমাখা স্মৃতি

ধ্রুব রিপোর্ট ধ্রুব রিপোর্ট
প্রকাশ : সোমবার, ২৪ নভেম্বর,২০২৫, ০১:১৮ পিএম
আপডেট : মঙ্গলবার, ২৫ নভেম্বর,২০২৫, ০৮:৩৩ এ এম
হাবিবুল্লাহ-কামরুল হত্যার যাবে না ভোলা রক্তমাখা স্মৃতি

❒ হাবিবুল্লাহ ও কামরুল হাসান ছবি: সংগৃহীত

২৩ নভেম্বর। সালটা ২০১৫। দগদগে রক্তে এম এম কলেজের ইতিহাসে খোদিত হলো তারিখটি। ১০ বছর পরে এসে জ্বল-জ্বলে পোস্টার হয়ে আবারও ভেসে উঠেছে দুটি নাম-হাবিবুল্লাহ হোসাইন ও কামরুল হাসান। তাদের রক্তমাখা সমৃতি কখনও ভোলার নয়।

ভরদুপুরে পৈশাচিক উল্লাসে হত্যা করা হয়েছিল মেধাবী দুজনকে। বর্ববরতা কাকে বলে সেদিন যারা ক্যাম্পাসে ছিল-তারা সাক্ষী থেকেছে। দুই মেধাবী ছাত্রকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হলো ‘ টর্চার সেল’র দিকে। যারা নিয়ে গেলো তারা মানুষ নামধারী একদল হায়েনা। চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া কারোর যেন কিচ্ছু করার নেই!

 সময় গড়িয়েছে, কিন্তু বিচার হয়নি এই অপরাধের। পুলিশের হয়রানিতে বিচারের প্রত্যাশা ছেড়ে স্বজনরা পালিয়ে বেড়িয়েছে সেদিনগুলোতে। ঘটনাটি দেশকে নাড়িয়ে দেওয়া আবরার হত্যাকাণ্ডের ঠিক চার বছর আগের।

কী ঘটেছিল সেদিন

দুপুরের খাবারটা তখনও শেষ করতে পারেননি তারা। মুখের গ্রাস মুখেই রয়ে গেছে। ঠিক তখনই দানবীয় আক্রোশে ভাতের পাত থেকে ছোঁ মেরে দুই শিক্ষার্থীকে তুলে নিল ছাত্রলীগ নামধারী একদল পশু। কোনো মানবিক বা ছাত্রসুলভ আচরণ নয়, সেদিন ক্যাম্পাসে দেখা গিয়েছিল বর্তমানে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের এক ভয়াল ও খুনে রূপ।

শত শত শিক্ষার্থীর চোখের সামনে দিয়ে দুই মেধাবী ছাত্রকে পিটিয়ে, টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে শহীদ আসাদ হলের সেই কুখ্যাত ’সেলে’।

২০১ নম্বর কক্ষের সেই স্মৃতি

আসাদ হলের কক্ষ নম্বর ২০১। যা ছাত্রলীগের ‘টর্চার সেল’ হিসেবে পরিচিত। ছাত্রলীগের হেন কোনো অপরাধ নেই,  যার সাক্ষী নয় কক্ষটি। মেধাবী সেই দুটি ছাত্রকে আনা হলো। বন্ধ করা হলো দরোজা। চলল বর্বরোচিত নির্যাতন। লোহার রড, হাতুড়ি আর হকিস্টিকের ক্রমাগত আঘাতে থেঁতলে দেওয়া হলো হাড়-মাংস।

প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, সেদিন ছেলে দুটো বাঁচার জন্য কী আকুতি না করেছিল! কিন্তু তাদের মন গলে নি। যতবার আর্তনাদ, ছাত্রলীগের ক্যাডাররা ততবারই উল্লাসে মেতে উঠেছে, করেছে আঘাত উন্মত্ততায়। ১০ বছর আগে ভরদুপুরে ঘটে যাওয়া সেই ঘটনা প্রকৃতি ও প্রত্যক্ষদর্শীদের মনে হৃদয় খুঁড়ে জাগিয়ে দেয় একটা সত্য―ক্ষমতার দম্ভে কতটা নৃশংস হতে পারে ছাত্রলীগ নামের ছাত্রসংগঠন!

বুয়েটের আবরার ফাহাদকে রাতের আঁধারে পিটিয়ে মারার ঘটনা কাঁপিয়ে দিয়েছিল পুরো দেশকে। আবরারের মৃত্যুর চার বছর আগে, ২০১৫ সালে যশোর সাক্ষী হলো এর চেয়েও পৈশাচিক এক ঘটনার। কেউ প্রতিবাদ জানালো না, মুখে কুলুপ এটে থাকল সবাই, কারোর যেন কিচ্ছুটি করার নেই! আবরারকে খুন করা হয়েছিল রাতের আঁধারে, আর যশোরে দুই মেধাবী ছাত্রকে পিটিয়ে হত্যা করা হয় ভরদুপুরে, প্রকাশ্যে—শত শত শিক্ষার্থীর সামনে।

আজ ১০ বছর পেরিয়ে গেলেও সেই রক্তের দাগ শুকায়নি, বিচার পাননি দুই হতভাগা পিতা। পুলিশের খাতায় খুনিরা আজও ‘অজ্ঞাত’, যদিও তারা প্রকাশ্যে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছে বছরের পর বছর।

২৩ নভেম্বর ও ঘটনা পরম্পরা

২০১৫ সালের ২৩ নভেম্বর। ঘড়িতে তখন দুপুর ২টা। যশোর সরকারি এমএম কলেজের অদূরে ‘আশিক ছাত্রাবাসে’ দুপুরের খাবার খাচ্ছিলেন অর্থনীতি বিভাগের তৃতীয় বর্ষের দুই ছাত্র—হাবিবুল্লাহ হোসাইন ও আলী রেজা রাজু। ভাতের থালায় হাত দিতেই সেখানে হানা দেয় ছাত্রলীগ নামধারী হায়েনার দল।

নুর ইসলাম, ছালছাবিল আহমেদ জিসান, তৌহিদ, আরিফুল ইসলাম রিয়াদ, রাশেদ খান, শাহজামালসহ একদল ক্যাডার তাদেরকে ভাতের পাত থেকে তুলে মারতে মারতে মোটরসাইকেলে করে নিয়ে যায় এমএম কলেজের শহীদ আসাদ হলের সেই অভিশপ্ত ২০১ নম্বর কক্ষে—যা পরিচিত ছিল ‘টর্চার সেল’ নামে। সেখানে তাদের সঙ্গে যোগ দেয় সন্ত্রাসী সংগঠনটির নেতা আনোয়ার হোসেন বিপুল, রওশন ইকবাল শাহী, নাহিদুর রহমান, ইয়াসিন মোহাম্মদ কাজল, অন্তর দে শুভ, আহসানুল করিম রহমান, সজিবুর রহমান, মেহেদি হাসান রনি, বি এম জাহাঙ্গীর কবীরসহ একদল সশস্ত্র তরুণ।

কিছুক্ষণের মধ্যেই ‘নির্ঝর’ ছাত্রাবাস থেকে ধরে আনা হয় আরও দুই শিক্ষার্থী—কামরুল হাসান ও আব্দুল্লাহ আল-মামুনকে। এরপর শুরু হয় মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন। লোহার রড, হাতুড়ি, হকিস্টিক দিয়ে পিটিয়ে থেঁতলে দেওয়া হয় চারটি শরীর। রাজু কোনোমতে পালিয়ে বাঁচলেও, বাঁচতে পারেননি হাবিবুল্লাহ ও কামরুল। মৃত ভেবে হাবিবুল্লাহকে হলের সামনের খোলা জায়গায় ছুড়ে ফেলে চলে যায় ঘাতকরা।

পুলিশ যখন আসাদ হল থেকে তাঁদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নেয়, ততক্ষণে হাবিবুল্লাহর পৃথিবী অন্ধকার হয়ে এসেছে। হাসপাতালেই তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।

অন্যদিকে, কামরুল হাসানকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় ঢাকায় রেফার করা হয়। অ্যাম্বুলেন্সে করে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা কামরুলকে নিয়ে স্বজনরা যখন ছুটছিলেন, তখন রাত ১২টার পর পাটুরিয়া ঘাটে নিভে যায় তার জীবনপ্রদীপ। দুই মেধাবী ছাত্র—যাদের এসএসসি ও এইচএসসিতে ছিল জিপিএ-৫—মুহূর্তেই হয়ে গেলেন লাশ।

পুলিশ যা করেছিল

ঘটনার পর পুলিশ যা করেছিল, তা ছিল ‘কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা’। খুনিদের গ্রেপ্তার না করে উল্টো মারপিটের শিকার হয়ে বেঁচে যাওয়া আল-মামুনকে নাশকতা মামলায় জেলে পাঠায় পুলিশ। দীর্ঘদিন তাঁকে পঙ্গু শরীরে জেল খাটতে হয়। পঙ্গুত্ব এখন তার সঙ্গী।

নিহতদের পরিবারের অভিযোগ আমলে না নিয়ে পুলিশ নিজেই বাদী হয়ে মামলা করে। সেই মামলায় নিহতদের ‘শিবির কর্মী’ আখ্যা দেওয়া হয়, আর চিহ্নিত খুনিদের নাম বাদ দিয়ে আসামির কলামে লেখা হয় ‘২০-২৫ জন অজ্ঞাতনামা দুষ্কৃতকারী’।

২০১৭ সালে পুলিশ আদালতে চূড়ান্ত রিপোর্ট দিয়ে বলে—‘আসামি শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।’ অথচ অভিযুক্তরা তখন ক্যাম্পাসে মিছিল করছে, স্লোগান দিচ্ছে।

কামরুলের ভাই ইব্রাহিম হোসেন বিচার চাইতে গিয়ে উল্টো হুমকির মুখে পড়েন। জীবন বাঁচাতে নিজের ব্যবসা ও পরিবার ছেড়ে পাড়ি জমান মালয়েশিয়ায়।

হাবিবুল্লাহর বাবা ডা. নিয়ামত আলী একসময় বিচারের আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন। চোখের পানি মুছে তিনি বলেছিলেন, ‘প্রথম দিকে বিচার আশা করেছিলাম। এখন আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিয়েছি।’

বিচারের আশা

দীর্ঘ ১০ বছর পর, দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে বিচার পাওয়ার ক্ষীণ আশা জেগেছে পরিবারগুলোর কাছে। ২০২৫ সালের ১২ সেপ্টেম্বর নিহত হাবিবুল্লাহর বাবা আদালতে ‘নারাজি পিটিশন’ দাখিল করেছেন। আইনজীবী আলমগীর সিদ্দিকী জানিয়েছেন, তৎকালীন সময়ে পুলিশি তদন্ত ছিল নিছক তামাশা। এখন তারা ন্যায়বিচারের স্বার্থে পুনঃতদন্ত চান।

যশোরের আকাশ-বাতাস আজও সেই দুই তরুণের আর্তনাদে ভারী। আবরার ফাহাদের স্বজনরা বিচার চেয়ে বিচার পেয়েছেন। সেই পথ ধরে চেয়ে আছে কামরুল আর হাবিবুল্লাহর মায়েরা। বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে খুনীদের পাকড়াও করে আদৌ কি বিচারের মুখোমুখি করা যাবে? পুলিশের খাতায় কি খুনীরা অজ্ঞাতই থেকে যাবে? ২৩ নভেম্বরে আবারও একটি বড় প্রশ্ন থেকে গেল। 

 

 

ধ্রুব নিউজের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

💬 Comments

Login | Register
Ad for sale 225 x 270 Position (2)
Position (2)