Ad for sale 990 x 90 Position (1)
Position (1)
বুধবার, ১৩ মে ২০২৬
Ad for sale 870 x 100 Position (2)
Position (2)

সরকার নির্ধারিত দাম ও সিন্ডিকেট না থাকলে ২০০ টাকা কমে গ্যাস পেতেন ভোক্তারা

তহীদ মনি তহীদ মনি
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ১২ মে,২০২৬, ০৬:৫১ পিএম
আপডেট : মঙ্গলবার, ১২ মে,২০২৬, ১১:৫৬ পিএম
সরকার নির্ধারিত দাম ও সিন্ডিকেট না থাকলে ২০০ টাকা কমে গ্যাস পেতেন ভোক্তারা

ছবি: সংগৃহীত

যশোরের এলপি গ্যাস বাজার ৫ জন ডিলার ও বিপণন সমিতির ২-৩ জন নেতার কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। মূলত তাদের ইশারায় জেলায় গ্যাসের দাম নির্ধারিত হয়। খুচরা বিক্রেতারা কম দামে বিক্রির সুযোগ থাকলেও এই সিন্ডিকেটের ভয়ে তা পারছেন না। ব্যবসায়ীদের দাবি, এই কৃত্রিম বাধা না থাকলে এবং সরকারের দাম নির্ধারণের জটিলতা না থাকলে ভোক্তারা ১৭০০ টাকাতেই সিলিন্ডার গ্যাস পেতেন।
১৭০০ টাকায় বিক্রির সুযোগ থাকলেও সিন্ডিকেটের চাপে ১৯৪০ টাকার বেশি দিতে হচ্ছে গ্রাহকদের

চাঞ্চল্যকর ও বিস্ময়কর তথ্য হলো, ওই ৫ জন ডিলারও জেলা এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমিতির শীর্ষস্থানীয় নেতা ও সদস্য। মূলত তাদের একক ইশারা ও নিয়ন্ত্রণে জেলার গ্যাসের দাম ওঠে ও নামে। তাদের ইশারাতেই পুরো বাজার নিয়ন্ত্রিত হয়। সিন্ডিকেটের এই কঠোর নিয়ন্ত্রণের কারণে ইচ্ছে থাকলেও খুচরা গ্যাস বিক্রেতারা ভোক্তাদের কাছ থেকে দাম কম নিতে পারছেন না। আবার যদি কোনো ডিলার নিজ উদ্যোগে দাম কমাতে চান, তবে সিন্ডিকেট চালানো ওই ৫ ডিলার ও বিপণন সমিতির নেতারা জোট বেঁধে ওই বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে নানাবিধ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে। ফলে সাহস করে কেউ দাম কমাতে পারে না। এমনকি ওই ডিলারের কাছ থেকে তার আনা নির্ধারিত কোম্পানির সিলিন্ডারও কোনো বিক্রেতা কিনতে সাহস পায় না। কয়েকজন এলপিজি গ্যাস ব্যবসায়ী ও সমিতির কয়েকজন নেতা বিষয়টি অকপটে স্বীকার করলেও নাম প্রকাশ করতে যেমন আগ্রহী নন, তেমনি সিন্ডিকেট পরিচালনাকারী ডিলাররাও বিষয়টি পরিষ্কার করতে কোনো আগ্রহ দেখাননি।

গত মাসে সরকারি প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়েছিল, ১২ কেজির গ্যাস সিলিন্ডারের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য হবে ১৯৪০ টাকা। চলতি মাসেও সরকারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিইআরসি এই একই দাম বহাল রাখে। তবে অতীতের রেকর্ড বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যশোরে কখনোই সরকার নির্ধারিত দামে গ্যাস বিক্রি হয়নি এবং এখনো হয় না। বর্তমানে যশোরে সাড়ে ১৮ শত টাকা থেকে দুই হাজার টাকা পর্যন্ত দামে গ্যাস বিক্রি হচ্ছে। খুচরা ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, তারা এর চেয়েও কম দামে গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রি করতে পারেন এবং সেই সক্ষমতা তাদের রয়েছে। তবে এই কাজে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন ওই ৫ ডিলার ও সমিতির প্রভাবশালী নেতারা। ফলে খুচরা ব্যবসায়ীরা অনেক সময় ১৭ শত টাকা দামে সিলিন্ডার প্রতি গ্যাস কিনতে পারলেও তারা সরকারি দাম বা তার চেয়েও বেশি দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। সাধারণ বিক্রেতাদের অভিযোগ, এই ডিলার সিন্ডিকেটের হাত থেকে পরিত্রাণ পেলে যশোরবাসী আরও অনেক কম দামে গ্যাস কিনতে পারতেন।

সাধারণত, কোম্পানি ভেদে বাসাবাড়িতে পৌঁছাতে গ্যাস সিলিন্ডার বর্তমানে সাড়ে ১৮ শত থেকে ২০০০ টাকায় কিনতে হচ্ছে ভোক্তাদেরকে। চড়া দাম দেওয়ার পরও ভোক্তাদের মাঝে নানা রকম ঝুঁকি থেকে যাচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে ওজন কম পাওয়া, সিলিন্ডার সমস্যা এবং পানি মেশানোর ভয়। জেলার কোথাও সরকারি দামে গ্যাস বিক্রি হচ্ছে না। কিন্তু ব্যবসায়ীরা নিজেরাই স্বীকার করেছেন যে, তারা আরও কম দামে ভোক্তাদের গ্যাস দিতে পারেন। মূলত ডিলার ও পরিবেশকদের সঠিক সহযোগিতা পেলে সাড়ে ১৭ শত টাকার মধ্যেই গ্যাস সরবরাহ করা যেতো। সেক্ষেত্রে বসুন্ধরা ও বেক্সিমকো গ্যাসের খরচ কিছুটা বেশি । আবার কম দামে গ্যাস বিক্রি করলে বড় ভয় থাকে , অন্য ডিলার ও পরিবেশকরা ওই খুচরা বিক্রেতার দোকানে আর ১০টি কোম্পানির গ্যাস সরবরাহ করবেন না। ফলে তার ব্যবসা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

এলপিজি গ্যাস ব্যবসায়ী সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক মাসুদ রানা জানান, সরকার যে নির্ধারিত দাম দেয়, সে দামে যশোরে কখনো গ্যাস বিক্রি করতে পারেন না তারা। কেউ কেউ কোনো কোনো কোম্পানির গ্যাস কম দামে কিনতে পারেন এবং ইচ্ছে করলেই কম দামে বেচতে পারেন। যশোরের সব গ্যাস ব্যবসায়ী মূলত ডিলার ও পরিবেশকদের কাছ থেকে গ্যাস কেনেন এবং ডিলাররাই প্রতিষ্ঠানে পৌঁছে দেন। বড় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অলিতে-গলিতে থাকা ছোট দোকানদাররা কেনেন অথবা অন্য ব্যবসায়ীরা নিয়ে বিক্রি করেন। বাসাবাড়িতে পৌঁছানোর জন্য তারা সিলিন্ডার প্রতি ৫০ টাকা অতিরিক্ত নিয়ে থাকেন। ফলে সাড়ে ১৭ শত টাকায়ও ভোক্তারা গ্যাস পেতে পারেন। কিন্তু বর্তমানে কয়েকটি গ্যাসের দাম অনেক বেশি। এছাড়া ডিলারদের কিনতেও হয় বেশি দামে। সাধারণ ক্রেতারা এত অভ্যন্তরীণ বিষয় জানেন না, তারা জানেন সরকারি দাম ১৯৪০ টাকা, ফলে সেখানেও বিভ্রান্তি ও সমস্যা তৈরি হচ্ছে। যদি সব পরিবেশক, ডিলার এবং ব্যবসায়ী সমিতি আন্তরিক হতো, তবে হয়তো যশোরে ভোক্তা পর্যায়ে দাম আর একটু কমানো যেতো।

এদিকে দুইজন ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়ে বলেন, বাজারে সম্প্রতি বাঁকড়া এলাকার নতুন একজন পরিবেশক ও ডিলার এসেছেন। তিনি কম দামে গ্যাস দিতে চান, কিন্তু স্থানীয় ডিলারদের প্রচণ্ড চাপে খুচরা ব্যবসায়ীরা ভয়ে ওই কোম্পানির সাইনবোর্ড পর্যন্ত দোকান থেকে খুলে ফেলেছেন। অন্যদিকে ডিলারদের দাবি হচ্ছে, তারা সরকার নির্ধারিত দামের চেয়েও কম দামে গ্যাস বাজারে দিচ্ছেন। তাদের মতে, সরকারি দামই বেশি এবং খুচরা ব্যবসায়ীরাও অনিয়ন্ত্রিতভাবে দাম নিচ্ছেন। কোনো কোনো কোম্পানির গ্যাসের দামও বেশি। ডিলাররা দাবি করেন, তারা তাদের গুদাম থেকে বিক্রয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে ১৭ শ টাকায় এবং বাসাবাড়িতে সাড়ে ১৭ শ টাকায়ও গ্যাস সিলিন্ডার পৌঁছে দিচ্ছেন। পক্ষান্তরে, তারা পাল্টা অভিযোগ করে বলেন, সম্প্রতি বাজারে আসা একজন ডিলার ৩৫ কেজির গ্যাস সিলিন্ডারের গ্যাস বের করে তার সাথে পানি মিশিয়ে ৩টি ১২ কেজির সিলিন্ডার তৈরি করে বাজার প্রভাবিত করছে এবং ভোক্তাদের ঠকাচ্ছে। খুব শিগগির তারা এই অসাধু কাজের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবেন বলে জানান।

সূত্রমতে, যমুনা, ক্লিন হিট, বেক্সিমকো, বিএম, ডেল্টা, টোটালসহ কয়েকটি কোম্পানির এলপিজি গ্যাস ডিলার হলেন যশোর পালবাড়ির সোনালী ট্রেডার্সের ফসিয়ার রহমান। তিনি এলপিজি গ্যাস ব্যবসায়ী সমিতির সহ-সাধারণ সম্পাদক-২ পদে রয়েছেন। ওমেরা ও ফ্রেস গ্যাস সিলিন্ডারের ডিলার আকিজ ফুয়েল এবং তাদের আর একটি প্রতিষ্ঠান তামিম এন্টারপ্রাইজ পরিচালনায় যুক্ত রয়েছেন মাহবুল আলম লাভলু। তিনি এলপিজি গ্যাস ব্যবসায়ী সমিতির সহ-সভাপতি-২। এছাড়া সোনা, পেট্রোম্যাক্স, জিগ্যাস ও বেঙ্গল গ্যাসের ডিলার হলেন নিউমার্কেটের ফিরোজ এন্টারপ্রাইজের ফিরোজ আহমেদ, যিনি এলপিজি গ্যাস ব্যবসায়ী সমিতির সদস্য। যমুনা, ক্লিন হিট, সান ও বিএম গ্যাসের ডিলার বারান্দীপাড়ার মহিবুর রহমান আকাশ ট্রেডিংয়ের মহিবুর রশিদ আকাশ, যিনি এলপিজি গ্যাস ব্যবসায়ী সমিতির নির্বাহী সদস্য। এছাড়া ডিলার শহীদুজ্জামান রয়েছেন ভেরিয়েন্ট ও বসুন্ধরা গ্যাসের ডিলার হিসেবে। এই ৫ জনই মূলত যশোরের প্রধান পরিবেশক। তাদের সাথে আরও ২ জন পরিবেশক ও ডিলার রয়েছেন যাদের একজন একটি বড় রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী পদে আসীন আছেন।

সূত্র আরও জানায়, এলপিজি গ্যাস ব্যবসায়ী সমিতির জেলা কমিটি ২৪ জনের। এর মধ্যে পদাধিকারী ১২ জন এবং নির্বাহী সদস্য ১২ জন। এছাড়া রয়েছেন দুইজন উপদেষ্টা। তাদের একজন হলেন সাবেক এমপি শেখ আফিল উদ্দীন এবং অন্যজন হলেন ব্যবসায়ী সৈয়দ সাজ্জাদুল করিম কাবুল। ২০১৮ সালে গঠিত এই কমিটির পর আর কোনো নতুন কমিটি হয়েছে কি না, সে তথ্য কেউ দিতে পারেনি। ওই কমিটির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন কাদের এন্টারপ্রাইজের এ.কে.এম শামছুল কাদের। তিনি ইন্তেকাল করেছেন। তার ছেলে সাজ্জাদুল কাদের অর্ণব জানেন না নতুন কোনো কমিটি হয়েছে কি না।

সার্বিক বিষয়ে ডিলার ও পরিবেশক ফিরোজ আহমেদ বলেন, যতটা অভিযোগ করা হচ্ছে ততটা ঠিক নয়। সব গ্যাসের দাম এক রকম নয়। আমরা যেমন দামে কিনি, তেমনভাবেই বিক্রি করি। আমাদের কাছ থেকে ১৭ শ টাকায় কিনে কেউ ১৮ শ বা সাড়ে ১৮ শ টাকায় বিক্রি করছে এবং বাড়ি পৌঁছে দিচ্ছে। আবার সরকারি দাম নির্ধারিত রয়েছে ১৯৪০ টাকা, সে অর্থে আমরা তার চেয়েও কম নিচ্ছি। আর বড় দোকান থেকে অন্য ছোট দোকান বা ব্যবসায়ীরা ২/১০টা সিলিন্ডার কিনে পাড়ার মোড়ে বিক্রি করলে তারা তো কেনা দামের চেয়ে বেশি নেবেই। তিনি আরও জানান, সম্প্রতি একজন নতুন ডিলার একটি কোম্পানির এলপি গ্যাস বিক্রি করছেন। তিনি ৩৫ কেজি সিলিন্ডারের গ্যাসকে পানি মিশিয়ে ১২ কেজির ৩টি সিলিন্ডার ভরে বাজারজাত করছেন এবং কম দামে বিক্রি করছেন। তারা এর প্রমাণ পেয়েছেন এবং প্রশাসনের কাছে প্রমাণসহ যাবেন।

আরেক পরিবেশক ও ডিলার মাহবুল আলম লাভলু জানান, মূলত গ্যাস ব্যবসা একটি সেবামূলক ব্যবসা এবং এটি অনেকটাই লোকসানের ব্যবসা। কোম্পানি আমাদের একটি নির্দিষ্ট দাম ও কমিশন বেঁধে দেয়। ডিলার বা পরিবেশক হিসেবে ২ থেকে ৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে হয়। এর ব্যাংক সুদ, ঘরভাড়া, স্টাফ পেমেন্টসহ অনেক খরচ আছে। আবার ৫০ থেকে ৭০ ভাগ মালামাল বাকিতে বিক্রি করতে হয়, ফলে প্রায় কোটি টাকা অনাদায়ী থাকে। এসব বিবেচনা করলে আমরা মোটেও বেশি দাম নিচ্ছি না।

পরিবেশক আব্দুল্লাহ ফারুক বলেন, "আমি ইউনাইটেড আই নামে একটি গ্যাসের পরিবেশক ও ডিলার। আজ পর্যন্ত কেউ বলতে পারেনি আমার কোনো গ্যাসের বোতলে পানি পাওয়া গেছে। তাছাড়া আমার বিরুদ্ধে যদি এ জাতীয় অভিযোগ থাকে তাহলে জেলা প্রশাসন, ভোক্তা অধিকারসহ আইনগতভাবে যেখানে যেখানে অভিযোগ করা যায় সেখানে অভিযোগ করা উচিত। আমি কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ করছি না, তবে তারা এসেছিল আমার কাছে যাতে বাজারে আমি কম দামে গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রি না করি সেই সমঝোতা করতে। আমার ইউনাইটেড আই গ্যাসের সিলিন্ডার বিক্রির সাথে সাথে মেমো দিয়ে থাকি যাতে অভিযোগ থাকলে তারা বলতে পারে যে অমুক দিনের অমুক গ্যাসে এই পানি পাওয়া গেছে।"

 

 

ধ্রুব নিউজের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

💬 Comments

Login | Register
Ad for sale 270 x 225 Position (3)
Position (3)
Ad for sale 990 x 90 Position (4)
Position (4)