বিবিসি
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশে নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে ১৪৩৩ বঙ্গাব্দের প্রথম দিনকে বরণ করে নেওয়া হয়েছে। ঢাকা তো বটেই, দেশের নানা প্রান্তে বিভিন্ন বয়সী মানুষকে দিনটি নানাভাবে উদযাপন করতে দেখা গেছে।
বর্ষবরণ উপলক্ষে বৈশাখী মেলা যেমন বসেছে তেমনি বিভিন্ন স্থানে আয়োজন করা হয়েছে বলিখেলা, লাঠিখেলা ও হা-ডু-ডুসহ ঐতিহ্যবাহী নানা ধরনের খেলা।
সরকারিভাবে ছুটির দিন হলেও বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও এ দিনটি পালিত হয়েছে।
কিন্তু যে বাংলা বর্ষপঞ্জি ঘিরে এই উৎসবমুখর পরিবেশ, সেটির ব্যবহার এখন নেই বললেই চলে। সরকারি কাগজপত্র, গণমাধ্যম থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের রোজকার জীবনে, সবখানেই এখন ইংরেজি ক্যালেন্ডারের জয়জয়কার। এমনকি উচ্চ শিক্ষিতরা বাংলা তারিখের খবরই রাখে না।
যারা এখনও বাংলা বর্ষপঞ্জি ব্যবহার করে
ইংরেজি ক্যালেন্ডার নির্ভরশীলতা তৈরি হওয়ার আগে একসময় বাংলা বর্ষপঞ্জিও ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হতো। বিশেষ করে কৃষকরা বাংলা মাসের হিসাব করে চাষাবাদ করতো। গ্রামেগঞ্জে এখনও এটি করা হয়।
যেমন, কোন ফসল কখন লাগাতে হবে– তা অনেক কৃষক এখনো বৈশাখ, আষাঢ়, কার্তিক ইত্যাদি মাস ধরে ঠিক করেন। ফসল তোলার সময়ও বাংলা মাসের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়।
উদাহরণস্বরূপ, অগ্রহায়ণ মাস মানেই আমন ধান কাটার মৌসুম।
বাংলা মাসগুলো সরাসরি ঋতুর সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই আবহাওয়ার হিসাবনিকাশে কৃষকরা বাংলা বর্ষপঞ্জি ব্যবহার করেন। যেমন, কোন মাসে বৃষ্টি হবে বা জমি শুকনো থাকবে – এই ধারণা থেকে সেচ দেওয়া বা সার প্রয়োগের সময় ঠিক করা হয়।
গ্রামে ব্যবসা-বাণিজ্য, বিশেষ করে কৃষি সম্পর্কিত দেনা-পাওনার হিসাব অনেক সময় বাংলা নববর্ষে (পহেলা বৈশাখে) নতুন করে শুরু করা হয়।
তবে কৃষি ছাড়া অন্যান্য পেশায় বিশেষ করে আধুনিক পেশায় বাংলা বর্ষপঞ্জির উপর নির্ভরতা নেই বললেই চলে।
অবশ্য স্বর্ণের ব্যবসার সাথে যুক্ত কয়েকজন ব্যবসায়ী জানালেন তারা এখনো বাংলা বর্ষপঞ্জি মেনেই অনেককিছু করেন।
বরিশাল সদরের একজন স্বর্ণ ব্যবসায়ী শোভন কর্মকার যিনি পারিবারিকভাবেই এই ব্যবসায় যুক্ত হয়েছেন। মি. কর্মকার বলছিলেন, "আমাদের, মানে স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের এখনও বাংলা ক্যালেন্ডার লাগে। এটা ছাড়া চলবে না আমাদের। কারণ ধানতারাস, অক্ষয় তৃতীয়া, পহেলা বৈশাখ, চৈত্র সংক্রান্তির মতো নানা পার্বন বাংলা ক্যালেন্ডার মেনে হয়। অধিকাংশ স্বর্ণের দোকান পুরানো রীতিতেই চলে।"
"এই যে আজ হালখাতা আসবে, সেই হালখাতায় প্রথম তারিখ বাংলায় লেখা হবে," বলছিলেন মি. কর্মকার।
"এটা ঠিক যে আগে হালখাতার যে আয়োজন ছিল, এখন আর তা নাই। স্বর্ণের দোকান বাদ দিলে অন্যান্য দোকানদাররা এখন আর বাংলা তারিখ সেভাবে মানে না," যোগ করেন তিনি।
পুরানো দেনা-পাওনার হিসাব চুকিয়ে পহেলা বৈশাখে ব্যবসায়ীদের নতুন বছরের হালখাতা খোলার রীতি বেশ পুরানো। ক্রেতাদের নানাভাবে অ্যাপায়িত করে ব্যবসায়িক সম্পর্ক জোরদারের একটা উপলক্ষ্য হিসেবেও দেখা হয় পহেলা বৈশাখকে। সেদিক থেকে বিবেচনা করলে অবশ্য বাংলা বর্ষপঞ্জির প্রথম দিনটি ঘিরে তৎপরতা ব্যবসায়ীদের মাঝে এখনও আছে।
সামাজিক ও ধর্মীয় নানা আচারেও বাংলা বর্ষপঞ্জির ব্যবহার দেখা যায়।
যেমন, অনেকেই আছেন যারা চৈত্র মাসে বিয়ের আয়োজন করতে চান না। নতুন কোনো কাজ শুরু করার আগে বা ঘরে ওঠার ক্ষেত্রেও অনেকে বাংলা বর্ষপঞ্জি অনুসরণ করেন।
মুসলমানরা যেমন হিজরি ক্যালেন্ডার মেনে বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব পালন করেন, হিন্দু ধর্মাবলম্বীরাও তেমন তাদের উৎসব-পার্বনের ক্ষেত্রে বাংলা বর্ষপঞ্জি অনুসরণ করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. বায়তুল্লাহ কাদেরী বলেন, "এখন শুধুমাত্র সরকারি চিঠিপত্রে ইংরেজির পাশাপাশি বাংলা তারিখ উল্লেখ করা হয়। ব্যবসায়ীরা আগে নতুন বছরে হালখাতা খুলতো। এখন সেটিও উঠে যাচ্ছে।"
"অবশ্য ধর্ম চর্চার ক্ষেত্রে বাংলা ক্যালেন্ডার কিছুটা ব্যবহার করা হয়," যোগ করেন মি. কাদেরী।
'বাংলাকে রাষ্ট্রীয়ভাবেই অবজ্ঞা করা হচ্ছে'
অধ্যাপক ড. বায়তুল্লাহ কাদেরী বলছিলেন, "এখন বাংলা তারিখ কেউ মনে রাখে না। আমাদের সময় আমাদেরকে স্কুলে কলেজে বাংলা ও খ্রিষ্টীয় ক্যালেন্ডার, দু'টোই শেখানো হতো। গ্রামের স্কুলগুলোতে তো আরও বেশি করে শেখানো হতো। কিন্তু এখন আর সেটা করা হয় না।"
তিনি মনে করেন, ইন্টারনেট ও পরে সোশ্যাল মিডিয়া হাতের নাগালে আসার পর থেকে বাংলা তারিখের ব্যবহার এবং এটি শেখা ও শেখানোর প্রবণতা লক্ষণীয় মাত্রায় কমে গেছে। কারণ ইন্টারনেটের কারণে বহির্বিশ্বের সাথে যোগাযোগ করাটা এখন সহজ হয়ে গেছে। আর বাইরের পৃথিবীর সাথে যোগাযোগের ভাষা হলো ইংরেজি। সবমিলিয়ে এটা হয়েছে বলেই মনে করেন অধ্যাপক কাদেরী।
"গ্রামেগঞ্জে কৃষকরা হয়তো এখনো বাংলা তারিখ মনে রাখে। কিন্তু আমাদের শিক্ষার্থীরা বাংলা সন-তারিখ তো পরের কথা, মাসের কথা বলতে পারবে না। এটা লজ্জার বিষয়। বাংলাকে রাষ্ট্রীয়ভাবেই অবজ্ঞা করা হচ্ছে। তাই এখন বাংলা তারিখের চর্চা নেই," যোগ করেন মি. কাদেরী।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দরখাস্ত লেখার সময় বাংলা তারিখ লেখা শেখানো হয় ঠিক-ই, কিন্তু এর কোনো চর্চা নেই বাস্তব জীবনে।
"বাংলা তারিখকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে স্কুলে ও পারিবারিকভাবে এর চর্চা জারি রাখা প্রয়োজন। বাচ্চাদেরকে যদি খনার বচনের প্রবাদ-প্রবচনও শেখানো হয়, তাহলেও তারা শিখবে যে কোন মাসের কী বৈশিষ্ট্য, কোন মাসে কী হয়-না হয়।"
"আমাদের আমদানি-রপ্তানি থেকে শুরু করে সবকিছুই খ্রিষ্টীয় তারিখে চলে। আমরা চাইলেও এখন এটিকে আন্তর্জাতিকভাবে নিতে পারবো না। কিন্তু দেশের ভেতরে তো এর চর্চা করতেই পারি। আর এটি তখনই শুরু হবে যদি বাংলা ভাষার চর্চা আমরা ঠিকভাবে করতে পারি।"
বাংলা বর্ষপঞ্জির শুরু
ইতিহাসবিদদের হিসাব অনুযায়ী ১৫৫৬ সাল থেকে বাংলা সন প্রবর্তন করা হয়।
মুঘল সম্রাট জালালুদ্দিন মুহাম্মদ আকবর খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্য তার সভার জ্যোতির্বিদ আমির ফতুল্লা শিরাজীর সহযোগিতায় ১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দে 'তারিখ-ই -এলাহি' নামে নতুন একটি বছর গণনা পদ্ধতি চালু করেন।
এটি কৃষকদের কাছে 'ফসলি সন' নামে পরিচিত হয়, যা পরে 'বাংলা সন' বা 'বঙ্গাব্দ' নামে প্রচলিত হয়ে ওঠে।
ঐ সময়ে প্রচলিত রাজকীয় সন ছিল 'হিজরি সন', যা চন্দ্রসন হওয়ার প্রতি বছর একই মাসে খাজনা আদায় সম্ভব হতো না।
বাংলা সন শূন্য থেকে শুরু হয়নি, যে বছর বাংলা সন প্রবর্তন করা হয়, সে বছর হিজরি সন ছিল ৯২৩ হিজরি।
সে অনুযায়ী সম্রাটের নির্দেশে প্রবর্তনের বছরই ৯২৩ বছর বয়স নিয়ে যাত্রা শুরু হয় বাংলা সনের।
বাংলা বর্ষের মাসগুলোর নামকরণ হয়েছে বিভিন্ন নক্ষত্রের নামে।
তবে সম্রাট আকবরের শাসনামলে যেভাবে বর্ষবরণের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছিল, তা সময়ের সাথে সাথে বিবর্তিত হয়েছে। এবং স্বাভাবিক নিয়মেই বাঙালি সংস্কৃতি ও রাজনীতির সাথেও জড়িয়ে গেছে এই উৎসব।