নিজস্ব প্রতিবেদক
সদরের কনেজপুরে ঐতিহ্যবাহী ‘বৈদ্যনাথতলার বাৎসরিক মেলার উদ্বোধন ছবি: ধ্রুব নিউজ
গ্রামীণ উৎসব আর সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ভক্তি-শ্রদ্ধার আবহে যশোরের বৈদ্যনাথতলায় অনুষ্ঠিত হয়ে গেল শত বছরের ঐতিহ্যবাহী মেলা ও পূজা। সোমবার দিনব্যাপী এই আয়োজনে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও আনন্দ উৎসবের এক অনন্য প্রতিফলন ঘটে। প্রসাদ বিতরণ, পূজাপার্বণ এবং গ্রামীণ মেলার চিরাচরিত আমেজে মুখরিত ছিল পুরো প্রাঙ্গণ।
উদ্বোধন ও আলোচনা সভা মেলা উপলক্ষে শ্রী শ্রী বৈদ্যনাথ কমিটির সভাপতি গোপাল চন্দ্র তরফদারের সভাপতিত্বে এক আলোচনা সভা ও উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানের শুরুতে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ যশোর জেলা শাখার সভাপতি দীপঙ্কর দাস রতন পূজার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।
এরপর প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে ফিতে কেটে মেলার শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করেন যশোর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদের প্রশাসক দেলোয়ার হোসেন খোকন।
ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি শতবর্ষের এই মেলাটি স্থানীয় জনপদের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেবল ধর্মীয় আচারই নয়, বরং এটি পরিনত হয়েছে সর্বজনীন এক উৎসবে। সকাল থেকেই দূর-দূরান্ত থেকে ভক্ত ও দর্শনার্থীদের আগমনে মেলা প্রাঙ্গণে উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়।

লোকমুখে প্রচলিত আছে, এক অলৌকিক পাথরকে কেন্দ্র করে এই মেলার উৎপত্তি। জনশ্রুতি রয়েছে, বাবা বৈদ্যনাথের বিগ্রহ পাথরটি এককালে স্রোতস্বিনী বুড়ি ভৈরব নদীতে ভাসতে ভাসতে কনেজপুরের ঘাটে এসে তলিয়ে যায়। পরবর্তীতে এক বৃদ্ধা স্বপ্নের মাধ্যমে জানতে পারেন যে, কেবল তিনিই এই পাথর উত্তোলন করতে পারবেন। অলৌকিক কৃপায় পাথরটি শোলার মতো হালকা হয়ে যায় এবং তা নির্দিষ্ট স্থানে স্থাপন করা হয়। সেই থেকে বৈশাখমাসের শেষ সোমবারকে কেন্দ্র করে এই পূজা ও মেলা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। পূজা অর্চনার সুবিধার্থে তৎকালীন জমিদার শচী প্রসন্ন মুখোপাধ্যায় ও তার ভাইয়েরা ৪৫ শতক জমি এই মন্দিরের নামে দান করেছিলেন।
আধুনিক প্রযুক্তির যুগেও বৈদ্যনাথতলার এই মেলা বাঙালির হাজার বছরের লোক-সংস্কৃতির বাহন হিসেবে টিকে আছে। মেলায় জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের এক মিলনমেলা পরিলক্ষিত হয়। দূর-দূরান্ত থেকে আসা ভক্তরা রোগমুক্তি, সন্তান লাভ বা মনের বাসনা পূরণের আশায় বাবা বৈদ্যনাথের চরণে প্রার্থনা জানান। মেলা কমিটির পক্ষ থেকে আগত দর্শনার্থীদের মাঝে প্রসাদ ও খাবার বিতরণ করা হয়।
এদিকে সোমবার মেলা উপলক্ষে উদ্বোধন অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক তপন কুমার ঘোষ, সহ-সভাপতি শ্রী অমলকান্তি দাস, সদর উপজেলা পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি রবিন কুমার ঘোষ, জেলা পরিষদের প্রতিনিধি এম এ মজনু এবং ৬নং কাশিমপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ও সাবেক চেয়ারম্যান আইয়ুব হোসেন। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন বিএনপি নেতা আব্দুর রহিম, মশিউর রহমান বাবলু, আলতাফ হোসেন, আবুল খায়ের, সরোজ কুমার কুণ্ডু, মন্দির কমিটির সহ-সম্পাদক মিলন কুমার কুণ্ডু, কার্তিক চন্দ্র, রমা নাথ শীল, নিমাই চন্দ্র বিশ্বাস, লক্ষীকান্ত ও গুলাম চন্দ্র দাসসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ। সমগ্র অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন মন্দির কমিটির সাধারণ সম্পাদক নিখিল কুমার শিকদার।
যশোরের এই ঐতিহ্যবাহী বৈদ্যনাথ তলার এই দীর্ঘদিনের লোকজ সংস্কৃতি ও মেলা রাজনৈতিক বা সামাজিক নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আজও আপন মহিমায় ভাস্বর। বৈদ্যনাথতলার মেলা। মাটির পুতুল, বাঁশির সুর আর ভক্তদের প্রাণের আকুতিতে কনেজপুর গ্রাম যেন এক টুকরো চিরায়ত বাংলায় রূপান্তরিত হয়েছিল।
ধ্রুব/টিএম