ধ্রুব ডেস্ক
ছবি: প্রতীকী
২০১৮ সালে ইসিবি দক্ষিণ এশীয় অ্যাকশন প্ল্যান চালু করে, যার লক্ষ্য ছিল দক্ষিণ এশীয় কমিউনিটির সাথে ক্রিকেটের সংযোগ বাড়ানো। এই উদ্যোগের নেতৃত্ব দেন বিক্রম ব্যানার্জি, যিনি বর্তমানে দ্য হান্ড্রেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক।
ইংল্যান্ডের জনপ্রিয় ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট টুর্নামেন্ট দ্য হান্ড্রেড-এর আসন্ন নিলামকে কেন্দ্র করে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, ভারতীয় মালিকানাধীন দলগুলো পাকিস্তানি ক্রিকেটারদের দলে নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না।
বিষয়টি নিয়ে ক্রিকেট অঙ্গনে বৈষম্য, ন্যায়বিচার ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রভাবের কথা উঠছে।
বিবিসি স্পোর্ট-কে একাধিক সূত্র জানিয়েছে, দ্য হান্ড্রেডের ভারতীয় মালিকানাধীন দলগুলো আগামী মাসের নিলামে পাকিস্তানি খেলোয়াড়দের বিবেচনায় নিচ্ছে না।
আগামী ১১ ও ১২ মার্চ এই নিলাম অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এতে পাকিস্তানের ৬৭ জন ক্রিকেটার নাম নিবন্ধন করেছেন। তবে ইংল্যান্ডের টেস্ট অধিনায়ক বেন স্টোক্স এবার নিলামে নাম দেননি।
২০০৯ সালের পর থেকে কূটনৈতিক উত্তেজনার কারণে পাকিস্তানি ক্রিকেটাররা ভারতের ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগে খেলছেন না।
বর্তমানে দ্য হান্ড্রেডের আটটি দলের মধ্যে চারটি দল আংশিক বা পুরোপুরি আইপিএল সংশ্লিষ্ট কোম্পানির মালিকানায় রয়েছে। এই দলগুলো হলো ম্যানচেস্টার সুপার জায়ান্টস, এমআই লন্ডন, সাউদার্ন ব্রেভ ও সানরাইজার্স লিডস।
সূত্রের মতে, এসব দলের মালিকানার সাথে আইপিএলের সম্পর্ক থাকার কারণেই পাকিস্তানি ক্রিকেটারদের ব্যাপারে অনীহা দেখা যাচ্ছে।
বিবিসির হাতে আসা বার্তায় দেখা গেছে, ইংল্যান্ড ও ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ডের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এক এজেন্টকে জানিয়েছেন, আইপিএল-সংশ্লিষ্ট নয় এমন দলগুলো থেকেই মূলত পাকিস্তানি খেলোয়াড়দের প্রতি সীমিত আগ্রহ থাকতে পারে।
একজন এজেন্ট এই পরিস্থিতিকে টি–টোয়েন্টি লিগগুলোয় ভারতীয় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে একটি ‘অলিখিত নিয়ম’ বলে বর্ণনা করেছেন।
ইসিবি ও ক্লাব কর্মকর্তাদের প্রতিক্রিয়া
ইংল্যান্ড ও ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ড বা ইসিবির প্রধান নির্বাহী রিচার্ড গোল্ড গত বছর বলেছিলেন, দ্য হান্ড্রেডে সব দেশের খেলোয়াড়দের সব দলে সুযোগ পাওয়া উচিত এবং সেখানে স্পষ্ট বৈষম্যবিরোধী নীতিমালা রয়েছে।
এ বিষয়ে চারটি দলের মালিকানা গোষ্ঠীর মধ্যে তিনটি কোনো মন্তব্য করেনি। তবে ম্যানচেস্টার সুপার জায়ান্টসের ডেপুটি চেয়ারম্যান জেমস শেরিডান বলেন, আমাদের লক্ষ্য শুধু দুটি প্রতিযোগিতায় জয়ের জন্য সেরা দুটি দল গড়া।
ইসিবির মুখপাত্র এক বিবৃতিতে বলেন, দ্য হান্ড্রেড বিশ্বের সব দেশের নারী ও পুরুষ ক্রিকেটারদের স্বাগত জানায়। আমরা আশা করি, আটটি দলই এই বৈচিত্র্যকে প্রতিফলিত করবে।
তিনি আরো জানান, ১৮টি দেশের প্রায় এক হাজার ক্রিকেটার নিলামে নাম দিয়েছেন।
গত মৌসুমে পাকিস্তানের দুইজন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার মোহাম্মদ আমির ও ইমাদ ওয়াসিম দ্য হান্ড্রেডে খেলেছিলেন। সেটিই ছিল নতুন বিনিয়োগকারীদের আসার আগের শেষ আসর।
এর আগে শাহিন আফ্রিদি, শাদাব খান ও হারিস রউফ পুরুষ বিভাগে অংশ নিয়েছিলেন। তবে এখন পর্যন্ত নারী বিভাগে কোনো পাকিস্তানি খেলোয়াড় অংশ নেননি।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের র্যাংকিং অনুযায়ী, পাকিস্তান পুরুষ দল বর্তমানে টি–টোয়েন্টিতে ষষ্ঠ এবং নারী দল অষ্টম স্থানে রয়েছে।
চলতি মৌসুমে দ্য হান্ড্রেড চলাকালে পাকিস্তান দল ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে টেস্ট সিরিজ খেলবে। তবে সীমিত ওভারের ক্রিকেটাররা তখনো নিলামের জন্য থাকার কথা।
বিদেশী লিগে খেলতে পাকিস্তানি ক্রিকেটারদের নিজ বোর্ডের অনাপত্তিপত্র প্রয়োজন হয়। অতীতে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড হঠাৎ করে এনওসি প্রত্যাহার করেছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে অস্ট্রেলিয়ার বিগ ব্যাশ লিগে পাকিস্তানের সাতজন শীর্ষ খেলোয়াড়ের অংশগ্রহণকে বোর্ডের আগের অবস্থান থেকে সরে আসার ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
ক্রিকেট লিগে ভারতীয় প্রভাব
বিশ্বজুড়ে ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে ভারতীয় মালিকানার প্রভাব ক্রমেই বাড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি সাম্প্রতিক পোস্টে দেখা যাচ্ছে, বিভিন্ন দেশের জনপ্রিয় টি–টোয়েন্টি লিগের বড় একটি অংশ এখন ভারতীয় ব্যবসায়ী ও আইপিএল–সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রবণতা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের শক্তির ভারসাম্যেও প্রভাব ফেলছে।
দক্ষিণ আফ্রিকার এসএ-২০ লিগে বর্তমানে ছয়টি দলের সবকটিই ভারতীয় মালিকানাধীন। মুম্বাই ইন্ডিয়ান্স গ্রুপের অধীনে রয়েছে এমআই কেপটাউন, চেন্নাই সুপার কিংস গ্রুপের মালিকানায় জোবর্গ সুপার কিংস, দিল্লি ক্যাপিটালস গ্রুপের প্রিটোরিয়া ক্যাপিটালস, সানরাইজার্স গ্রুপের সানরাইজার্স ইস্টার্ন কেপ, রাজস্থান রয়্যালসের পার্ল রয়্যালস এবং লখনউ সুপার জায়ান্টস গ্রুপের ডারবানস সুপার জায়ান্টস।
ফলে এই লিগটিকে কার্যত আইপিএলের ‘বিদেশী সংস্করণ’ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
২০২৩ সালে শুরু হওয়া দক্ষিণ আফ্রিকার এসএ২০ লিগে এখন পর্যন্ত কোনো পাকিস্তানি ক্রিকেটার খেলেননি।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের আইএলটি-২০ লিগেও ভারতীয় মালিকানার আধিপত্য স্পষ্ট। ছয়টি দলের মধ্যে পাঁচটিই আইপিএল–সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর হাতে।
এর মধ্যে রয়েছে এমআই এমিরেটস (মুম্বাই ইন্ডিয়ান্স), আবুধাবি নাইট রাইডার্স (কলকাতা নাইট রাইডার্স), দুবাই ক্যাপিটালস (দিল্লি ক্যাপিটালস), গালফ জায়ান্টস (লখনউ গ্রুপ) এবং শারজাহ ওয়ারিয়র্স (সানরাইজার্স গ্রুপ)। শুধু ডেজার্ট ভাইপার্স দলটি ভারতীয় মালিকানার বাইরে রয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের আইএলটি-২০ লিগেও এমআই লন্ডন ও সাউদার্ন ব্রেভের মালিকানাধীন দলগুলো চার মৌসুমে কোনো পাকিস্তানি খেলোয়াড় নেয়নি। যদিও তারা ১৫টি দেশের ক্রিকেটার নিয়োগ দিয়েছে।
অন্যদিকে, আমেরিকান মালিকানাধীন ডেজার্ট ভাইপার্স একই সময়ে আটজন পাকিস্তানি ক্রিকেটার দলে নিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মেজর ক্রিকেট লিগেও ভারতীয় বিনিয়োগ শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। ছয়টি দলের মধ্যে চারটি ভারতীয় মালিকানাধীন। এগুলো হলো এমআই নিউইয়র্ক, টেক্সাস সুপার কিংস, লস অ্যাঞ্জেলেস নাইট রাইডার্স এবং সিয়াটল অরকাস। বাকি দুটি দল আমেরিকান ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে।
ঠিক এভাবেই ইংল্যান্ডের জনপ্রিয় লিগ দ্য হান্ড্রেড-এও ভারতীয় মালিকানার উপস্থিতি বাড়ছে।
আটটি দলের মধ্যে চারটি দল বর্তমানে আংশিক বা পূর্ণভাবে আইপিএল–সংশ্লিষ্ট কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এগুলো হলো এমআই লন্ডন, ম্যানচেস্টার সুপার জায়ান্টস, সাউদার্ন ব্রেভ ও সানরাইজার্স লিডস। এই মালিকানা কাঠামো নিয়েই সম্প্রতি পাকিস্তানি ক্রিকেটারদের নিলামে উপেক্ষার অভিযোগ উঠেছে।
ক্যারিবীয় অঞ্চলের ক্যারিবিয়ান প্রিমিয়ার লিগের ছয়টি দলের মধ্যে তিনটি দল ভারতীয় মালিকানায় রয়েছে।
এর মধ্যে ত্রিনবাগো নাইট রাইডার্স (কেকেআর গ্রুপ), সেন্ট লুসিয়া কিংস (চেন্নাই সুপার কিংস গ্রুপ) এবং বার্বাডোজ রয়্যালস (রাজস্থান রয়্যালস গ্রুপ) উল্লেখযোগ্য। যদিও এই লিগে এখনো স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক মালিকানার ভারসাম্য তুলনামূলকভাবে বজায় আছে।
অস্ট্রেলিয়ার বিগ ব্যাশ লিগ, যা এখনো আলোচনার প্রক্রিয়ায় আছে, সেটি এখনো পুরোপুরি ভারতীয় মালিকানায় যায়নি। তবে কয়েকটি দলের অংশীদারিত্ব বিক্রি নিয়ে ভারতীয় বিনিয়োগকারীদের সাথে আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে।
এমনকি বিগ ব্যাশের পরের আসরের কয়েকটি ম্যাচ ভারতে আয়োজন করার কথাও চলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আইপিএলের আর্থিক সাফল্যের ধারাবাহিকতায় ভারতীয় ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিকরা এখন বৈশ্বিক বাজারে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছেন।
এর ফলে একদিকে লিগগুলোর আর্থিক সক্ষমতা বাড়ছে, অন্যদিকে কিছু ক্ষেত্রে খেলোয়াড় নির্বাচন ও সুযোগের প্রশ্নে বৈষম্যের অভিযোগও সামনে আসছে।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে আইপিএল দল কলকাতা নাইট রাইডার্স বাংলাদেশের বোলার মোস্তাফিজুর রহমানকে ছাড়তে বাধ্য হয়। ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের নির্দেশে এটি করা হয় বলে জানা গেছে।
এটি ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার রাজনৈতিক টানাপোড়েনকে একটা ভিন্ন মাত্রায় নিয়ে যায়, যার সূত্র ধরে শেষ পর্যন্ত ভারতের মাটিতে টি-২০ বিশ্বকাপে খেলেনি বাংলাদেশ।
বিশ্ব ক্রিকেটারদের সংগঠনের প্রধান নির্বাহী টম মফাট বলেন, প্রতিটি খেলোয়াড়ের ন্যায্য ও সমান সুযোগ পাওয়ার অধিকার আছে। নিয়োগে মালিকদের স্বাধীনতা থাকলেও তা অবশ্যই ন্যায় ও সম্মানের নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।
গত বছর ইসিবি দ্য হান্ড্রেডের প্রতিটি দলের ৪৯ শতাংশ শেয়ার বিক্রি করে প্রায় ৫০ কোটি পাউন্ড বিনিয়োগ সংগ্রহ করে। এই অর্থ কাউন্টি ক্রিকেট ও তৃণমূল পর্যায়ে বিতরণ করা হয়েছে।
ইসিবি এখনো প্রতিযোগিতার সামগ্রিক নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে। পাশাপাশি দলগুলোর প্রতিনিধিদের নিয়ে নতুন একটি বোর্ড গঠন করা হয়েছে।
২০২৩ সালের ইকুইটি ইন ক্রিকেট প্রতিবেদনের পর গঠিত স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থার অধীনেও এই টুর্নামেন্ট পরিচালিত হচ্ছে।
কাউন্টি ক্রিকেট মেম্বার্স গ্রুপ জানিয়েছে, যদি জাতীয়তার ভিত্তিতে পাকিস্তানি খেলোয়াড়দের বাদ দেয়া হয়ে থাকে, তবে ইসিবিকে বেসরকারি অংশীদারদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
আদমশুমারি অনুযায়ী, গ্রেটার ম্যানচেস্টারে প্রায় ১২ শতাংশ এবং লিডসে প্রায় চার শতাংশ মানুষ নিজেদের পাকিস্তানি হিসেবে পরিচয় দেন।
২০১৮ সালে ইসিবি দক্ষিণ এশীয় অ্যাকশন প্ল্যান চালু করে, যার লক্ষ্য ছিল দক্ষিণ এশীয় কমিউনিটির সাথে ক্রিকেটের সংযোগ বাড়ানো। এই উদ্যোগের নেতৃত্ব দেন বিক্রম ব্যানার্জি, যিনি বর্তমানে দ্য হান্ড্রেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক।
তবে ম্যানচেস্টার, লিডস ও লন্ডনের মতো শহরের সমর্থকেরা এখন নিজেদের দলে কোনো পাকিস্তানি প্রতিনিধিত্ব নাও পেতে পারেন।
একজন প্রভাবশালী এজেন্ট বলেন, আমাদের খেলোয়াড়রা বিশেষ সুবিধা চান না। তারা শুধু ন্যায্যতা বা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড চান। আমি আশা করি, দ্য হান্ড্রেড অন্য কিছু লিগের মতো পথ অনুসরণ করবে না। আশা করি, আমার আশঙ্কা ভুল প্রমাণিত হবে। বিবিসি এ খবর জানিয়েছে।