বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ডেস্ক
স্পেস এক্স এর প্রজেক্ট স্টারশিপ ছবি: সংগৃহীত
মহাকাশ বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব অধ্যায় সূচনা করল স্পেসএক্স। দীর্ঘ ২৪ দিন ভারত মহাসাগরের উত্তাল তরঙ্গে ভেসে থাকার পর অবশেষে স্পেসএক্সের রিকভারি টিম স্টারশিপের ৫২ মিটার লম্বা আপার স্টিজকে (শিপ ৪০) নিরাপদে ক্রিসমাস আইল্যান্ডের শান্ত উপকূলে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে। বর্তমানে প্রকৌশলীদের একটি প্রতিনিধি দল যানটি প্রাথমিক পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, যার মূল উদ্দেশ্য রকেটটিকে তাদের মূল ঘাঁটি 'স্টারবেস'-এ ফিরিয়ে নেওয়া। যদিও উদ্ধার প্রক্রিয়া এখনো পুরোপুরি সম্পন্ন হয়নি, তবুও এই প্রথমবার স্পেসএক্স এমন এক কৃতিত্ব দেখাল, যা আগে তারা কখনোই করতে পারেনি।
আন্তর্জাতিক মহাকাশ গবেষণায় এটি স্পেসএক্সের জন্য এক বিশাল মাইলফলক। এর আগের মিশনগুলোতে প্রতিটি ফ্লাইট থেকে সংস্থাটি কেবল 'টেলিমেট্রি ডেটা' বা দুর্ঘটনাকবলিত রকেটের ক্ষুদ্র ভাঙা টুকরো সংগ্রহ করতে পেরেছিল। কিন্তু শিপ ৪০-এর গল্পটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। রকেটটি সফলভাবে বায়ুমণ্ডলে পুনরায় প্রবেশ (রিন্ট্রি) করে মহাসাগরে অক্ষত অবস্থায় অবতরণ করেছে, একটানা তিন সপ্তাহেরও বেশি সময় সাগরের নোনা জল ও প্রতিকূল আবহাওয়ায় ভেসে থেকেছে এবং শেষ পর্যন্ত প্রকৌশলীদের হাতে এসে পৌঁছেছে। ফলে এবার কোনো ধোঁয়াশা নয়, বাস্তবভিত্তিক মহাকাশ ভ্রমণের সব চাপ সহ্য করে আসা এক আসল যান সরাসরি পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করার সুযোগ পাচ্ছেন গবেষকরা।
কিন্তু কেন এই ক্ষতিগ্রস্ত স্টারশিপকে অক্ষত ফিরিয়ে আনতে স্পেসএক্সের এত মরিয়া চেষ্টা? এর পেছনে রয়েছে রকেট ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের এক বিশাল তথ্যভান্ডার (ইনফরমেশন ডাটাবেজ)। বায়ুমণ্ডলে তীব্র পুনঃপ্রবেশের প্রচণ্ড তাপ ও চাপের মুখে রকেটের হিট শিল্ড, ফ্ল্যাপ এবং মূল কাঠামোর ঠিক কী ধরনের পরিবর্তন ঘটে, তা এতদিন শুধু সেন্সর আর গ্রাফ দেখে অনুমান করতে হতো। এখন স্পেসএক্সের প্রকৌশলীরা সরাসরি রকেটের যন্ত্রাংশ পরীক্ষা করে প্রকৃত প্রভাব বিশ্লেষণ করতে পারবেন।
তাছাড়া স্পেসএক্সের ব্যবসায়িক ও বৈজ্ঞানিক মূল ভিত্তিই হলো 'পুনর্ব্যবহারযোগ্যতা' (Reusability)। তারা চায় স্টারশিপের দুটি অংশই যেন বারবার মহাকাশে গিয়ে নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরে আসে এবং দ্রুত সময়ের মধ্যে পুনরায় উৎক্ষেপণ করা যায়। আর এই লক্ষ্য পূরণে বিধ্বস্ত যান থেকে পাওয়া তথ্যের চেয়ে অক্ষত ফিরে আসা যানের বাস্তব পরীক্ষা বহুগুণ বেশি কার্যকর।
মজার বিষয় হলো, শিপ ৪০-কে কিন্তু শুরু থেকে এই ধরনের বিশেষ পরীক্ষার কাজে ব্যবহারের পরিকল্পনা ছিল না। তবে রকেটটি যেভাবে মহাসাগরের পানি ও ঝোড়ো পরিবেশের সঙ্গে লড়াই করে টিকে গেছে, তা স্পেসএক্সের জন্য এক অপ্রত্যাশিত সুযোগ এনে দিয়েছে। সাগরের কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েও স্পেসএক্সের অদম্য রিকভারি টিম হাল ছাড়েনি এবং এই বিশাল যানটিকে টেনে ক্রিসমাস আইল্যান্ডের তুলনামূলক শান্ত জলসীমায় নিয়ে এসেছে।
বিগত ১২টি ফ্লাইট স্পেসএক্সকে বিপুল পরিমাণের ডিজিটাল ডেটা দিয়েছে, তবে ১৩ নম্বর ফ্লাইটটি তাদের হাতে তুলে দিল এক বাস্তব নিদর্শন। দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে ভারত মহাসাগর থেকে এই ক্ষতিগ্রস্ত যান উদ্ধার করাটা কেবল একটি রকেট কুড়িয়ে আনা নয়; আসল সাফল্য হলো, মহাকাশে ঠিক কী ঘটেছিল তার সরাসরি প্রমাণ হিসেবে রকেটটি নিজেই নিজের অস্তিত্ব জানান দিয়ে ফিরে এসেছে।